১ লিটার ইথানল তৈরিতে দরকার ১০ হাজার লিটার জলদেশে জ্বালানি সঙ্কট দূর করতে নতুন কিছু ভাবনার দরকার ছিল, সেই কারণেই জ্বালানি খাতে বিপ্লব আনতে ইথানলের দিকে ঝুঁকেছে কেন্দ্র। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে পেট্রোলের সঙ্গে ইথানল মেশানোর রাস্তায় হেঁটেছে কেন্দ্র সরকার। তবে, এই লক্ষ্য হিতে বিপরীত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। পরিবেশ রক্ষার খাতিরে নেওয়া এই 'ক্লিন এনার্জি' প্রজেক্ট দেশের বর্তমান জলসঙ্কটকে আরও গভীর করে তুলছে বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের। এর মূলে রয়েছে ধান, আখ ও ভুট্টার মতো অত্যন্ত জল-নির্ভর ফসলের ব্যাপক ব্যবহার।
আইপিসিসি-র লেখক অঞ্জল প্রকাশ বলেছেন, "জ্বালানিতে ইথানল মেশানো ভারতের জল সঙ্কটকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। কারণ এর বেশিরভাগ কাঁচামাল -আখ এবং ক্রমবর্ধমানভাবে ভুট্টা- চাষ ও প্রক্রিয়াজাত করতে অত্যন্ত বেশি জলের প্রয়োজন হয়। যেখানে এ দেশের প্রচলিত ফসল চাল ও অন্য শস্য উৎপাদনে অত জলের প্রয়োজন হয় না।"
ইথানল মেশানো জলের উপর প্রভাব ফেলছে কী করে?
ইথানল উৎপাদনের এই প্রক্রিয়া বহুলাংশে জল নির্ভর। এই পরিসংখ্যান রীতিমতো চমকপ্রদ। খাদ্য সচিব সঞ্জীব চোপড়া দিল্লিতে একটি গ্লোবাল কনফারেন্সে (২০২৪) এই বিষয়টির বিস্তারিক ব্যাখ্যা করেছেন। সেই ডেটা বলছে-
ধান থেকে ইথানল: ১ লিটার এথানল তৈরি করতে প্রয়োজন হয় প্রায় ১০,৭৯০ লিটার জল।
ভুট্টা থেকে ইথানল: খরচ হয় প্রায় ৪,৬৭০ লিটার জল।
আখ থেকে ইথানল: প্রয়োজন হয় ৩,৬৩০ লিটার জল।
হিসাব অনুযায়ী, ১ কেজি ধান চাষে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার লিটার জলের প্রয়োজন হয়। আর ১ লিটার ইথানল তৈরি করতে লাগে প্রায় ২.৫ থেকে ৩ কেজি চাল। ফলে সামগ্রিক 'ওয়াটার ফুটপ্রিন্ট' ১০ হাজার লিটার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ এক টন চাল থেকে মাত্র ৪৭০ লিটারের মতো ইথানল পাওয়া যায়।
এছাড়াও, কিষান তক- এর রিপোর্ট বলছে, "ইথানল মিলগুলো থেকেও বিপুল পরিমাণে বর্জ্য জল (ভিনাস) উৎপন্ন হয়, যা সঠিকভাবে শোধন করা না হলে ভূপৃষ্ঠের ও ভূগর্ভস্থ জলকে দূষিত করতে পারে।
কিষান তক- এর এডিটর ওম প্রকাশ প্রথমবার এই নিয়ে একটি রিপোর্ট করেন। তিনি উল্লেখ করেন, একজন কৃষক ১ কেজি চাল উৎপাদন করতে যে জল ব্যবহার করেন, তার জন্য তাকে প্রাকৃতিক সম্পদ নষ্টের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। কিন্তু শিল্পে যখন ১ লিটার ইথানলের জন্য ১০ হাজার লিটার জল খরচ হয়, তখন কোনও প্রশ্ন ওঠে না।
নীতি আয়োগের কম্পোজিট ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনডেক্স (CWMI) ইতিমধ্যেই সতর্ক করে জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে দিল্লি, বেঙ্গালুরু এবং চেন্নাই সহ ২১টি প্রধান শহরের ভূগর্ভস্থ জলের স্তর শূন্যে নেমে আসতে পারে।
বর্তমানে দেশের ইথানল উৎপাদন ক্ষমতার বড় অংশই মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ এবং কর্ণাটকের মতো রাজ্যগুলোতে অবস্থিত। এই রাজ্যগুলিতে ইতিমধ্যেই জলস্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে। বিশেষ করে মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ ও মারাঠওয়াড়ার কৃষকরা জলের জন্য হাহাকার করছেন। ফলে এই এলাকায় ৩৯৬ কোটি লিটার উৎপাদন ক্ষমতার ইথানল প্ল্যান্ট চালানো নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠছে।
এদিকে, উত্তরপ্রদেশ ও কর্ণাটকের ইথানল প্ল্যান্টগুলোও সেই ভূগর্ভস্থ জলের ভান্ডার থেকেই জল উত্তোলন করছে। আগেই এই এলাকায় ভূ-গর্ভস্থ জলের উপর বিপদসীমা টানা হয়েছে, ফলে এমনভাবে জল তুলতে থাকলে তা ভবিষ্যতের পানীয় জলের ভান্ডারকে বড়সড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড় করাতে পারে বলে আশঙ্কাপ্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।