
আর্জেন্টিনা বনাম মিশরের ম্যাচের নয়া ভিডিও প্রকাশ্যে ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে মহম্মদ সালাহর পেনাল্টির আবেদন ঘিরে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। সমর্থক থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ এবং এমনকী মিশরের কোচ হোসেম হাসানও অভিযোগ করেছিলেন, রেফারির ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই ফারাওদের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিতে হয়েছে।
তবে ম্যাচ শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। নতুন একটি রিপ্লে সামনে এসেছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে, ম্যাচের সবচেয়ে বিতর্কিত মুহূর্তে রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ের সম্ভবত সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন।
ম্যাচের যোগ করা সময়ের একেবারে শেষ দিকে ঘটনাটি ঘটে। তখন স্কোর ছিল ২-২। দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করেছিল আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসি এবং ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর গোলে ইয়াসের ইব্রাহিম ও মোস্তাফা জিকোর করা ব্যবধান মুছে যায়।
শেষ সুযোগ তৈরি করতে বাঁ দিক দিয়ে পেনাল্টি বক্সে ঢোকেন মহম্মদ সালাহ। সেই সময় তাঁকে আটকাতে দ্রুত ফিরে আসেন জুলিয়ান আলভারেজ। এরপরই বক্সের মধ্যে মাটিতে পড়ে যান সালাহ। সঙ্গে সঙ্গে পেনাল্টির আবেদন জানায় মিশর। কিন্তু রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ের খেলা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
কয়েক সেকেন্ড পরই পাল্টা আক্রমণে ওঠে আর্জেন্টিনা। যোগ করা সময়ের ৯৩তম মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ গোল করে দলকে ৩-২ ব্যবধানে অবিশ্বাস্য জয় এনে দেন।
এই সিদ্ধান্ত মুহূর্তের মধ্যেই গোটা বিশ্বকাপের অন্যতম বড় বিতর্কে পরিণত হয়।
ম্যাচ শেষে ক্ষোভ উগরে দেন মিশরের কোচ হোসেম হাসান। তিনি বলেন, 'আমি শুধু দুর্ভাগ্যের কথা বলে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাই না। আজ আমাদের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে। আমাদের ঠকানো হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'পরিণতি যা-ই হোক, আমি মনের কথা বলব। এটা স্পষ্টভাবে সাজানো ম্যাচ ছিল। গোটা বিশ্ব সেটা দেখেছে।'
এরপর আরও এক ধাপ এগিয়ে হাসানের মন্তব্য, 'যদি আর্জেন্টিনাকেই জেতাতে এত ইচ্ছা থাকে, তাহলে অন্য দলগুলোকে খেলতে ডাকার প্রয়োজন কী?'
ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনা করলে মিশরের ক্ষোভ স্বাভাবিক বলেই মনে হয়েছিল। কারণ, ওই সময় পেনাল্টি পেলে মিশর ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে যেতে পারত। সেক্ষেত্রে আর্জেন্টিনার পাল্টা আক্রমণ এবং শেষ মুহূর্তের জয়সূচক গোলের সুযোগই তৈরি হতো না।

তবে নতুন রিপ্লে সামনে আসার পর সেই বিতর্কে নতুন মোড় এসেছে।
নতুন অ্যাঙ্গেল থেকে দেখা যাচ্ছে, জুলিয়ান আলভারেজ পিছন থেকে সালাহকে ফাউল করেননি। বরং বল নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বা দিক পরিবর্তনের চেষ্টা করতে যান এবং সালাহ নিজেই ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এরপরই তাঁর সঙ্গে আলভারেজের সংস্পর্শ হয়।
রিপ্লেতে এমন কোনও স্পষ্ট প্রমাণ মেলেনি যে আলভারেজ ইচ্ছাকৃতভাবে পা বাড়িয়ে ফাউল করেছিলেন বা এমন কোনও ট্যাকল করেছিলেন, যা পেনাল্টি দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে।
বরং মনে হচ্ছে, হয় সালাহ বলটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে গিয়েছিলেন, নয়তো ভারসাম্য হারানোর পর নিজেই সংস্পর্শ তৈরি হয়েছিল। ফলে পেনাল্টি দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ফাউলের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সেই কারণেই মাঠের রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়েরের সিদ্ধান্তকে সঠিক বলেই মনে হচ্ছে।
তবে এই একটি সিদ্ধান্ত সঠিক হলেও, ম্যাচের বাকি কয়েকটি ঘটনা নিয়ে মিশরের ক্ষোভ কমেনি।
মোস্তাফা জিকোর একটি দুর্দান্ত গোল VAR-এর মাধ্যমে বাতিল করা হয়। কারণ, তার আগে মারওয়ান আতিয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে ফাউল করেছিলেন বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।
এছাড়াও, আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের ঠিক আগে হামদি ফাথির জার্সি টেনে ধরা হয়েছিল বলেও অভিযোগ তোলে মিশর।
ফ্রান্স ও আর্সেনালের প্রাক্তন স্ট্রাইকার থিয়েরি অঁরি মিশরের হতাশার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন। তবে তাঁর মতে, মূল সমস্যা কোনও ষড়যন্ত্র নয়, বরং VAR বিভিন্ন ঘটনার ক্ষেত্রে যে অসঙ্গতিপূর্ণভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
অন্যদিকে, রয় কিন এবং জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ দু'জনেই হোসেম হাসানের সেই দাবি উড়িয়ে দেন যে, ফিফা চেয়েছিল লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনা পরের রাউন্ডে উঠুক। তাঁদের মতে, ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার আসল কারণ ছিল মিশরের ২-০ ব্যবধানের লিড ধরে রাখতে না পারা।
প্রথমদিকে সালাহর পেনাল্টির আবেদন মিশরের দাবিকে আরও জোরালো করেছিল। কিন্তু নতুন ও আরও স্পষ্ট রিপ্লে সামনে আসার পর অন্তত এই নির্দিষ্ট বিতর্কের অবসান হতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।
ম্যাচের পর রেফারিং নিয়ে যতই সমালোচনা হোক না কেন, নতুন ভিডিও বিশ্লেষণ অনুযায়ী এই একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়েরের বিচারই সঠিক ছিল বলে ইঙ্গিত মিলেছে।