নেইমারছাব্বিশের বিশ্বকাপে হেক্সা জয়ের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে সেলেকাওদের। কোটি কোটি ভক্ত যখন হা-হুতাশ করছেন, তখনই নিজের অবসরের কথা ঘোষণা করে দিলেন নেইমার। শেষ ১৬-তে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গিয়েছে ব্রাজিল। ৬৭ মিনিটের মাথায় মাঠে নেমে পেনাল্টিতে অতিরিক্ত সময়ে একটি গোল করেন নেইমার। তবে দল হারতেই নিজের অবসর ঘোষণার কথা জানিয়ে দিলেন ৩৪ বছরের এই ব্রাজিলিয়ান ওয়ান্ডার বয়। তাঁর ১৬ বছরের আন্তর্জাতিক ফুটবল কেরিয়ারে বাজল ফাইনাল হুইসল।
নিউ জার্সিতে রবিবার ভোররাতটা (ভারতীয় সময়) ছিল ব্রাজিলিয়ানদের ছিল কাছে মন খারাপ করা। আর্লিং হ্যালান্ডের ২টি গোল গ্যালারি ঠাসা ব্রাজিলিয়ান ফ্যানেদের হকচকিয়ে দেয়। স্টপেজ টাইমে যদিও একটি পেনাল্টি মারেন নেইমার। হারের পর আবেগপ্রবণ নেইমার স্বীকার করেন, জাতীয় দলে ফেরার জন্য, বিশ্বকাপে খেলার জন্য তিনি নিজের সবটুকু বাজি রেখেছিলেন। তবে এবার তাঁর জার্নিতে দাঁড়ি টানার সময়। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর পথচলা এখানেই শেষ হল।
নেইমার বলেন, 'আমি চেষ্টার পর চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছি। তবে সব শেষ। এখানেই শুরু করেছিলাম, এখানেই শেষ করলাম।' চোট নিয়েই বিশ্বকাপ স্কোয়াডে এসেছিলেন তিনি। কার্লো আন্সেলোত্তি তাঁকে নানাভাবে প্ল্যান সাজিয়েছিলেন। প্রথম ২টি ম্যাচে মাঠে নামতে পারেনি তিনি। তবে ফিটনেস বাড়িয়ে রিজার্ভ বেঞ্চে হলেও জায়গা করে নিয়েছিলেন। একটি ম্যাচও ৯০ মিনিট খেলতে পারেননি। তবে স্কটল্যান্ড এবং নরওয়ের বিরুদ্ধে যে ২টি ম্যাচ খেলেন, নিজের ছাপ রাখেন মাঠে।
নরওয়ের বিরুদ্ধে স্টপেজ টাইমে একটি পেনাল্টি শট মেরে তাঁর আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে ইতি টানলেন নেইমার। ৫ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা এবারের টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ায় নেইমারের এই পেনাল্টি সান্তনা পুরস্কার ছাড়া আর কিছুই নয়।
ফিরে দেখা নেইমারের জার্নি
ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবেই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নিলেন নেইমার। ১২৯টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে দেশের হয়ে মোট ৮০টি গোল করেছেন তিনি। ২০১০ সালে শুরু হয়েছিল সেই জার্নি।
৪টি FIFA বিশ্বকাপে খেলা এই ফুটবলার এক যুগেরও বেশি সময় ধরে রইলেন ব্রাজিলের পোস্টার বয় হিসেবেই। তাঁর কাঁধে ভর করেই হেক্সার স্বপ্ন দেখত গোটা ব্রাজিল তথা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি সাম্বা ভক্ত। তবে বিশ্বকাপের মঞ্চ তাঁকে বারবার খালি হাতেই ফিরিয়েছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে অবশ্য একাধিক উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব রয়েছে তাঁর। ২০১৩ সালে তিনি জমিতেছিলেন কনফেডারেশন কাপ। ঘরের মাঠে ২০১৬ সালে তাঁর নেতৃত্বেই অলিম্পিকে সোনা জেতে ব্রাজিল। ২০১২ সালে অলিম্পিকে রুপো জিতেছিল সেলেকাওরা।
তবে আন্তর্জাতিক জার্নি কখনওই সোজাসাপ্টা ছিল না নেইমারের। বড় বড় টুর্নামেন্টে তাঁর পারফর্ম্যান্সের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায় একের পর এক চোট। ব্রাজিলের প্রায় সমস্ত ম্যাচেই নেইমারের উপর প্রত্যাশা বেড়েছে। জাতীয় দলে বরাবরই ফোকাসে থেকেছেন তিনি। তাঁর রেনবো ফ্লিক, তাঁর ড্রিবলিং, অসাধারণ পারফর্ম্যান্স দিয়ে ভক্তদের মন জয় করেছেন প্রতিবার। দেশের সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের মধ্যে সহজেই জায়গা করে নিয়েছিলেন নেইমার।
আবেগপ্রবণ বিদায়
চোটে জর্জরিত নেইমার নিজের সর্বস্ব উজার করে দিয়েছিলেন এবারের বিশ্বকাপে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার জন্য। অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন ফিটনেস ফেরাতে। মাঠে ফিরেওছিলেন, তবে নকআউটেই বিদায় নিতে হল তাঁর দলকে।
এদিন ম্যাচ শেষে ফাইনাল বাঁশি বাজার পর কিছুক্ষণের জন্য শান্ত হয়ে গিয়েছিলেন নেইমার। আশপাশ যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল তাঁর। এরপর আর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল তাঁর, সতীর্থ তাঁকে সামলানোর চেষ্টা করছিলেন। গত এক দশক ধরে ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের স্বপ্নকে বয়ে নিয়ে যাওয়া নেইমার বিদায় নিলেন চোখের জলেই।
এই পরাজয়ের পর কার্লোস আন্সেলোত্তির কোচিংয়ের জার্নিও শেষ হল সেলেকাওদের সঙ্গে। তিনি ব্রাজিলের এই তরতাজা টিমকে নকআউট পর্যন্ত নিয়ে এলেও নরওয়ের কাছে লজ্জার হার তাঁর চাকরি কাঁচি করবে বলেই অনুমান।
তবে নেইমারের কাছে এই হার অনেক বেশি কষ্টের। নীল হলুদ জার্সিতে তাঁর শেষ ম্যাচ সীমাবদ্ধ রইল কেবল স্টপেজ টাইমে পাওয়া একটি পেনাল্টিতে। চোখের জলেই ছাড়তে হল মাঠ।
ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চোট-আঘাতে বারবার থমকে না গেলে ব্রাজিলের ফুটবলে নেইমার অন্যরকম ইতিহাস তৈরি করে যেতে পারতেন।