Photo- ITG পেট্রোলের দাম, অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক বাজার এবং জ্বালানির জন্য বিদেশের উপর ভারতের নির্ভরতা। এই তিনটি বিষয়কে মাথায় রেখেই বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উপর জোর দিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার। E20 পেট্রোল নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই এবার E85 এবং E100 জ্বালানিতে চলা গাড়ির জন্য নিয়মের পথ আরও স্পষ্ট করল কেন্দ্র। এর ফলে ভবিষ্যতে প্রায় সম্পূর্ণ ইথানলনির্ভর জ্বালানিতে চলা গাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে সুবিধা হবে গাড়ি নির্মাতা সংস্থাগুলির। তবে এখনই নিজের পেট্রোল গাড়িতে E85 বা E100 ভরিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। এই জ্বালানির জন্য গাড়ির ইঞ্জিন ও ফুয়েল সিস্টেম বিশেষভাবে তৈরি এবং প্রয়োজনীয় শংসাপত্রপ্রাপ্ত হতে হবে।
E85 ও E100 নিয়ে কী সিদ্ধান্ত কেন্দ্রের?
কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রক ২৩ অক্টোবর ২০২৬-এ কেন্দ্রীয় মোটরযান বিধি (Central Motor Vehicles Rules, 1989) সংশোধন করে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। সংশোধিত নিয়মে E85-এর পাশাপাশি E100 জ্বালানিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে বেশি মাত্রায় ইথানল ব্যবহার করে চলতে সক্ষম ফ্লেক্স-ফুয়েল গাড়ির পরীক্ষা, নির্গমন সংক্রান্ত মান এবং শংসাপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম আরও স্পষ্ট হবে।
এই পদক্ষেপের ফলে E85 ও E100 জ্বালানিতে চলার উপযোগী গাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে গাড়ি নির্মাতা সংস্থাগুলির জন্য আইনি কাঠামো আরও পরিষ্কার হল। ভবিষ্যতে ভারতীয় বাজারে এই প্রযুক্তির গাড়ি আনার ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
কী বদলেছে নতুন নিয়মে?
মন্ত্রকের বিজ্ঞপ্তিতে কেন্দ্রীয় মোটরযান বিধির ১১৫ নম্বর নিয়মের অধীনে নির্গমন সংক্রান্ত মান, জ্বালানির গুণমান এবং গাড়ির পরীক্ষা সংক্রান্ত একাধিক বিধানে সংশোধন আনা হয়েছে। বিভিন্ন উপ-নিয়মে E85-এর পাশাপাশি E100-এর উল্লেখ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য, এই ধরনের জ্বালানিতে চলা গাড়ির পরীক্ষা ও শংসাপত্রের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম তৈরি করা।
এছাড়া, নিয়মের ১১৫ নম্বর বিধির ১৮ নম্বর উপ-ধারায় গাড়ির সর্বোচ্চ মোট ওজন বা Gross Vehicle Weight-এর সীমা ৩,০০০ কেজি থেকে বাড়িয়ে ৩,৫০০ কেজি করা হয়েছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, E85 বা E100 ব্যবহার করা যাবে শুধুমাত্র সেই ফ্লেক্স-ফুয়েল গাড়িতে, যেগুলি নির্মাতা সংস্থা এই জ্বালানির উপযোগী করে তৈরি করেছে। অর্থাৎ, বেশি ইথানলযুক্ত জ্বালানি ব্যবহারের জন্য গাড়ির নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকা বাধ্যতামূলক।
কী এই E85 ও E100 জ্বালানি?
E85 এবং E100, দুটিই ইথানলভিত্তিক জ্বালানি। তবে ইথানলের পরিমাণে রয়েছে পার্থক্য। E85 জ্বালানিতে প্রায় ৮৫ শতাংশ ইথানল থাকে। বাকি অংশ পেট্রোল। অন্যদিকে, E100 বলতে প্রায় সম্পূর্ণ ইথানলভিত্তিক জ্বালানিকে বোঝানো হয়।
এই ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করতে হলে গাড়ির ইঞ্জিন, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশকে সেই অনুযায়ী তৈরি করতে হয়। তাই সাধারণ পেট্রোল গাড়ি এবং E85 বা E100-এ চলার উপযোগী ফ্লেক্স-ফুয়েল গাড়ির মধ্যে প্রযুক্তিগত পার্থক্য রয়েছে।
বর্তমান পেট্রোল গাড়িতে কি E85 বা E100 ভরা যাবে?
না, সাধারণ পেট্রোল বা E20 জ্বালানিতে চলা গাড়িতে সরাসরি E85 কিংবা E100 ব্যবহার করা যাবে না, যদি না গাড়িটি ওই জ্বালানির উপযোগী করে তৈরি এবং প্রয়োজনীয় শংসাপত্রপ্রাপ্ত হয়।
E20 জ্বালানিতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ ইথানল এবং বাকি অংশ পেট্রোল থাকে। কিন্তু E85-এ ইথানলের পরিমাণ প্রায় ৮৫ শতাংশ। E100-এ তা প্রায় সম্পূর্ণ।
ইথানলের পরিমাণ এতটা বেড়ে গেলে গাড়ির ইঞ্জিন ও জ্বালানি ব্যবস্থার উপর তার প্রভাব পড়তে পারে। তাই শুধু পেট্রোলের বদলে E85 বা E100 ভরে গাড়ি চালানোর চেষ্টা করা ঠিক নয়। গাড়ির ম্যানুয়াল এবং নির্মাতা সংস্থার নির্দেশিকা মেনে চলাই জরুরি।
ভারতের প্রথম ফ্লেক্স-ফুয়েল গাড়ি কোনটি?
ফ্লেক্স-ফুয়েল প্রযুক্তি নিয়ে ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে গাড়ি নির্মাতা সংস্থাগুলি। Maruti Suzuki WagonR Flex Fuel-কে এই প্রযুক্তির অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে সামনে আনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রী নীতিন গডকড়ি এই গাড়িটি প্রকাশ্যে আনেন। সংস্থার দাবি ছিল, গাড়িটি E85 জ্বালানিতে চলতে সক্ষম।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দিল্লিতে E85 জ্বালানির দাম প্রতি লিটার ৮২.১২ টাকা এবং সাধারণ পেট্রোলের দাম প্রতি লিটার ১০২.১২ টাকা ধরা হয়েছিল। অর্থাৎ, ওই দামের ভিত্তিতে প্রতি লিটারে প্রায় ২০ টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে জ্বালানির দাম সময় ও স্থান অনুযায়ী বদলাতে পারে। তাই এই সাশ্রয়কে সব জায়গার জন্য স্থায়ী হিসাব হিসেবে দেখা যাবে না।
মাইলেজ কেমন WagonR Flex Fuel-এর?
গাড়িটির একটি পরীক্ষামূলক ড্রাইভের সময় দিল্লির ব্যস্ত রাস্তা, ফ্লাইওভার এবং তুলনামূলক ফাঁকা রাস্তায় প্রায় ৩০ কিলোমিটার চালানো হয়েছিল। সেই পরীক্ষায় গাড়ির মাল্টি-ইনফরমেশন ডিসপ্লে বা MID-তে গড় মাইলেজ দেখা যায় ১১.৮ কিলোমিটার প্রতি লিটার।
তবে এই সংখ্যাকে গাড়িটির চূড়ান্ত বা নির্ভরযোগ্য বাস্তব মাইলেজ বলা যাবে না। পরীক্ষার সময় ভারী যানজট, বারবার গাড়ি থামানো, ভিডিও শুটিংয়ের জন্য দীর্ঘক্ষণ ইঞ্জিন চালু রাখা এবং বারবার গতি বাড়ানোর মতো বিষয় ছিল। প্রকৃত মাইলেজ বুঝতে আরও দীর্ঘ সময় ধরে নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিতে পরীক্ষা প্রয়োজন।
সস্তা জ্বালানি, কিন্তু গাড়ির দাম বেশি?
ফ্লেক্স-ফুয়েল গাড়ির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, জ্বালানিতে সাশ্রয় হলেও গাড়ি কেনার খরচ কতটা বাড়বে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, WagonR Flex Fuel-এর প্রারম্ভিক দাম ৭.২৪ লক্ষ টাকা। গাড়িটি WagonR-এর ZXi ভ্যারিয়েন্টের উপর ভিত্তি করে তৈরি এবং সাধারণ পেট্রোল সংস্করণের তুলনায় প্রায় ৮৫ হাজার টাকা বেশি দামের বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, শুধু প্রতি লিটার জ্বালানির দাম কম হলেই সামগ্রিক খরচ কমবে, এমনটা নিশ্চিত নয়। গাড়ির ক্রয়মূল্য, মাইলেজ, জ্বালানির স্থানীয় দাম এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মিলিয়ে হিসাব করতে হবে।
ভারতের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ ইথানল?
ভারতে ইথানলের ব্যবহার বাড়ানোর অন্যতম উদ্দেশ্য হল পেট্রোলের সঙ্গে বিকল্প জ্বালানির মিশ্রণ বাড়ানো এবং আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের উপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা। তবে E85 ও E100-এর মতো জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হলে শুধু নিয়ম তৈরি করলেই হবে না। উপযুক্ত গাড়ির উৎপাদন, জ্বালানির সরবরাহ, পরিকাঠামো এবং গ্রাহকদের কাছে প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
কেন্দ্রের সাম্প্রতিক সংশোধন ফ্লেক্স-ফুয়েল গাড়ির পরীক্ষা ও শংসাপত্রের ক্ষেত্রে নিয়ম স্পষ্ট করার একটি পদক্ষেপ। এর ফলে ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির গাড়ি বাজারে আসার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে সাধারণ পেট্রোল গাড়ির মালিকেরা এখনই E85 বা E100 ব্যবহার করতে পারবেন, এমন কোনও অর্থ এই সিদ্ধান্ত থেকে করা যায় না।