‘শিবশক্তি পয়েন্ট’ থেকে কোটি বছরের প্রাচীন ধাঁধার সমাধান করল প্রজ্ঞানআমরা রাতের আকাশে যে সুন্দর গোল চাঁদ দেখতে পাই, একসময় তারই একটি ছোট্ট টুকরো ছিটকে এসে পড়েছিল আমাদের এই পৃথিবীতে। সেই দারুণ রহস্যেরই সমাধান করে ফেলল ভারতের পাঠানো ছোট্ট রোভার ‘প্রজ্ঞান’! আহমদাবাদের ফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি (PRL)-এর বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে এক নতুন ও চমৎকার তথ্য খুঁজে পেয়েছেন।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের ২৩শে অগাস্ট চাঁদের দক্ষিণ মেরুর ‘শিবশক্তি পয়েন্ট’-এ ভারতের চন্দ্রযান-৩ যখন নেমেছিল, তখন তার বুক থেকে বেরিয়ে প্রজ্ঞান নামের একটি ছোট্ট গাড়ি চাঁদের মাটিতে ঘুরে বেড়াত। সেই প্রজ্ঞান চাঁদের মাটি পরীক্ষা করে যে ধরণের উপাদানের খোঁজ পেয়েছিল, তার সঙ্গে হুবহু মিল রয়েছে আজ থেকে প্রায় ৪৪ বছর আগে পৃথিবীর অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের বরফের ওপর খুঁজে পাওয়া ‘ALHA 81005’ নামের একটি অদ্ভুত পাথরের বা উল্কাপিণ্ডের! এই পাথরটি আসলে চাঁদেরই একটি হারিয়ে যাওয়া টুকরো।
কীভাবে চাঁদের টুকরো পৃথিবীতে এল?
খুব সহজ করে বললে, কোটি কোটি বছর আগে মহাকাশের একটি বিশাল বড় এবং ভারী পাথর এসে ধড়াম করে ধাক্কা মেরেছিল চাঁদের গায়ে। সেই ধাক্কা এতটাই জোরে ছিল যে, চাঁদের গায়ের একটা অংশ ভেঙে ছিটকে মহাকাশে ভেসে যায়। ভাসতে ভাসতে সেই চাঁদের টুকরোটি একদিন টুপ করে এসে পড়ে আমাদের পৃথিবীতে। ১৯৮১ সালে বিজ্ঞানীরা বরফের মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকায় ওই পাথরটি খুঁজে পান এবং পরীক্ষা করে জানতে পারেন এটি সাধারণ পাথর নয়, এটি চাঁদের পাথর। কিন্তু চাঁদের কোন অংশের পাথর এটি, তা এত দিন কেউ জানত না।
প্রজ্ঞান রোভার চাঁদের দক্ষিণ মেরুর মাটি পরীক্ষা করে দেখাল যে, সেখানকার মাটিতে যে পরিমাণ লোহা ও ম্যাগনেসিয়াম রয়েছে, পৃথিবীর সেই পুরনো পাথরটিতেও ঠিক একই জিনিস রয়েছে। অর্থাৎ, সেই পাথর আর শিবশক্তি পয়েন্টের মাটির জন্ম একই রকমের উপাদান থেকে।
চাঁদের বুকেও ছিল ফুটন্ত পাথরের সমুদ্র!
বিজ্ঞানীরা এই আবিষ্কার থেকে আরও একটি মজার জিনিস জানতে পেরেছেন। খুব ছোটবেলায় চাঁদ নাকি এখনকার মতো ঠান্ডা ও শান্ত ছিল না। তখন পুরো চাঁদটা জুড়ে ছিল টগবগ করে ফুটতে থাকা তরল পাথরের এক বিশাল বড় সমুদ্র! যাকে বলা হয় ‘লুনার ম্যাগমা ওশান’।
ধীরে ধীরে কোটি কোটি বছর ধরে সেই গরম পাথরের সমুদ্র ঠান্ডা হতে থাকে। ঠিক যেমন গরম দুধ ঠান্ডা হলে ওপরে সর পড়ে, তেমনই চাঁদের ওপরের অংশ ঠান্ডা হয়ে শক্ত মাটি ও পাথর তৈরি হয়। আর প্রজ্ঞানের পাঠানো তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা এখন খুব সহজেই বুঝতে পারছেন কীভাবে চাঁদের এই শক্ত পিঠ তৈরি হয়েছিল এবং কীভাবে চাঁদের অংশ মহাকাশ পেরিয়ে আমাদের পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছিল। ভারতের চন্দ্রযান-৩ তাই শুধু চাঁদের মাটিতে নেমেই শান্ত হয়নি, মহাকাশের বহু প্রাচীন ধাঁধারও সমাধান করে দিল।