বন্ড নাকি ফিক্সড ডিপোজিট! কোথায় টাকা রাখলে মিলবে বাম্পার রিটার্ন, ঝুঁকির অঙ্কটা বুঝুনFxed Deposit Vs Bonds Returns Comparison: কষ্টের উপার্জিত টাকা কোথায় ইনভেস্ট করলে সবথেকে বেশি ফায়দা হবে এই নিয়ে মধ্যবিত্তের চিন্তার শেষ নেই। সঞ্চয়ের জমানো পুঁজি ব্যাঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিট বা এফডিতে রাখবেন নাকি বন্ডে খাটাবেন তা নিয়ে অনেকেই চরম দ্বিমুখী সমস্যায় ভোগেন। দুই জায়গাতেই একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য টাকা লগ্নি করে নিশ্চিত সুদ বা কুপন আয়ের দুর্দান্ত সুযোগ থাকে। তবে চোখ বন্ধ করে শুধুমাত্র সুদের চড়া হার দেখেই টাকা ঢাললে কিন্তু বড়সড় বিপদে পড়তে পারেন। লগ্নির সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রিটার্নের পাশাপাশি ঝুঁকি, লিকুইডিটি বা সহজে টাকা তোলার সুবিধা এবং ট্যাক্সের নিয়মকানুন ভালো করে খতিয়ে দেখা দরকার।
প্রথমে আসা যাক ফিক্সড ডিপোজিটের কথায়। ব্যাঙ্ক এফডির ক্ষেত্রে একটা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য টাকা জমা রাখতে হয় এবং মেয়াদ ফুরোলে সুদ সমেত পুরো আসল টাকা ফেরত পাওয়া যায়। মাঝপথে হঠাৎ টাকার দরকার পড়লে এফডি ভেঙে ফেলা যায় তবে সেই ক্ষেত্রে সুদের হারে কিছুটা কাটছাঁট করা হয়। এফডির সবচেয়ে বড় পজিটিভ দিক হল এর রিটার্ন আগে থেকেই একদম নিশ্চিত থাকে। শেয়ার বাজারের ওঠানামার সঙ্গে এফডির সুদের কোনও সম্পর্ক নেই। এই কারণেই অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ নাগরিক এবং যারা একদম ঝুঁকি নিতে চান না তাদের প্রথম পছন্দ ফিক্সড ডিপোজিট। এখানে আপনি কত টাকা রাখছেন কতদিনের জন্য রাখছেন এবং মেয়াদ শেষে কত টাকা হাতে পাবেন তা জলের মতো পরিষ্কার থাকে। তবে মাথায় রাখবেন এফডি থেকে পাওয়া সুদ কিন্তু পুরোপুরি করযোগ্য আয় হিসেবে ধরা হয়। ফলে আপনি যদি উচ্চ করের স্ল্যাবে থাকেন তবে ঘোষিত সুদের পুরোটা আপনার পকেটে আসবে না। যদিও প্রবীণ নাগরিকদের জন্য নির্দিষ্ট শর্তে সেকশন এইট জিরো টিটিবির অধীনে সুদের ওপর কর ছাড়ের একটা বাড়তি সুবিধা থাকে।
এবার একটু বন্ডের অংকটা বুঝে নেওয়া যাক। বন্ডে বিনিয়োগ করার আসল মানে হল আপনি কোনও সরকার সরকারি সংস্থা বা বেসরকারি কোম্পানিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য টাকা ধার দিচ্ছেন। এর বদলে বিনিয়োগকারী হিসেবে আপনি নির্দিষ্ট হারে সুদ বা কুপন পাবেন এবং মেয়াদ শেষে আসল টাকা ফেরত পাবেন। কিন্তু মনে রাখবেন সব বন্ড কিন্তু সমান সুরক্ষিত হয় না। সরকারি বন্ডের ঝুঁকি এবং কর্পোরেট বন্ডের ঝুঁকি আকাশ পাতাল তফাত। সেবির তথ্য অনুযায়ী বন্ডের ক্ষেত্রে যে সংস্থা বন্ড ইস্যু করছে তার ক্রেডিট যোগ্যতা সুদের হারের ঝুঁকি এবং লিকুইডিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনও কোম্পানি যদি চড়া হারে সুদ দেয় তবে বুঝতে হবে তার পেছনে ততটাই ডিফল্ট হওয়ার বা টাকা ডোবার ঝুঁকি লুকিয়ে রয়েছে। সাধারণত সমমানের মেয়াদের ক্ষেত্রে ভালো মানের কর্পোরেট বন্ড অনেক সময় ব্যাঙ্ক এফডির চেয়ে বেশি সুদ দিতে পারে বলে সেবির বিনিয়োগকারী নির্দেশিকাতেও উল্লেখ রয়েছে।
সহজ একটা উদাহরণের মাধ্যমে লাভ লোকসানের অংকটা দেখে নেওয়া যাক। ধরা যাক আপনি পাঁচ বছরের জন্য এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে চান। এবার এফডিতে যদি বার্ষিক সাত শতাংশ সুদ মেলে আর বন্ডের বার্ষিক কুপন রেট যদি হয় নয় শতাংশ। সরল হিসাব কষলে দেখা যাবে এফডি থেকে বছরে প্রায় সাত হাজার টাকা সুদ আসবে আর বন্ড থেকে ঘরে আসবে প্রায় নয় হাজার টাকা। অর্থাৎ বন্ডে টাকা রাখলে বছরে পরিষ্কার দুই হাজার টাকা বেশি ইনকাম হতে পারে। তবে এই কাগজের হিসাব তখনই বাস্তবে মিলবে যখন বন্ড ইস্যু করা সংস্থাটি নিয়মিত সুদ দেবে এবং মেয়াদ শেষে আসল টাকা ফেরত দিতে পারবে। মেয়াদের আগে বাজারে বন্ড বিক্রি করতে গেলে সুদের হার এবং বাজার পরিস্থিতির কারণে দাম ওঠানামা করতে পারে যার ফলে আসল টাকার চেয়ে কম টাকা পাওয়ার ঝুঁকিও থেকে যায়।
নিরাপত্তার তুলাদণ্ডে বিচার করলে সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাঙ্ক এফডি অনেক বেশি সহজ এবং নির্ভরযোগ্য। অন্যদিকে বন্ডের নিরাপত্তা পুরোপুরি নির্ভর করে ইস্যুকারী সংস্থার ওপর। সরকারি বন্ডে বা ট্রিপল এ রেটিং যুক্ত কর্পোরেট বন্ডে ক্রেডিট ঝুঁকি অনেক কম থাকে। কিন্তু ডবল এ বা তার নিচের রেটিং যুক্ত বন্ডে ঝুঁকি অনেকটাই বেশি থাকে। আর বেশি সুদের লোভ দেখানো অজানা বা দুর্বল সংস্থার বন্ডের ক্ষেত্রে চরম সতর্ক থাকা উচিত। সেবি স্পষ্ট জানিয়েছে রেটিং যত কমবে ঝুঁকি তত বাড়বে তবে শুধু ক্রেডিট রেটিং দেখেই চোখ বন্ধ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
তাহলে শেষমেশ আপনি কোথায় টাকা রাখবেন। যদি আপনার মূল লক্ষ্য হয় টাকা একশো ভাগ সুরক্ষিত রাখা এবং সরল উপায়ে নিশ্চিত রিটার্ন পাওয়া তবে চোখ বন্ধ করে এফডি বেছে নিন। আর আপনি যদি এফডির চেয়ে বেশি রিটার্ন চান এবং ক্রেডিট রেটিং বা বন্ডের শর্তাবলী ভালো বোঝেন তবে বন্ডের কথা ভাবতেই পারেন। তবে সব ডিম এক ঝুড়িতে না রেখে নিজের বয়স আয় এবং ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা বুঝে এফডি সরকারি বন্ড এবং উচ্চমানের কর্পোরেট বন্ডের মধ্যে টাকা ভাগ করে বিনিয়োগ করাই সবচেয়ে সেরা কৌশল।