বাড়ি ও ফ্ল্যাট হচ্ছে সস্তা বাড়ি কেনার ইচ্ছা রয়েছে, কিন্তু সঠিক সময়ের অপেক্ষায়? শুধু আপনিই নন। নতুন একটি সমীক্ষা বলছে, আগামী দু’বছরের মধ্যেই বাড়ি কেনার পরিকল্পনা করছেন সম্ভাব্য ক্রেতাদের একটা বড় অংশ। তবে বাড়ি কেনার আগে এখন আর শুধু দাম দেখলেই হচ্ছে না। লোকেশন, বাড়ির আয়তন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, আশপাশের পরিকাঠামো এবং কবে হাতে বাড়ির চাবি পাওয়া যাবে, সবকিছুই খুঁটিয়ে দেখছেন ক্রেতারা।
Colliers-এর Homebuying Sentiment Survey 2026-এ উঠে এসেছে এমনই ছবি। ৩০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠিত ও উদীয়মান আবাসন বাজারের প্রায় ১,৮০০ জন সম্ভাব্য ক্রেতার মতামতের ভিত্তিতে এই সমীক্ষা করা হয়েছে।
আগামী ২ বছরের মধ্যে বাড়ি কিনতে পারেন ৫০%
সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ৫০ শতাংশ সম্ভাব্য ক্রেতা আগামী দু’বছরের মধ্যে বাড়ি কিনতে আগ্রহী। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকলেও ভারতের আবাসন বাজার নিয়ে অনেকেরই ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে। প্রায় ৫৪ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা বা অন্যান্য বাইরের কারণ ভারতের আবাসন বাজারে তুলনামূলকভাবে কম প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থাৎ, বাড়ি কেনার ইচ্ছা এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। বিশেষ করে নিজের থাকার জন্য যাঁরা বাড়ি কিনতে চান, তাঁদের মধ্যে আগ্রহ বেশি। প্রায় ৫১ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তাঁরা নিজের ব্যবহারের জন্য বাড়ি কিনতে চান।
KREEVA এবং Kanodia Group-এর প্রতিষ্ঠাতা ড. গৌতম কানৌডিয়ার মতে, বাড়ি কেনার ইচ্ছা থাকলেও ক্রেতারা এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অনেক বেশি ভাবনাচিন্তা করছেন। তাঁদের মূল প্রশ্ন, যে দামে বাড়িটি পাওয়া যাচ্ছে, তার বিনিময়ে সত্যিই কতটা মূল্য পাওয়া যাচ্ছে।
বাড়ির দামই সবচেয়ে বড় চিন্তা
বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে এখনও সবচেয়ে বড় বিষয় সাশ্রয়ী দাম। সমীক্ষায় প্রায় ৩১ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, সম্পত্তির দাম তাঁদের অন্যতম প্রধান চিন্তা। এর পরেই রয়েছে চাকরির নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ আয় নিয়ে নিশ্চয়তা।
তবে শুধু দাম নয়। ক্রেতারা বাড়ির আকার, নকশা, সামাজিক পরিকাঠামো এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। প্রায় ৭৫-৮০ শতাংশ উত্তরদাতা বাড়ির আয়তন ও লে-আউট, পাশাপাশি আশপাশের পরিকাঠামো এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন।
অর্থাৎ, এখন বাড়ি কেনার অর্থ শুধু একটি ফ্ল্যাট কেনা নয়। তার সঙ্গে আশপাশের পরিবেশ, যাতায়াত, বাজার, স্কুল, হাসপাতাল এবং অন্যান্য সুবিধাও ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা নিচ্ছে।
২ ও ৩ BHK-তেই বেশি আগ্রহ
সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, সম্ভাব্য ক্রেতাদের প্রায় ৬২ শতাংশ ২ বা ৩ BHK ফ্ল্যাট পছন্দ করছেন। তবে শহরভেদে চাহিদার পার্থক্য রয়েছে। দিল্লি-NCR, বেঙ্গালুরু এবং হায়দরাবাদের মতো বাজারে তুলনামূলক বড় বাড়ির চাহিদা বেশি। অন্যদিকে মুম্বইয়ে জায়গার দাম বেশি হওয়ায় compact বা প্রয়োজন অনুযায়ী মাপের বাড়ির চাহিদা তুলনামূলক বেশি।
দামের ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট বাজেটের প্রবণতা রয়েছে। প্রায় ৪৬ শতাংশ সম্ভাব্য ক্রেতা ৫০ লক্ষ থেকে ১.৫ কোটি টাকার মধ্যে বাড়ি কিনতে আগ্রহী। তবে মুম্বই, দিল্লি-NCR, বেঙ্গালুরু এবং হায়দরাবাদের মতো শহরে বেশি দামের বাড়ির চাহিদাও রয়েছে।
তৈরি বাড়ির দিকেই ঝোঁক ক্রেতাদের
সমীক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল, ক্রেতারা এখন তৈরি বা প্রায় তৈরি বাড়ির দিকে বেশি ঝুঁকছেন। ৬০ শতাংশেরও বেশি উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তাঁরা সম্পূর্ণ তৈরি বা প্রায় তৈরি বাড়ি পছন্দ করেন। অর্থাৎ, একেবারে নির্মীয়মাণ বা সদ্য লঞ্চ হওয়া প্রকল্পের তুলনায় এমন বাড়িই তাঁদের বেশি পছন্দ, যেখানে দ্রুত হাতে চাবি পাওয়া সম্ভব।
এর কারণও স্পষ্ট। তৈরি বাড়ি হলে ক্রেতা নিজের চোখে বাড়িটি দেখতে পারেন। নির্মাণ কতটা হয়েছে, আশপাশের পরিবেশ কেমন এবং কবে বাড়িতে ওঠা যাবে, সে সম্পর্কে তুলনামূলক পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
TREVOC Group-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর সেহজ চাওলা জানিয়েছেন, ক্রেতারা এখন বাড়ি কেনার আগে অনেক বেশি সতর্ক হয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তাঁরা শুধু বাড়ি নয়, কী কিনছেন এবং কবে সেখানে থাকতে পারবেন, সে বিষয়েও নিশ্চিত হতে চাইছেন।
কম বয়সি ক্রেতারা ঝুঁকি নিতে বেশি রাজি
সমীক্ষায় বয়সের ভিত্তিতেও একটি বড় পার্থক্য ধরা পড়েছে। ৩০ বছরের কম বয়সি প্রায় অর্ধেক ক্রেতা নির্মীয়মাণ প্রকল্পে বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে রাজি। এর অন্যতম কারণ, নির্মাণের একেবারে শুরুর দিকে অনেক সময় তুলনামূলক কম দামে বাড়ি কেনার সুযোগ পাওয়া যায়। অন্যদিকে ৩০ বছরের বেশি বয়সি উত্তরদাতাদের মধ্যে মাত্র ৩৬ শতাংশ এই ধরনের নির্মাণজনিত ঝুঁকি নিতে স্বচ্ছন্দ।
অর্থাৎ, তরুণ ক্রেতাদের মধ্যে কম দামে বাড়ি পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করার প্রবণতা কিছুটা বেশি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত বাড়ি হাতে পাওয়া এবং ঝুঁকি কমানোর বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
বাড়ির সঙ্গে কী কী সুবিধা চান ক্রেতারা?
শুধু ফ্ল্যাটের ভিতরের সুবিধা নয়, gated community-তে কী কী সুযোগ রয়েছে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ। সমীক্ষা অনুযায়ী, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ক্রেতাদের সবচেয়ে পছন্দের সুবিধাগুলির মধ্যে রয়েছে। এর পরে রয়েছে সবুজ ও খোলা জায়গা এবং কমিউনিটি ও লাইফস্টাইল। আবার ৩০ বছরের কম বয়সি ক্রেতাদের মধ্যে ফিটনেস ও ভালো থাকার চাহিদাও বেশি। তাঁদের কাছে এই ধরনের সুবিধার গুরুত্ব সামগ্রিক গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
উৎসবের মরশুমে আবাসনে বাড়তে পারে চাহিদা
Colliers-এর এই সমীক্ষা থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট, বাড়ি কেনার আগ্রহ এখনও রয়েছে। তবে আগের তুলনায় ক্রেতারা অনেক বেশি হিসেব করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। দাম, বাড়ির আয়তন, লোকেশন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সুযোগ-সুবিধা এবং জায়গা, এই সবকিছু মিলিয়েই এখন বাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তাঁরা।
ফলে আবাসন নির্মাতাদের কাছেও চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। শুধু নতুন প্রকল্প ঘোষণা করলেই ক্রেতা পাওয়া যাবে না। দাম এবং গুণমানের পাশাপাশি ক্রেতাকে বাড়িটি কবে হাতে দেওয়া হবে, আশপাশের পরিবেশ কেমন এবং দৈনন্দিন জীবনে সেটি কতটা সুবিধাজনক- এসব প্রশ্নেরও উত্তর দিতে হবে। উৎসবের মরশুম সামনে। ফলে আগামী কয়েক মাসে আবাসন বাজারে ক্রেতাদের আগ্রহ কতটা বাস্তব বিক্রিতে পরিণত হয়, এখন সেটাই দেখার।