প্রতীকী ছবি চাকরি ছাড়া মুখের কথা হলেও, বাস্তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একাধিক জটিলতা ও প্রশ্ন। নতুন বা আরও ভাল কোনও সুযোগ পেলে অনেকেই বর্তমান সংস্থা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর তখনই সামনে আসে ‘নোটিস পিরিয়ড’-এর বিষয়টি। ৩০, ৬০ নাকি ৯০ দিন- নোটিস পিরিয়ড কি সম্পূর্ণ করতেই হবে? নাকি তার আগেই সংস্থা ছাড়া যায়? ভারতের শ্রম আইনে এ নিয়ে নির্দিষ্ট কী বলা রয়েছে, তা জেনে রাখা প্রত্যেক চাকুরিজীবীর জন্যই অত্যন্ত জরুরি।
আইনে কি নোটিস পিরিয়ড বাধ্যতামূলক?
ভারতে এমন কোনও একক বা নির্দিষ্ট আইন নেই যা প্রত্যেক কর্মীর জন্য একই রকম নোটিস পিরিয়ড বাধ্যতামূলক করে। মূলত চাকরির শুরুতে যে চুক্তিতে (Employment Agreement) স্বাক্ষর করা হয়, নোটিস পিরিয়ড সম্পূর্ণভাবে তারই উপর নির্ভর করে। অর্থাৎ, অফার লেটার বা চুক্তিতে যদি ৩০ বা ৯০ দিনের নোটিস পিরিয়ডের কথা উল্লেখ থাকে, তবে সেই নিয়মই কার্যকর হবে। বেসরকারি সংস্থাগুলিতে সাধারণত এই ব্যবস্থাই মেনে চলা হয়। এমনকি নতুন শ্রম বিধিতেও সব কর্মীর জন্য নোটিস পিরিয়ড বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
নোটিস পিরিয়ড শেষ না করলে কি মামলা হতে পারে?
অনেকেই ভয় পান যে, নোটিস পিরিয়ড সম্পূর্ণ না করে চাকরি ছাড়লে সংস্থা হয়তো আইনি ব্যবস্থা নেবে বা পুলিশি ঝামেলায় জড়াতে হবে। তবে বাস্তব হল, এ ধরনের ঘটনা কোনও ফৌজদারি (Criminal) অপরাধ নয়। কর্মী যদি চুক্তি ভঙ্গ করেন, তবে সংস্থা শুধুমাত্র দেওয়ানি বা সিভিল পদক্ষেপ করতে পারে। অর্থাৎ, বিষয়টি আর্থিক জরিমানা বা ‘ব্রীচ অফ কন্ট্র্যাক্ট’-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। সহজ কথায়, কেবল নোটিস পিরিয়ড পূরণ না করার জন্য কোনও কর্মীকে জেলে পাঠানো যায় না।
আইন ঠিক কী বলছে?
আইন অনুযায়ী, কোনও সংস্থাই কোনও কর্মীকে জোর করে আটকে রেখে কাজ করাতে পারে না। এর পিছনে বেশ কয়েকটি আইনি ভিত্তি রয়েছে:
স্পেসিফিক রিলিফ অ্যাক্ট, ১৯৬৩ (Specific Relief Act, 1963): এই আইনের ১৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী, ‘পার্সোনাল সার্ভিস কন্ট্র্যাক্ট’ বা ব্যক্তিগত পরিষেবার চুক্তি জোর করে কার্যকর করা যায় না। অর্থাৎ, কর্মী চাকরি ছাড়তে চাইলে সংস্থা তাঁকে আদালতে টেনে নিয়ে গিয়ে অফিসে আসতে বাধ্য করতে পারে না।
কোড অন ওয়েজেস, ২০১৯ (Code on Wages, 2019): এই আইনের ১৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কর্মীকে নির্দিষ্ট সময়ে বেতন দেওয়া বাধ্যতামূলক। সংস্থা যদি বেতন আটকে রাখে বা অত্যন্ত দেরিতে দেয়, তবে কর্মী এটিকে চুক্তিভঙ্গ হিসেবে ধরে নিয়ে অবিলম্বে চাকরি ছাড়তে পারেন।
ইন্ডিয়ান কন্ট্র্যাক্ট অ্যাক্ট, ১৮৭২ (Indian Contract Act, 1872): নোটিস পিরিয়ড পূরণ না করলে তা মূলত এই আইনের আওতায় ‘চুক্তিভঙ্গ’ বা ব্রীচ অফ কন্ট্র্যাক্ট হিসেবে গণ্য হয়। আগেই বলা হয়েছে, এটি কোনও অপরাধমূলক কাজ নয়, ফলে সংস্থা এক্ষেত্রে কেবল আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা ‘নোটিস পে’ দাবি করতে পারে।
‘নোটিস পে’ আসলে কী?
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: অনেক সংস্থাই কর্মীদের এই বিকল্প দিয়ে থাকে যে, তাঁরা যদি পুরো নোটিস পিরিয়ড কাজ করতে না চান, তবে তার বদলে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা সংস্থাকে দিয়ে অব্যাহতি পেতে পারেন। একেই বলা হয় 'নোটিস পে'। উদাহরণস্বরূপ, যদি কারও চুক্তিতে ৬০ দিনের নোটিস পিরিয়ড থাকে এবং তিনি অবিলম্বে অব্যাহতি চান, তবে সংস্থা তাঁর চূড়ান্ত বেতন (Full and Final Settlement) থেকে ওই ৬০ দিনের সমতুল্য টাকা কেটে নিতে পারে।
কোন পরিস্থিতিতে অবিলম্বে চাকরি ছাড়া যায়?
এমন কিছু পরিস্থিতি রয়েছে যেখানে কর্মী নোটিস পিরিয়ড সম্পূর্ণ না করেই চাকরি ছাড়তে পারেন এবং আইনও কর্মীর পাশে দাঁড়ায়:
সংস্থা নিয়মিত বেতন না দিলে বা কয়েক মাস ধরে বেতন আটকে রাখলে।
অফিসের পরিবেশ অত্যন্ত খারাপ বা বিষাক্ত (Toxic Work Culture) হলে।
কর্মীর উপর মানসিক নির্যাতন বা দুর্ব্যবহার করা হলে।
সংস্থা কি বেতন বা ‘এক্সপেরিয়েন্স লেটার’ আটকে রাখতে পারে?
চাকরি ছাড়ার সময় কর্মীদের সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ থাকে বকেয়া বেতন এবং অভিজ্ঞতার শংসাপত্র (Experience Letter)। আইন অনুযায়ী, সংস্থা কোনও কর্মীর পরিশ্রমের অর্জিত বেতন আটকে রাখতে পারে না। চাকরি ছাড়ার পর একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বকেয়া মিটিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে চুক্তি অনুযায়ী নোটিস পিরিয়ড পূরণ না করলে, চূড়ান্ত পাওনা থেকে ‘নোটিস পে’ কেটে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সম্পূর্ণ বেতন আটকে রাখা সম্পূর্ণ বেআইনি। একইভাবে, কোনও কারণ দেখিয়েই সংস্থা কর্মীর ‘এক্সপেরিয়েন্স লেটার’ আটকে রাখতে পারে না।
চাকরি ছাড়ার আগে কী করবেন?
চাকরি ছাড়ার পরিকল্পনা থাকলে প্রথমেই নিজের এমপ্লয়মেন্ট কন্ট্র্যাক্ট বা নিয়োগপত্রটি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। সেখানে নোটিস পিরিয়ড, নোটিস পে এবং চূড়ান্ত পাওনা মেটানোর নিয়মাবলি স্পষ্টভাবে লেখা থাকে। নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে বর্তমান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা জরুরি। পেশাদারি সম্পর্ক বজায় রাখলে তা ভবিষ্যতের কেরিয়ারের জন্য সবসময়ই লাভজনক হয়।
ভারতে বেশিরভাগ কর্মীর জন্যই নোটিস পিরিয়ড কোনও কঠোর আইনি নিয়ম নয়, বরং এটি রোজগার চুক্তির একটি অংশ মাত্র। নোটিস পিরিয়ড সম্পূর্ণ না করলে জেলের সাজা হয় না ঠিকই, তবে আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। তাই সবদিক বিবেচনা করে, সঠিক তথ্যের উপর ভিত্তি করেই চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।