
অনলাইনে ব্যাঙ্ক জালিয়াতির শিকার হলে এতদিন গ্রাহকদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, খোয়া যাওয়া টাকা কি আদৌ ফেরত পাওয়া যাবে? অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাঙ্ক এবং গ্রাহকের মধ্যে দায় কার, তা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক চলত। এবার সেই সমস্যার সমাধানে বড় পদক্ষেপ করল ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI)।
বুধবার RBI ‘Reserve Bank of India (Commercial Banks - Responsible Business Conduct) Third Amendment Directions, 2026’ জারি করেছে। এই নতুন নিয়ম ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে কার্যকর হবে এবং ওই তারিখের পর হওয়া সমস্ত ইলেকট্রনিক ব্যাঙ্কিং লেনদেনের (EBT) ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
এই নিয়ম বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও স্মল ফিনান্স ব্যাঙ্ক, পেমেন্টস ব্যাঙ্ক, আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাঙ্ক (RRB) এবং লোকাল এরিয়া ব্যাঙ্ক এর আওতার বাইরে থাকবে।
RBI-এর ভাষায় EBT বা Electronic Banking Transaction-এর মধ্যে থাকবে UPI, নেট ব্যাঙ্কিং, মোবাইল ব্যাঙ্কিং, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অনলাইন ও অফলাইন পেমেন্ট।
জালিয়াতির ঘটনায় দায় কার?
নতুন নির্দেশিকায় স্পষ্ট জানানো হয়েছে, জালিয়াতির ঘটনায় গ্রাহকের দায় রয়েছে কি না, তা প্রমাণ করার দায়িত্ব ব্যাঙ্কের। RBI জানিয়েছে, প্রতারণামূলক ইলেকট্রনিক লেনদেন সংক্রান্ত অভিযোগে গ্রাহকের দায় প্রমাণ করার দায়িত্ব ব্যাঙ্কের।
ব্যাঙ্কের গাফিলতিতে জালিয়াতি হলে?
যদি ব্যাঙ্কের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি, প্রযুক্তিগত সমস্যা বা প্রতারণা সংক্রান্ত সতর্কবার্তা পাঠাতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে জালিয়াতি ঘটে, তবে গ্রাহকের কোনও দায় থাকবে না। এমন পরিস্থিতিতে গ্রাহক সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত পাবেন, এমনকী, তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে রিপোর্ট না করলেও পাবেন।
তৃতীয় পক্ষের কারণে জালিয়াতি হলে?
যদি জালিয়াতির জন্য দায়ী হয় কোনও পেমেন্ট অ্যাপ, পেমেন্ট গেটওয়ে, টেলিকম পরিষেবা সংস্থা বা অন্য কোনও তৃতীয় পক্ষ এবং গ্রাহক বা ব্যাঙ্কের কোনও দোষ না থাকে, তাহলে গ্রাহক পুরো টাকা ফেরত পাবেন। তবে শর্ত একটাই, ঘটনার ৫ দিনের মধ্যে ব্যাঙ্ককে বিষয়টি জানাতে হবে। সময়সীমা পেরনোর পর অভিযোগ জানালে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কের নিজস্ব নীতির উপর নির্ভর করবে।
গ্রাহকের ভুল থাকলেও মিলতে পারে ক্ষতিপূরণ
গ্রাহকের কিছুটা গাফিলতি থাকলেও তিনি ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন। ধরা যাক, কোনও গ্রাহক ফিশিং লিঙ্কে ক্লিক করেছেন, OTP শেয়ার করেছেন অথবা ভুয়ো অ্যাপ ডাউনলোড করেছেন। সেক্ষেত্রে যদি ক্ষতির পরিমাণ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে হয় এবং দ্রুত অভিযোগ জানানো হয়, তাহলে ক্ষতিপূরণের সুযোগ রয়েছে।
RBI জানিয়েছে, একজন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, যার ক্ষতির পরিমাণ সর্বাধিক ৫০ হাজার টাকা, তিনি জীবনে একবার সম্পূর্ণ খোয়া যাওয়া অর্থের ৮৫ শতাংশ অথবা সর্বাধিক ২৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে ২টি শর্ত রয়েছে। প্রথমত, দাবিটি প্রকৃত হতে হবে এবং ব্যাঙ্ক তা যাচাই করবে। দ্বিতীয়ত, ঘটনার ৫ দিনের মধ্যে সাইবার ক্রাইম পোর্টালে অভিযোগ জানাতে হবে অথবা ১৯৩০ নম্বরে ফোন করতে হবে এবং ব্যাঙ্ককেও জানাতে হবে।
কোনও গ্রাহক যদি ৪০ হাজার টাকা হারান এবং ব্যাঙ্ক পরে ১৫ হাজার টাকা উদ্ধার করে ফেরত দেয়, তাহলে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২৫ হাজার টাকা। সেই ক্ষেত্রে গ্রাহক ২১ হাজার ২৫০ টাকা। যা সম্পূর্ণ খোয়া যাওয়া অর্থের ৮৫ শতাংশ।
ক্ষতিপূরণের টাকা কে দেবে?
সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক হল, ক্ষতিপূরণের পুরো বোঝা শুধু ব্যাঙ্কের উপর চাপানো হয়নি। RBI নিজেও অর্থ দেবে। যেসব ক্ষেত্রে ক্ষতির পরিমাণ ২৯ হাজার ৪১২ টাকার কম এবং ক্ষতিপূরণ সম্পূর্ণ খোয়া যাওয়া অর্থের ৮৫ শতাংশ হিসেবে নির্ধারিত হবে, সেখানে ৬৫ শতাংশ দেবে RBI। ১০ শতাংশ দেবে গ্রাহকের ব্যাঙ্ক। ১০ শতাংশ দেবে যে ব্যাঙ্কে প্রতারিত অর্থ গিয়েছে, অর্থাৎ বেনিফিশিয়ারি ব্যাঙ্ক।
অন্যদিকে, ২৯ হাজার ৪১২ টাকা থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে ক্ষতির ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে। সেই ক্ষেত্রে RBI দেবে ১৯ হাজার ১১৮ টাকা, গ্রাহকের ব্যাঙ্ক দেবে ২ হাজার ৯৪১ টাকা এবং বেনিফিশিয়ারি ব্যাঙ্ক দেবে ২ হাজার ৯৪১ টাকা।
তবে এই ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা স্থায়ী নয়। RBI জানিয়েছে, এই সুবিধা নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর প্রথম এক বছরের মধ্যে সংঘটিত জালিয়াতির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে।
অভিযোগ জানানোর জন্য ২৪ ঘণ্টার ব্যবস্থা
এর মধ্যে থাকবে ফোন ব্যাঙ্কিং
SMS
ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং
নির্দিষ্ট ই-মেল আইডি
IVR পরিষেবা
টোল-ফ্রি হেল্পলাইন
হোম ব্রাঞ্চে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা
এছাড়া প্রতিটি লেনদেন সংক্রান্ত SMS-এর মধ্যেই প্রতারণা জানানোর জন্য ফোন নম্বর দিতে হবে। ব্যাঙ্কের ওয়েবসাইট এবং মোবাইল অ্যাপেও সরাসরি অভিযোগ জানানোর লিঙ্ক রাখতে হবে। অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাঙ্ককে একটি স্বীকৃতি নম্বর বা অভিযোগ নম্বর দিতে হবে। দেশের মধ্যে সংঘটিত জালিয়াতির তদন্ত ৪৫ দিনের মধ্যে এবং আন্তর্জাতিক জালিয়াতির ক্ষেত্রে ৬০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে।
তদন্ত চলাকালীন গ্রাহককে সাময়িক স্বস্তি
নতুন নিয়মে ‘শ্যাডো রিভার্সাল’ নামে একটি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই ব্যাঙ্ক সাময়িকভাবে গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে ওই অর্থের সমপরিমাণ টাকা ক্রেডিট করবে। যদিও এই অর্থ গ্রাহক ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে এর উপর কোনও সুদ বা অতিরিক্ত চার্জ দিতে হবে না। বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির ক্ষেত্রে অভিযোগ পাওয়ার ৫ দিনের মধ্যে এই শ্যাডো রিভার্সাল দিতে হবে। পরবর্তীতে তদন্তে জালিয়াতির প্রমাণ মিললে অর্থ ফেরতের তারিখ মূল লেনদেনের তারিখ হিসেবেই ধরা হবে, যাতে গ্রাহকের সুদের কোনও ক্ষতি না হয়।
৫০০ টাকার বেশি লেনদেনে বাধ্যতামূলক SMS
RBI জানিয়েছে, ৫০০ টাকার বেশি সমস্ত ইলেকট্রনিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যাঙ্ককে বাধ্যতামূলকভাবে তাৎক্ষণিক SMS পাঠাতে হবে। ৫০০ টাকার কম লেনদেনের ক্ষেত্রে SMS পাঠানো হবে কি না, তা ব্যাঙ্ক নিজেই ঠিক করবে। তবে যদি SMS পাঠানো হয়, তার জন্য গ্রাহকের কাছ থেকে কোনও অর্থ নেওয়া যাবে না। এছাড়া RBI স্পষ্ট জানিয়েছে, নিয়ন্ত্রক নির্দেশিকা অনুযায়ী পাঠানো SMS, প্রচারমূলক বার্তা বা গ্রাহক সচেতনতা সংক্রান্ত SMS-এর জন্য কোনও ব্যাঙ্ক গ্রাহকের কাছ থেকে চার্জ নিতে পারবে না।
গ্রাহকদের কী করতে হবে?
কোনও অননুমোদিত লেনদেন নজরে এলে অবিলম্বে ব্যাঙ্ককে জানাতে হবে। জাতীয় সাইবার ক্রাইম পোর্টালে অভিযোগ জানাতে হবে অথবা ১৯৩০ নম্বরে ফোন করতে হবে।