কোথাও ব্যারিকেড ভাঙছে, কোথাও ধাক্কাধাক্কি, কোথাও আবার পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে ফেলতে হচ্ছে কাঁদানে গ্যাস। ৪০ হাজার টাকার ঘড়ি কিনতে রাতভর লাইন। কোথাও ব্যারিকেড ভাঙছে, কোথাও ধাক্কাধাক্কি, কোথাও আবার পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে ফেলতে হচ্ছে কাঁদানে গ্যাস। দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু থেকে দুবাই, লন্ডন, নিউ ইয়র্ক; একটি পকেট ঘড়ি নিয়ে এমন উন্মাদনা দেখে হতবাক অনেকেই। কী এমন রয়েছে এই ঘড়িতে?
আসলে এটি সাধারণ কোনও ঘড়ি নয়। সুইজ়ারল্যান্ডের বিলাসবহুল ঘড়ি প্রস্তুতকারী সংস্থা অডেমার পিগে এবং স্বচ যৌথ ভাবে একটি বিশেষ কালেকশন বাজারে এনেছে। অডেমার পিগের ঘড়ি সাধারণত কয়েক লক্ষ থেকে কয়েক কোটি টাকার মধ্যে বিক্রি হয়। সেই ব্র্যান্ডের ডিজ়াইন এবার তুলনায় অনেক কম দামে, প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকায় বাজারে আসতেই হুড়োহুড়ি পড়ে যায় ক্রেতাদের মধ্যে।
সংস্থার কৌশলও এই উন্মাদনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞদের একাংশ। কারণ এই ঘড়ি অনলাইনে বিক্রি করা হয়নি। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কয়েকটি স্টোরে সীমিত সংখ্যক পিস রাখা হয়েছিল। ফলে আগে এলে আগে পাওয়া; এই মানসিকতা থেকেই রাতভর লাইনে দাঁড়ান বহু মানুষ।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে, দোকানের বাইরে উপচে পড়া ভিড়। কোথাও ব্যারিকেড ভেঙে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করছেন ক্রেতারা। কোথাও আবার শুরু হয়েছে ধাক্কাধাক্কি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ মোতায়েন করতে হয়।
ফ্রান্সে পরিস্থিতি সবচেয়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে খবর। সেখানে একটি স্টোরের বাইরে কয়েকশো মানুষ জড়ো হন। ভিড় নিয়ন্ত্রণে আনতে শেষ পর্যন্ত কাঁদানে গ্যাস ফেলতে হয় পুলিশকে। নিরাপত্তার কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয় দোকান। ইউরোপের আরও কয়েকটি শহরেও হাতাহাতির পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে জানা গিয়েছে।
দুবাইয়ে নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে লঞ্চ অনুষ্ঠানই বাতিল করে দেয় সংস্থা। লন্ডনে একাধিক স্টোর সাময়িক ভাবে বন্ধ রাখতে হয়। নিউ ইয়র্কেও একই ছবি দেখা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে আশঙ্কায় দোকান বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ।
এত উন্মাদনা কেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর নেপথ্যে রয়েছে ‘লাক্সারি ব্র্যান্ডের অনুভূতি’। অডেমার পিগে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। কিন্তু সেই একই ব্র্যান্ডের নাম যখন তুলনামূলক কম দামের ঘড়ির সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন বহু মানুষের মনে হয়, তাঁরাও সেই বিলাসবহুল জগতের অংশ হতে পারবেন। ফলে ঘড়িটি শুধু সময় দেখার যন্ত্র নয়, বরং স্টেটাস সিম্বল হয়ে উঠেছে।
শুধু তাই নয়, এই ঘড়িকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ‘রিসেল মার্কেট’-ও। অনেকেই ঘড়িটি কিনে পরে বেশি দামে বিক্রি করার পরিকল্পনা করছেন। বাজারে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বাড়তি দামে ঘড়িটি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখা গিয়েছে। ফলে এটি এখন শুধুই ফ্যাশনের বিষয় নয়, বরং বিনিয়োগ এবং দ্রুত লাভের সুযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে বহু সংস্থাই ইচ্ছাকৃত ভাবে ‘লিমিটেড স্টক’ এবং ‘অফলাইন এক্সক্লুসিভ’ কৌশল নিচ্ছে। এতে ক্রেতাদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি হয়। মনে হয়, এখন না কিনলে আর সুযোগ মিলবে না। সেই সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিড়ের ভিডিয়ো ভাইরাল হওয়ায় আরও মানুষ আকৃষ্ট হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, এখন মানুষ শুধু কোনও পণ্য কিনছেন না। কিনছেন এক ধরনের অনুভূতি। “আমার কাছেও আছে”; এই মানসিকতাই এখন বাজারের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে। আর সেই আবেগকেই কাজে লাগাচ্ছে বড় বড় ব্র্যান্ডগুলি।