
দিনের আলোতেও তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত ‘মঙ্গল গ্রহের মতো’ পরিবেশ।হঠাৎ যেন সিনেমার দৃশ্য! দিনের আলোয় আকাশ হয়ে গেল রক্তলাল। অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম উপকূলে এমনই অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখে হতবাক স্থানীয় বাসিন্দারা। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে সেই ভিডিও; অনেকে ভেবেছেন ফিল্টার ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল এক বিরল প্রাকৃতিক ঘটনা।
ঘটনাটি ঘটেছে ২৭ মার্চ, ২০২৬-এ, Western Australia-এর Shark Bay ও Pilbara অঞ্চলে। আকাশের এই অদ্ভুত রঙ পরিবর্তনের কারণ ছিল শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় Tropical Cyclone Narelle।

ঠিক কী ঘটেছিল?
এই ঘূর্ণিঝড় উপকূলের দিকে এগোতে থাকতেই তীব্র হাওয়া অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ শুষ্ক অঞ্চল, অর্থাৎ Australian Outback থেকে বিপুল পরিমাণ লালচে ধুলো উড়িয়ে নিয়ে আসে। সেই ধুলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং সূর্যের আলোকে এক বিশেষ ভাবে ফিল্টার করতে শুরু করে। ফল; পুরো আকাশ জুড়ে রক্তিম আভা।
আকাশ লাল হয়ে গেল কেন?
সাধারণত আকাশ নীল দেখায় Rayleigh scattering-এর কারণে। সূর্যের আলো বায়ুমণ্ডলের ক্ষুদ্র কণার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে নীল রং বেশি ছড়িয়ে দেয়।
কিন্তু এই ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা ছিল। বাতাসে ধুলো ও খনিজ কণার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় শুরু হয় Mie scattering। এই প্রক্রিয়ায় বড় কণাগুলি ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের নীল আলোকে আটকে দেয় এবং লাল আলো বেশি প্রতিফলিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই অঞ্চলের মাটিতে থাকা আয়রন অক্সাইড বা হেমাটাইট কণাই এই লাল রঙকে আরও তীব্র করেছে। ফলে দিনের আলোতেও তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত ‘মঙ্গল গ্রহের মতো’ পরিবেশ।
এই ধরনের ঘূর্ণিঝড় কতটা বিরল?
আবহবিদদের মতে, Tropical Cyclone Narelle ছিল অত্যন্ত বিরল। ইতিহাসে খুব কম ঝড়ই এমনভাবে একাধিক উপকূল অতিক্রম করেছে। কুইন্সল্যান্ড থেকে শুরু করে নর্দার্ন টেরিটরি হয়ে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত এর গতিপথ বিস্তৃত ছিল।
ঝড়টি স্থলভাগে আছড়ে পড়ার আগে ক্যাটেগরি ৩-৪ মাত্রায় পৌঁছেছিল। ঘণ্টায় ১২৫ কিলোমিটারের বেশি বেগে হাওয়া বইতে শুরু করে। ভারী বৃষ্টিও হয়। তবে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে ঝড়ের আগেই তৈরি হওয়া ধুলোর এই ভয়ংকর দৃশ্য।
পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকি
এই ধরনের ধুলিঝড় শুধু দেখতেই ভয়ংকর নয়, এর প্রভাবও মারাত্মক হতে পারে। বাতাসে অতিরিক্ত খনিজ ধুলো মিশে গেলে বায়ুদূষণ বেড়ে যায়। এতে শ্বাসকষ্ট, চোখের জ্বালা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এছাড়া দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় পরিবহণেও সমস্যা তৈরি হয়। বিজ্ঞানীরা আরও বলছেন, এই ধুলো সমুদ্রে মিশে গিয়ে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ভবিষ্যতে কি এমন ঘটনা বাড়বে?
জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে আবহাওয়ার চরমতা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা এবং শুষ্ক এলাকার বিস্তার বাড়লে এই ধরনের ধুলিঝড় ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন দেখা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, অস্ট্রেলিয়ার এই ‘রক্তলাল আকাশ’ শুধু বিরল দৃশ্যই নয়, বরং প্রকৃতির এক সতর্কবার্তা বলেই মনে করছেন পরিবেশবিদরা।