ঝড় শিলাবৃষ্টিতে বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গHailstorm disaster North Bengal 2026:মঙ্গলবার বিকেলে ডুয়ার্সের নাগরাকাটা এবং সোমবার রাতে গৌড়বঙ্গের কুমারগঞ্জ ব্লকে মাত্র আধ ঘণ্টার শিলাবৃষ্টিতে কয়েক হাজার ঘরবাড়ি এখন বাসের অযোগ্য। আকাশের থেকে ঝরে পড়া বড় বড় শিলার আঘাতে সাধারণ মানুষের মাথার ওপরের টিনের চাল আক্ষরিক অর্থেই শতছিদ্র হয়ে গিয়েছে। ডুয়ার্সের নাগরাকাটা থেকে দক্ষিণ দিনাজপুরের কৃষি খেত, সর্বত্রই এখন হাহাকার আর ধ্বংসের চিহ্ন।
নাগরাকাটার সুলকাপাড়া ও আংরাভাসা এলাকার পরিস্থিতি সবথেকে ভয়াবহ। সুলকাপাড়ার বুনি খাতুন বা মালতি হাসদাদের মতো বাসিন্দারা এখন খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে চোখের জল ফেলছেন। তাঁদের ঘরভর্তি বৃষ্টির জল, ভিজে নষ্ট হয়ে গিয়েছে সামান্য বিছানাপত্র ও সঞ্চিত খাদ্যশস্য। তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বের মতে, এমন বিপর্যয় আগে দেখা যায়নি। নাগরাকাটার বিডিও জয়প্রকাশ মণ্ডল জানিয়েছেন, বিপর্যস্ত এলাকাগুলির ক্ষয়ক্ষতি খতিয়ে দেখে দ্রুত রিপোর্ট তৈরির কাজ শুরু করেছে প্রশাসন।
জনজীবনের পাশাপাশি শিলাবৃষ্টির মারে বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে ডুয়ার্সের প্রাণভোমরা চা শিল্প। বানারহাট ও মালবাজার এলাকার মোগলকাটা, হলদিবাড়ি ও রাণিচেড়া চা বাগানে সবে নতুন কুঁড়ি আসার মুখেই সব ঝরে পড়েছে। চা বিজ্ঞানীদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। তাঁদের আশঙ্কা, শিলার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত গাছগুলিতে পরবর্তীতে ছত্রাক ও নানা রোগের আক্রমণ হতে পারে, যা আগামী মরশুমে চায়ের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেবে। চা বাগান কর্তৃপক্ষগুলি এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন।
অন্যদিকে গৌড়বঙ্গের পরিস্থিতিও সমান উদ্বেগজনক। কুমারগঞ্জ, হিলি ও বালুরঘাটে বিঘার পর বিঘা জমির গম এবং আমের মুকুল শিলার আঘাতে মাটিতে মিশে গিয়েছে। কৃষকদের দীর্ঘ পরিশ্রমের ফসল এখন স্রেফ ধ্বংসস্তূপ। কুমারগঞ্জের বিডিও শ্রীবাস বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে সরকারি সাহায্যের আশ্বাস দিলেও, ফসল হারিয়ে কৃষকরা এখন দিশেহারা। মাঝিয়ান আবহাওয়া দপ্তরের মতে, সোমবার রাতে দমকা হাওয়ার গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ৩৯ কিলোমিটার, যা শিলার বিধ্বংসী ক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আলিপুরদুয়ার জেলাতেও হানা দিয়েছে দুর্যোগ। ফালাকাটা ও আলিপুরদুয়ার-১ ব্লকের পলাশবাড়ি ও শালকুমারহাট এলাকায় ব্যাপক শিলাবৃষ্টির খবর মিলেছে। শালকুমারহাটের বিখ্যাত করলা চাষ থেকে শুরু করে ভুট্টা খেত— সর্বত্রই ক্ষয়ক্ষতির ভ্রুকুটি। শিলাবৃষ্টির জেরে বহু এলাকায় বিদ্যুৎ পরিষেবা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে যায় গ্রামগুলি। বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থা অবশ্য যুদ্ধকালীন তৎপরতায় পরিষেবা স্বাভাবিক করার কাজ শুরু করেছে।
আবহাওয়া দপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এখনই এই অস্থিরতা কাটার কোনও লক্ষণ নেই। আগামী ২১ ও ২২ মার্চ পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ বসন্তের শুরুতেই এই মেঘ-বৃষ্টির খেলা সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তা আরও বাড়াবে। প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনায় একদিকে যেমন গৃহহীন হাজার হাজার মানুষ, তেমনই চা শিল্প ও কৃষিতে কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সব মিলিয়ে উত্তরবঙ্গের সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলি এখন প্রকৃতির কামড়ে রক্তাক্ত। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ ও ত্রিপল বিলির কাজ শুরু হলেও, দুর্যোগ কবলিত মানুষের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে ডুয়ার্সের বাতাস। মঙ্গলবার রাত থেকেই অনেক এলাকায় খোলা আকাশের নিচে পাহারায় বসেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। কবে এই দুর্যোগ কাটবে এবং কবে আবার তাঁরা মাথা গোঁজার নিরাপদ আশ্রয় ফিরে পাবেন, এখন সেই অপেক্ষায় প্রহর গুনছে পাহাড় ও সমতলের মানুষ।