খগেশ্বর রায়Khageswar Roy: মঙ্গলবার কালীঘাট থেকে ২০২৬-এর প্রার্থী তালিকা ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই মেঘ জমছিল রাজগঞ্জের আকাশে। চার বারের বিধায়ক খগেশ্বর রায়ের বদলে সেখানে প্রার্থী করা হয়েছিল অর্জুন পুরস্কারপ্রাপ্ত অ্যাথলিট স্বপ্না বর্মনকে। ব্রাত্য হওয়ার খবর পেতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন বর্ষীয়ান এই নেতা। জলপাইগুড়ি জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পাশাপাশি রীতিমতো চরমপত্র দিয়েছিলেন তিনি। এমনকি রাজগঞ্জ ব্লকের সিংহভাগ নেতৃত্বও খগেশ্বরের অনুগামী হয়ে গণ-ইস্তফার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিলেন খগেশ্বরবাবু, যা নিয়ে উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে তীব্র উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছিল।
পরিস্থিতি হাতের বাইরে যাচ্ছে দেখে বুধবার রাতেই আসরে নামেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলীয় সূত্রে খবর, খগেশ্বর রায়কে ফোন করে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। দলের জন্মলগ্ন থেকে পাশে থাকা এই পুরনো যোদ্ধাকে মমতা আশ্বস্ত করেন যে, নির্বাচনে প্রার্থী না করলেও দলেই তাঁর যথাযোগ্য সম্মান বজায় রাখা হবে। নেত্রীর সেই সস্নেহ প্রশ্রয় আর রাজনৈতিক বার্তার পরেই বরফ গলতে শুরু করে। বৃহস্পতিবার বেলাকোবায় নিজের বাসভবনে জেলা নেতৃত্বের উপস্থিতিতে খগেশ্বর রায় সাফ জানান, দলের ঊর্ধ্বে কেউ নন এবং তিনি দলনেত্রীর নির্দেশ শিরোধার্য করে স্বপ্না বর্মনের হয়েই প্রচারে নামবেন।
খগেশ্বর রায়ের এই মানভঞ্জনে আক্ষরিক অর্থেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল জেলা তৃণমূল নেতৃত্ব। কারণ, খগেশ্বরবাবু যদি নির্দল হিসেবে লড়তেন বা নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতেন, তবে রাজগঞ্জের মতো কঠিন আসনে তৃণমূলের জয় পাওয়া দুরূহ হয়ে পড়ত। খগেশ্বরবাবুর মতো পোড়খাওয়া রাজনীতিকের অভিজ্ঞতাকে নির্বাচনের কাজে লাগানোই এখন দলের প্রধান লক্ষ্য। নেত্রীর হস্তক্ষেপে রাজগঞ্জের বিদ্রোহ থমকে যাওয়ায় এখন স্বস্তির হাওয়া উত্তরবঙ্গের শাসক শিবিরের অন্দরে।
খগেশ্বর রায়ের অনুগামীরাও নেত্রীর সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা জানিয়েছেন। সাংবাদিক বৈঠকে খগেশ্বরবাবু বলেন, “দলের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের আত্মিক সম্পর্ক। কিছু ক্ষোভ ছিল ঠিকই, কিন্তু দিদির সঙ্গে কথা বলার পর আর কোনও দ্বিধা নেই। রাজগঞ্জে জোড়াফুল ফোটাতে আমরা সবাই একজোট হয়ে লড়ব।” এই ঘোষণার পরেই রাজগঞ্জ জুড়ে দলীয় কর্মীদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গিয়েছে। স্বপ্নার নাম নিয়ে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল, তা মেটাতে এখন খগেশ্বর রায়ই প্রধান সেনাপতির ভূমিকা নেবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ব্যক্তিগত উদ্যোগ প্রমাণ করে দিল যে তিনি এখনও দলের পুরনো স্তম্ভদের গুরুত্ব দিতে পিছপা হন না। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় খগেশ্বরের মতো জনভিত্তি থাকা নেতাকে হাতছাড়া করা যে বোকামি হতো, তা ভালোই বুঝেছিল ঘাসফুল শিবির। খগেশ্বর রায়ের বিদ্রোহ থামিয়ে দিয়ে তৃণমূল আদতে রাজগঞ্জে বিজেপির মোকাবিলায় নিজেদের ঘর গুছিয়ে নিল।
এখন দেখার, এই ‘মানভঞ্জন’ নির্বাচনের ফলাফলে কতটা প্রভাব ফেলে। খগেশ্বর রায়ের অনুগামীরা কি সত্যিই মন থেকে স্বপ্না বর্মনকে মেনে নিয়ে মাঠে নামবেন? রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, নেত্রীর নির্দেশে প্রকাশ্যে ক্ষোভ মিটলেও নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখাটাই হবে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আপাতত রাজগঞ্জের রাজনৈতিক পারদ কিছুটা হলেও নামল, যা তৃণমূলের জন্য পরম স্বস্তির।