অকাল দুর্যোগের আশঙ্কাগত দুই-তিন দিন ধরে দিল্লি-এনসিআর ও উত্তর ভারতে বৃষ্টি হওয়ায় গরম থেকে স্বস্তি মিলছে।মার্চ মাসে দিল্লিতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ গত তিন বছরের রেকর্ড ভেঙেছে এবং তাপমাত্রা সাত ডিগ্রি কমেছে। এই অসময়ের বৃষ্টি শীতও ফিরিয়ে এনেছে। আগামী কয়েকদিনের জন্য ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি করা হয়েছে। প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ মেঘের চাদরটি উত্তর ভারতে মাঝারি বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে এখন পূর্ব ভারতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। পূর্ব দিকে অগ্রসর হওয়ার ফলে এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়বে, যা বিহার, ঝাড়খণ্ড এবং পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলিকে প্রভাবিত করবে
মার্চের শেষে বৃষ্টিপাত একটি অস্বাভাবিক ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে আবহাওয়ার ধরন ক্রমশ অপ্রত্যাশিত হয়ে উঠছে এবং এই ঘটনাটি ভারতজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের একটি প্রধান সূচক। হঠাৎ আবহাওয়া কেন এত অপ্রত্যাশিত হয়ে উঠেছে?
এই পরিবর্তনের পেছনের কারণ কী?
দিল্লি এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতে বর্তমান বৃষ্টিপাতের প্রধান কারণ একটি সক্রিয় পশ্চিমী ঝঞ্ঝা। এটি একটি সাইক্লোনিক সার্কুলেশন যা বর্তমানে উত্তর পাকিস্তানের উপর অবস্থান করছে। এই সিস্টেমটি শুধু বৃষ্টিপাত ঘটাচ্ছে না, সঙ্গে ঘণ্টায় ৪০-৮০ কিলোমিটার বেগে তীব্র বাতাসও বইয়ে দিচ্ছে। বেশ কয়েকটি রাজ্যে শিলাবৃষ্টিও হয়েছে, এবং হিমালয় অঞ্চলে হালকা থেকে মাঝারি তুষারপাতও হচ্ছে।
সাধারণ পশ্চিমী ঝঞ্ঝা থেকে কীভাবে আলাদা?
পশ্চিমা ঝঞ্ঝা সাধারণত ডিসেম্বর ও ফেব্রুয়ারি মাসের শীতকালে দেখা যায়। এগুলোর উৎপত্তি ভূমধ্যসাগরে এবং এগুলো উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে তুষারপাত ও শৈত্যপ্রবাহ বয়ে আনে। কিন্তু এ বছরের সিস্টেমটি আলাদা। এটি একটি সরল নিম্নচাপ তৈরি করেছে, যা ভারত, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের উপর প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বৃষ্টিবলয় সৃষ্টি করেছে।
এই সমস্ত আর্দ্রতা কোথা থেকে আসছে?
এই সিস্টেমটি মহাসাগরগুলো থেকে আর্দ্রতা গ্রহণ করে। এর প্রধান উৎসগুলো হলো ভূমধ্যসাগর, কাস্পিয়ান সাগর, কৃষ্ণসাগর এবং পারস্য উপসাগর। সিস্টেমটি ভারতের দিকে অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরব সাগরের আর্দ্রতা এটিকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
কেন এই উদ্বেগ?
এদিকে আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তান হয়ে ভারত— প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ মেঘের চাদরে ঢাকা পড়েছে তিন দেশ । আবহাওয়াবিদদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে এক অদ্ভুত ‘রৈখিক’ পশ্চিমী ঝঞ্ঝা, যার জেরে গ্রীষ্মের শুরুতে হাঁসফাঁস গরমের বদলে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি, কালবৈশাখী এবং শিলাবৃষ্টি। সাধারণত পশ্চিমী ঝঞ্ঝা ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে ঘুরে শীতকালে তুষারপাত ঘটায়। কিন্তু এবারের চিত্রটা সম্পূর্ণ আলাদা। সাধারণত শীতের শেষে ঝঞ্ঝার দাপট কমে এলেও, এবার মার্চের শেষে এসেও তা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ১,০০০ কিলোমিটার লম্বা এক সরলরেখার মতো নিম্নচাপ বলয় তৈরি হয়েছে, যা কার্যত বিরল। আবহাওয়া দফতরের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেই এই ধরনের খামখেয়ালি আচরণ বাড়ছে। এই বিশালাকার মেঘপুঞ্জ ইতিমধ্যেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তার প্রভাব দেখাতে শুরু করেছে। আবহাওয়াবিদরা আশঙ্কা করছেন, উত্তর-পশ্চিম ভারতে ব্যাপক বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির পাশাপাশি ঝোড়ো হাওয়া (ঘণ্টায় ৪০-৮০ কিমি) বইতে পারে। দিল্লি ও সংলগ্ন এলাকায় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকছে। উপ-হিমালয় পশ্চিমবঙ্গ এবং সিকিমে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি করা হয়েছে। অসম-সহ উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতেও দুর্যোগের পূর্বাভাস রয়েছে। কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরালা ও তামিলনাড়ুতেও ভারী বৃষ্টির দাপট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাজস্থান, হরিয়ানা এবং উত্তরপ্রদেশেও শিলাবৃষ্টির ভ্রুকুটি রয়েছে।
বাংলায় শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা
IMD শুক্রবার ও শনিবার পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলায় দমকা হাওয়া-সহ বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। আগামী কয়েকদিনে বেশিরভাগ জেলায় দিনের তাপমাত্রা ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমতে পারে। দক্ষিণবঙ্গের পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, হুগলি এবং হাওড়া জেলার এক বা দুটি স্থানে ঘণ্টায় ৬০-৭০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়াসহ বজ্রপাত, ঝড় এবং শিলাবৃষ্টি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। মৌসম ভবন জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত এবং উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং, কালিম্পং ও কোচবিহার জেলায় ভারী বৃষ্টিপাতের সতর্কতাও জারি করেছে। একটি বুলেটিনে বলা হয়েছে, শনিবার দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি এবং কালিম্পং জেলার এক বা দুটি স্থানে শিলাবৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। IMD আরও জানিয়েছে, শুক্র ও শনিবার কলকাতায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি এবং দমকা হাওয়া বইতে পারে।