যুবসাথী-র টাকা পেতে বিশেষ হেল্প ডেস্ক চালু করল CPIMযুবসাথী প্রকল্পের সুবিধা যাতে সহজে পাওয়া যায় তার জন্য ব্লক অফিস চত্বরে বিশেষ হেল্পডেস্ক ক্যাম্প চালু করেছে সিপিএম। দলীয় পতাকা টাঙিয়ে স্থানীয় কর্মীরা আবেদনপত্র পূরণে সহায়তা করছেন। অনেক ক্ষেত্রেই অনলাইন ফর্ম ফিলাপ, নথি আপলোড বা প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাইয়ে সমস্যায় পড়ছেন আবেদনকারীরা। সেই জায়গাতেই সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার দাবি সিপিএমের।
কাটোয়া ২ নম্বর ব্লকে রাজ্য সরকারের ঘোষিত যুবসাথী প্রকল্পকে ঘিরে প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি রাজনৈতিক তরজাও তুঙ্গে উঠেছে। প্রকল্পের ফর্ম ফিলাপকে কেন্দ্র করে ব্লক অফিস চত্বরে তৈরি হয়েছে আলাদা এক রাজনৈতিক আবহ। সাধারণ মানুষকে সহায়তা করার নামে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করছে—এমনই অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগে সরগরম এলাকা।
প্রসঙ্গত,রাজ্য সরকারের যুবসাথী প্রকল্প ঘোষণার পর থেকেই যুবক-যুবতীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। সরকারি সূত্রের দাবি, ইতিমধ্যেই ১০ লক্ষেরও বেশি আবেদন জমা পড়েছে। বেকার যুবকদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যেই এই প্রকল্প চালু করা হয়েছে বলে সরকারের তরফে জানানো হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ব্লক অফিসগুলিতে আবেদনকারীদের ভিড় বাড়ছে। কাটোয়া ২ নম্বর ব্লকেও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রতিদিন সকাল থেকেই লাইনে দাঁড়াচ্ছেন বহু আবেদনকারী।
এই পরিস্থিতিতে ব্লক অফিস চত্বরে বিশেষ হেল্পডেস্ক ক্যাম্প চালু করেছে সিপিএম। দলীয় পতাকা টাঙিয়ে স্থানীয় কর্মীরা আবেদনপত্র পূরণে সহায়তা করছেন। অনেক ক্ষেত্রেই অনলাইন ফর্ম ফিলাপ, নথি আপলোড বা প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাইয়ে সমস্যায় পড়ছেন আবেদনকারীরা। সেই জায়গাতেই সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার দাবি সিপিএমের।
CPIM নেতৃত্বের বক্তব্য, “সরকারি প্রকল্প সাধারণ মানুষের জন্য। কিন্তু বহু মানুষ প্রযুক্তিগত জটিলতা বা প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে আবেদন করতে পারেন না। তাই আমরা চাই কেউ যেন শুধুমাত্র প্রক্রিয়া না বোঝার কারণে বঞ্চিত না হন।” তাঁদের দাবি, এই উদ্যোগ সম্পূর্ণভাবে জনস্বার্থে, রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য নয়।
তবে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হতে সময় লাগেনি। শাসকদলর একাংশের অভিযোগ, সরকারি প্রকল্পকে রাজনৈতিক মঞ্চ বানানোর চেষ্টা করছে বিরোধীরা। তাদের মতে, ব্লক অফিসের সরকারি পরিসরে দলীয় পতাকা টাঙিয়ে হেল্পডেস্ক খোলা আদৌ কতটা শোভন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে বিজেপির পক্ষ থেকেও সরব হয়েছেন স্থানীয় নেতা কৃষ্ণ ঘোষ। তাঁর দাবি, “তৃণমূল, কংগ্রেস ও সিপিএম একজোট হয়ে রাজ্যে রাজনীতি করছে। মানুষ সব দেখছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে তার জবাব দেবে।” বিজেপির এই মন্তব্যে নতুন মাত্রা পেয়েছে রাজনৈতিক তরজা। যদিও সিপিএম নেতৃত্ব এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছে, তারা স্বাধীনভাবেই কাজ করছে এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থই তাদের একমাত্র লক্ষ্য।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ব্লক চত্বরে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও একটি ছোট সহায়তা শিবির করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, সিপিএমের ক্যাম্পে তুলনামূলক বেশি ভিড় দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে কারণ হিসেবে কেউ বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সিপিএমের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক সক্রিয়। আবার কেউ মনে করছেন, ফর্ম ফিলাপের ক্ষেত্রে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার জন্যই মানুষ সেখানে বেশি যাচ্ছেন।
আবেদনকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, অনেকেই প্রথমবার সরকারি অনলাইন পোর্টালে আবেদন করছেন। কারও আধার কার্ডে নামের বানান সমস্যা, কারও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট লিঙ্ক না থাকা, কারও আবার প্রয়োজনীয় নথি স্ক্যান করে আপলোড করতে অসুবিধা—এইসব কারণে তারা হেল্পডেস্কের দ্বারস্থ হচ্ছেন। এক যুবক বলেন, “আমরা রাজনীতি বুঝি না। ফর্মটা ঠিকমতো জমা পড়লেই হল। এখানে এসে সাহায্য পাচ্ছি, তাই সুবিধা হচ্ছে।”
তবে আবেদনকারীদের একাংশের বক্তব্য আরও গভীর প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। তাঁদের মতে, শুধুমাত্র ভাতা বা আর্থিক সহায়তা দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান নয়। “আমরা চাই চাকরি, স্থায়ী আয়। ভাতা সাময়িক সাহায্য করতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যৎ গড়তে হলে শিল্প ও কর্মসংস্থান দরকার”—এমনই মত বহু যুবকের।
সিপিএমও তাদের বক্তব্যে একই সুর তুলেছে। দলের দাবি, রাজ্যে স্থায়ী কর্মসংস্থানের অভাব রয়েছে। বেকার ভাতা দেওয়া একপ্রকার স্বীকারোক্তি যে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সংকুচিত। তাদের মতে, সরকারের উচিত শিল্পোন্নয়ন, নতুন বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি ক্ষেত্রে চাকরির সুযোগ বাড়ানো।
তৃণমূলের পাল্টা যুক্তি, রাজ্য সরকার একাধিক সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প চালু করেছে, যার লক্ষ্য আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষকে সহায়তা করা। যুবসাথী প্রকল্পও তারই অংশ। সরকারের মতে, যতদিন না পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, ততদিন যুবকদের পাশে দাঁড়ানোই তাদের দায়িত্ব।
প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, ব্লক অফিস চত্বরে বিভিন্ন দলের হেল্পডেস্ক খোলা আইনত নিষিদ্ধ নয়, যদি তা শৃঙ্খলা ভঙ্গ না করে এবং সরকারি কাজ ব্যাহত না হয়। তবে সরকারি স্থানে দলীয় পতাকা ও ব্যানার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা বজায় রাখা জরুরি। কারণ এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে—সরকারি প্রকল্প কি কোনও নির্দিষ্ট দলের মাধ্যমে পাওয়া যাবে, এমন ভুল ধারণাও জন্ম নিতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুবসাথী প্রকল্পকে ঘিরে যে রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে, তা আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতির ইঙ্গিতও হতে পারে। বেকার যুবক-যুবতীরা যে কোনও নির্বাচনে বড় ভোটব্যাঙ্ক। ফলে তাদের পাশে থাকার বার্তা দেওয়া রাজনৈতিক দলগুলির কাছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এলাকার প্রবীণ বাসিন্দাদের মতে, আগে সরকারি প্রকল্পের আবেদন করতে গেলে এমন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চোখে পড়ত না। এখন প্রায় প্রতিটি প্রকল্পই রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত হচ্ছে। যদিও অনেকে এটিকে ইতিবাচক দিকও বলছেন—রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ফলে অন্তত সাধারণ মানুষ বেশি সহায়তা পাচ্ছেন।
সব মিলিয়ে যুবসাথী প্রকল্পকে কেন্দ্র করে কাটোয়া ২ নম্বর ব্লকে প্রশাসনিক ব্যস্ততা যেমন বেড়েছে, তেমনই রাজনৈতিক উত্তাপও বাড়ছে। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য—বেকার যুবকদের আর্থিক সহায়তা—তা কতটা সফল হবে, তা সময় বলবে। তবে আপাতত স্পষ্ট, এই প্রকল্প শুধু আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অবস্থান জানানোর এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
আগামী দিনে আবেদন প্রক্রিয়া, ভাতা বিতরণ এবং প্রকল্পের বাস্তবায়ন ঘিরে রাজনৈতিক তরজা আরও তীব্র হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। কাটোয়া ২ নম্বর ব্লকের ঘটনাপ্রবাহ সেই সম্ভাবনারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের আশা, রাজনৈতিক বিতর্ক যাই থাকুক, প্রকল্পের সুবিধা যেন নিরপেক্ষভাবে এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সকল যোগ্য আবেদনকারীর কাছে পৌঁছায়।
- সুজাতা মেহেরা