দিঘার রথযাত্রায় বড় পরিবর্তন
দিঘার জগন্নাথ মন্দিরে ২০২৫ সালে প্রথমবার আয়োজিত হয়েছিল রথযাত্রা। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবার রাজ্যে পালাবদল ঘটেছে। বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। এই আবহে এবার দিঘার জগন্নাথ মন্দিরে রথযাত্রা কেমন হতে চলেছে তার দিকে আগ্রহ রয়েছে সকলেরই। গত সোমবার প্রথামতো দিঘার জগন্নাথ মন্দিরে পালিত হয়েছে জগন্নাথের স্নানযাত্রা। স্নানযাত্রা উপলক্ষে শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, মন্ত্রোচ্চারণ আর ভক্তদের জয়ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছিল গোটা চত্বর। তবে এ বার দিঘার জগন্নাথ মন্দিরে গত বছর রথযাত্রার মতো ছিল না প্রশাসনের অতিরিক্ত কড়াকড়ি। আচার–অনুষ্ঠান চলার সময়ে মন্দিরে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের অবাধ যাতায়াত ছিল। দিঘার জগন্নাথ মন্দিরেও এ বছরের রথযাত্রাকে ঘিরে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।
জগন্নাথের রথের রশি টানতে পারবে জনতাও
প্রশাসনিক সূত্রে খবর, গত বছরের তুলনায় এ বার সাধারণ ভক্তদের জন্য আরও বেশি সুযোগ রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে, জগন্নাথদেবের রথের রশি টানার ক্ষেত্রে আর শুধুমাত্র নির্দিষ্ট অতিথি বা ভিআইপিদের মধ্যে বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকবে না। সাধারণ মানুষও যাতে রথের রশি টানতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রশাসন। এর ফলে রথযাত্রায় অংশ নিতে আসা হাজার হাজার ভক্ত সরাসরি এই ঐতিহ্যের অংশ হওয়ার সুযোগ পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত, গত বছর রথের রশি টেনেছিলেন কেবল প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৎকালীন রাজ্য সরকারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন অতিথি। সাধারণ ভক্তদের সেই রশি টানতে দেওয়া হয়নি। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে ‘ভিআইপি সংস্কৃতি’ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। অনেকেই মনে করেছিলেন, রথযাত্রার মতো ধর্মীয় উৎসবে সকল ভক্তের সমান অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা উচিত। সেই অভিজ্ঞতার পর এ বছর প্রশাসন ভিন্ন পথে হাঁটতে চাইছে। প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, রথযাত্রাকে আরও সর্বজনীন এবং ভক্তকেন্দ্রিক করে তুলতেই সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রথের রশি টানার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলা বজায় রেখে কীভাবে ভক্তদের সুযোগ দেওয়া যায়, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই পরিকল্পনা শুরু হয়েছে।
মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা
দিঘা এবং সংলগ্ন এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটক এবং স্থানীয় বাসিন্দারা এই সিদ্ধান্তে অত্যন্ত আনন্দিত। জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা সামাজিক মর্যাদা নির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রথের রশি টানবেন। কোনও ভিআইপি নিরাপত্তা বা বাড়তি কড়াকড়ি না থাকায় সাধারণ মানুষ খুব কাছ থেকে শ্রীজগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রাদেবীকে দর্শন করার সুযোগ পাবেন। ভক্তদের মতে, রথের রশি ছুঁয়ে দেখার যে আকুলতা সাধারণ মানুষের থাকে, এই সিদ্ধান্তের ফলে তা পূর্ণ মাত্রায় সার্থক হবে।
রথযাত্রার প্রস্তুতি শুরু
রাজ্যে পালাবদলের পর প্রথম দিঘার জগন্নাথ মন্দিরের রথের দায়িত্বে বিজেপি সরকার। গত ২৯ জুন দিঘার মন্দিরের ভিতরে একটি অস্থায়ী বেদি তৈরি করে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার স্নানযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এ বারও শুরু হয়েছে রথযাত্রার প্রস্তুতি। রথ সংস্কার ও ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে রথের পরিকাঠামো দেখে নেওয়া হচ্ছে। প্রসঙ্গত, পুরীর মতো দিঘায় প্রতি বছর রথ নির্মাণ বা সংস্কার হয় না। তবে এই বছর তিনটে রথ নতুন করে রং করা হয়েছে। আপাতত ওই তিনটি রথ মূল মন্দিরের উত্তর দিকে রাখা হয়েছে। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, আজ, বৃহস্পতিবার ২ জুলাই সেখান থেকেই তিনটে রথের মহড়া চলবে। মহড়া চলাকালীন প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকদের থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পূর্ব মেদিনীপুরের জেলাশাসক নিরঞ্জন কুমার জানিয়েছেন, ‘দিঘায় জগন্নাথ মন্দিরের রথযাত্রা যাতে সুষ্ঠু ও সুন্দর ভাবে সম্পূর্ণ করা যায়, তার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আগত ভক্তদের যাতে রথযাত্রায় অংশগ্রহণে কোনও অসুবিধে না হয়, তার জন্য প্রশাসন প্রস্তুত।’ রামনগর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক চন্দ্রশেখর মণ্ডল বলেন, ‘আগে যাঁরা দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ভক্তদের কাছে ভিড়তে দেওয়া হয়নি। আমরা চাইছি, সেই সংস্কৃতি ভেঙে সকলে যাতে রথের রশি স্পর্শ করতে পারেন, তার ব্যবস্থা করতে।’ প্রশাসনের একাংশের দাবি, রথযাত্রায় অংশ নিতে আসা সাধারণ মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে রথের রশি টানতে পারেন, সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দিঘায় বিপুল সংখ্যক পর্যটক ও ভক্তের সমাগমের কথা মাথায় রেখে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। সম্ভাব্য ভিড় নিয়ন্ত্রণ, যান চলাচল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছে জেলা পুলিশ।