বাসন্তী বাজারে খাদ্য সুরক্ষা দফতরের অভিযানএকদম শুরুতেই আপনাদের কাছে একটা খুব সাধারণ প্রশ্ন করতে চাই—যখন আপনারা সপরিবারে একটু পছন্দের রেস্তোরাঁয় বা বিরিয়ানির দোকানে খেতে বসেন, তখন কি একবারের জন্যও মনে প্রশ্ন জাগে না যে, যে প্লেটটা আপনার সামনে এসে হাজির হলো, তার ভেতরে থাকা খাবারটা সত্যি স্বাস্থ্যকর তো? নাকি রান্নাঘরের পেছনের অন্ধকার কোণটায় লুকিয়ে আছে এমন কোনো নোংরা ছবি, যা দেখলে আপনার মুখের ভাত চিরকালের মতো উবে যাবে? আজ আমরা কথা বলব ঠিক এমনই এক চোখ কপালে তোলার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা নিয়ে! খাস বাসন্তী বাজারে রবিবারের ছুটির মেজাজকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়ে আচমকাই হানা দিল খাদ্য সুরক্ষা দফতর! আর তারপর সেখানে যা হলো, তা দেখলে আপনারা বুঝবেন যে আমরা বাইরে থেকে যাকে সুস্বাদু খাবার বলে গিলে চলেছি, তার আসল রূপটা ঠিক কতটা ভয়ঙ্কর!
আসুন ঘটনার সূত্রপাত ঠিক কোথায়, সেখান থেকেই শুরু করা যাক। দিনটা ছিল রবিবার—যেদিন সাধারণত মানুষের বাজারঘাট করার ধুম থাকে, হোটেল-রেস্তোরাঁয় উপচে পড়া ভিড় থাকে। কিন্তু ঠিক সেই দিন সকাল প্রায় এগারোটা নাগাদ বাসন্তী বাজারের বুকে বোমা ফাটার মতো একটা খবর ছড়িয়ে পড়ল। কারণটা কী? সাধারণ কোনও পুলিশি তল্লাশি নয়, খাস বাসন্তীর বিডিও সঞ্চিতা ঘোষকে সঙ্গে নিয়ে একেবারে পরিকল্পনা করে ময়দানে নেমে পড়েছেন খাদ্য সুরক্ষা দফতরের শীর্ষ আধিকারিকরা। রবিবারের সকালেই বাসন্তী বাজারের একের পর এক হোটেল, নামজাদা রেস্তোরাঁ এবং অলিগলির বিখ্যাত সব বিরিয়ানির দোকানে ঝড়ের বেগে হানা দিল এই স্পেশ্যাল টিম। ভাবুন একবার সাধারণ ব্যবসায়ীদের অবস্থা! যারা রবিবার মানেই দেদার লাভ তোলার স্বপ্ন দেখছিলেন, চোখের পলকে তাঁদের সব ব্যবসার দফারফা হওয়ার জোগাড় হলো। কারণ প্রশাসনের এই টিম কোনও নোটিশ না দিয়েই সোজা গিয়ে হাজির হয়েছিল রান্নার অন্দরে!
এই দলগুলো যখন একে একে হোটেল, রেস্তোরাঁ গুলোর রান্নাঘরে ঢুকল, তখন সেখানে যা দেখা গেল তা কোনও অংশেই শিউরে ওঠার চেয়ে কম কিছু নয়! দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল যে, বেশ কিছু খাবারের দোকানে ন্যূনতম কোনও স্বাস্থ্যবিধি বা হাইজিন না মেনেই দেদার রান্না চলছে এবং সেই খাবারই সাধারণ মানুষের পাতে পরিবেশন করা হচ্ছে। আধিকারিকরা যখন রান্নাঘরের ভিতরে ঢুকে ড্রাম বা কড়াইগুলো উল্টেপাল্টে দেখতে শুরু করলেন, তখন বেরিয়ে এল একের পর এক কদর্য সত্য। কোথাও দেখা গেল পচা-গলা অস্বাস্থ্যকর সামগ্রী দিয়ে দিব্যি বিরিয়ানি তৈরি হচ্ছে, কোথাও আবার মশলার মধ্যে তেলাপোকা বা নোংরার ছড়াছড়ি। আর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে খাদ্য সুরক্ষা দফতরের আধিকারিকরা সেই সমস্ত বিষাক্ত ও অস্বাস্থ্যকর খাবারগুলো স্পটেই নষ্ট করে দিলেন, মাটিতে ফেলে ড্রামে ঢুকিয়ে দিলেন! সাধারণ মানুষ বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে দেখল কীভাবে তাদের পেটে এতদিন ধরে স্লো পয়জন চালান হচ্ছিল!
অবশ্য এই হুট করে হানা দেওয়ার ফলে বাসন্তী বাজারে মুহূর্তের মধ্যে যে চাঞ্চল্য ছড়ানোর কথা, ঠিক সেটাই হলো। বাজারের থমথমে পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের তো তখন মুখের কথা কেড়ে নেওয়ার মতো অবস্থা। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, শুধু যে অস্বাস্থ্যকর খাবার বা নোংরা পরিবেশ পাওয়া গিয়েছে তা নয়, এর পাশাপাশি একাধিক হোটেল ও রেস্তোরাঁর কাছে ফুড সেফটি বা খাদ্য সুরক্ষা দফতরের যে বাধ্যতামূলক লাইসেন্স বা রেজিস্ট্রেশন থাকার কথা, সেটাই ছিল না! ভাবুন কাণ্ড! আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিনের পর দিন রমরম করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে অথচ প্রশাসনের বৈধ কাগজপত্রটুকু পর্যন্ত নেই। এই দৃশ্য দেখে আধিকারিকদের ক্ষোভের সীমা ছিল না। তাঁরা কড়া ভাষায় ব্যবসায়ীদের সাফ নির্দেশ দিয়ে দিলেন যে, অবিলম্বে এই লাইসেন্স তৈরি করতে হবে, নয়তো চিরকালের মতো দোকানের শাটার ডাউন করে দেওয়া হবে। কোনো লুকোচুরি বা দয়া দেখানো হবে না।
শুধু লাইসেন্স বা খাবার নষ্ট করাই নয় , এই অভিযোগের সবচেয়ে বড় দিকটা ছিল একদম হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া। আধিকারিকরা প্রতিটি হোটেলের মালিক ও রাঁধুনিদের হাতেনাতে ধরে বুঝিয়ে দিলেন যে, শুধু ব্যবসা করা বা টাকা কামানোই শেষ কথা নয়, সাধারণ মানুষের জীবনের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষাকেই দিতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। রান্নাঘরগুলোকে চকচকে পরিষ্কার রাখা, খাবার ঢেকে রাখা, স্বাস্থ্যসম্মত জল ব্যবহার করা এবং ফ্রিজে পচা মাংসের সঙ্গে টাটকা জিনিস না মিশিয়ে রাখার মতো বেসিক নিয়মগুলোও যে অনেক জায়গায় মানা হচ্ছিল না, তা কঠোর হাতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে বলে দেওয়া হয়েছে—আজ তো শুধু নোটিশ দেওয়া হলো এবং খাবার নষ্ট করা হলো, কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যদি এই বদভ্যাস ও বেআইনি কারবার বন্ধ না করা হয়, তবে আগামী দিনে এমন বুলডোজার নামবে যে আস্ত হোটেল সিল করে দিয়ে আইনানুগ জেলের ভাত খাওয়ানো হবে! প্রশাসনের এই জিরো টলারেন্স নীতি দেখে বাজারের আশপাশের মানুষ তো রীতিমতো হতবাক।
তবে এই পুরো ঘটনায় একটা দারুণ ইতিবাচক দিকও কিন্তু সামনে এসেছে। প্রশাসনের এই হঠাৎ হানায় বাসন্তী বাজারের সাধারণ ক্রেতা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ কিন্তু ভীষণখুশি! তাঁদের একটাই কথা—বছরের পর বছর ধরে এই সমস্ত অসাধু ব্যবসায়ীরা কম দামের লোভ দেখিয়ে বা চকচকে সাইনবোর্ডের আড়ালে আমাদের স্বাস্থ্যের সঙ্গে যেভাবে ছিনিমিনি খেলছিল, তাতে রাশ টানার ভীষণ দরকার ছিল। সাধারণ মানুষের জোরালো দাবি, এই ধরনের অভিযান যদি মাঝেসাঝে বা একদিনের জন্য না হয়ে একটা নিয়মিত রুটিন হিসেবে চালিয়ে যাওয়া যায়, তবেই গিয়ে এই ভেজাল ও নোংরামির সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ হতে পারে এবং আমরা অন্তত একটু নিরাপদ খাবার খেতে পাব।
রিপোর্টারঃ প্রসেনজিৎ সাহা