গত এক বছরে প্রায় এককোটি ভক্তের সমাগম নজির গড়ে পর্যটনে দেশের প্রথম সারিতে উঠে এসেছে বাংলা। কেরল, কাশ্মীর, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাত, রাজস্থানের মতো রাজ্যকে টেক্কা দিয়ে বিদেশি পর্যটক টানায় দেশের মধ্যে দ্বিতীয় বাংলা। এতে অন্যতম অবদান রয়েছে দিঘার জগন্নাথধামের। এই মন্দিরের টানে প্রচুর বিদেশি পর্যটক দিঘাতে আসছেন। প্রসঙ্গত, জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধনের পর থেকে সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে দিঘার অর্থনৈতিক পরিকাঠামো।
গতবছর এপ্রিলের শেষে জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধনের পর দিঘার অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। মাত্র সাড়ে ছয় মাসেই শহরের ব্যবসায়িক লেনদেন ১০০ কোটি টাকার গণ্ডি পেরিয়ে গিয়েছিল। যেখানে আগের বছরে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৫০-৬০ কোটি টাকা। এবার দিঘার সেই জগন্নাথ মন্দিরের বর্ষপূর্তি হতে চলেছে। তারজন্য এলাহি আয়োজন করছে মন্দির কর্তৃপক্ষ।
গতবছর ৩০ এপ্রিল অক্ষয় তৃতীয়ার দিঘা জগন্নাথ মন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটন হয়েছিল। বর্ষপূর্তির আবহে এবার মন্দিরে প্রাণপ্রতিষ্ঠা হবে গৌর-নিতাইয়ের। ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে প্রস্তুতি। মন্দির চত্বরে সাজো সাজো রব। ভক্তদের আকর্ষণ করতে এবং আধ্যাত্মিক গুরুত্ব আরও বাড়াতে এই উদ্যোগ। এবার ১৯ এপ্রিল অক্ষয় তৃতীয়া। ওইদিন থেকেই নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
মন্দির কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, ২০ এপ্রিল, প্রথম বর্ষপূর্তি উদযাপন হতে চলেছে। গত বছরের ঐতিহাসিক প্রাণ-প্রতিষ্ঠার এক বছর পূর্তি উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে আয়োজিত হবে মহা ব্রহ্মোৎসব মহোৎসব, যেখানে দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্তের সমাগম হবে। এই বিশেষ দিনে মন্দিরে অনুষ্ঠিত হবে শ্রী শ্রী গৌর নিতাই-এর প্রাণ-প্রতিষ্ঠা, যা এই উৎসবকে আরও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব প্রদান করবে।
মন্দির কর্তৃপক্ষের জানাচ্ছেন, ১৯ এপ্রিল সন্ধ্যা থেকে শুরু হবে আচার-অনুষ্ঠান, যার মধ্যে থাকবে আদিবাস ও দর্পণ অভিষেক। ২০ এপ্রিল সকালে অনুষ্ঠিত হবে শ্রী বিষ্ণু নরসিংহ যজ্ঞ, অভিষেক, ছাপ্পান ভোগ নিবেদন এবং রাজভোগ আরতি। সন্ধ্যায় থাকবে পালকি উৎসব, গৌর নিতাই-এর স্বাগত উৎসব, নৌকা-বিহার এবং পুষ্পবৃষ্টি। এই উপলক্ষে ইসকন কলকাতার সহ-সভাপতি এবং জগন্নাথ ধাম, দিঘার ট্রাস্টি ও প্রধান পুরোহিত রাধারমন দাস বলেন, 'অক্ষয় তৃতীয়া চিরন্তন মঙ্গলময়তার প্রতীক। ভগবান জগন্নাথের অশেষ কৃপায় এই ধাম এক বছরের সেবা ও ভক্তির যাত্রা সম্পূর্ণ করছে। এই অল্প সময়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটানোর পাশাপাশি অসংখ্য মানুষের জীবিকা ও আশার উৎস হয়ে উঠেছে।'
শ্রী শ্রী গৌর নিতাই-এর প্রাণ-প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'এই পবিত্র দিনে শ্রী শ্রী গৌর নিতাই-এর প্রাণ প্রতিষ্ঠা এই ধামকে আরও জীবন্ত ভক্তি ও সংকীর্তনের কেন্দ্র করে তুলবে। তাঁদের উপস্থিতি বিশ্বভ্রাতৃত্ব, প্রেম ও ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দেবে।' জানা যাচ্ছে, জগন্নাথ দেবের বিগ্রহের ঠিক বামদিকে স্থাপন করা হবে চৈতন্য মহাপ্রভু ও নিতাইয়ের বিগ্রহ। গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতে, চৈতন্যদেব রাধা-কৃষ্ণের অবতার। তাই তাঁর উপস্থিতি জগন্নাথ দেবের সঙ্গে এক বিশেষ আধ্যাত্মিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। এই ভাবনাকেই গুরুত্ব দিয়ে দিঘার জগন্নাথ ধামে এবার এই নতুন সংযোজন করা হচ্ছে।
গত এক বছরে জগন্নাথ ধাম, দিঘায় বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীকে আকর্ষণ করেছে, যার মধ্যে ১৫০টিরও বেশি দেশের ইসকন ভক্তরাও রয়েছেন। এই মন্দির দিঘাকে একটি সারাবছরের আধ্যাত্মিক পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করেছে এবং স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আসন্ন এই বর্ষপূর্তি উদযাপন দিঘাকে বিশ্ব মানচিত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ জগন্নাথ ভক্তির কেন্দ্র হিসেবে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে। জানা যাচ্ছে, গত এক বছরে প্রায় এককোটি ভক্তের সমাগম হয়েছে দিঘার জগন্নাথ মন্দিরে।