মুর্শিদাবাদে পালা বদলদিল্লিতে মোদী মোদী, আর বাংলায় তৃণমূলের জয়রথ ছোটানোর নেপথ্যে কি তবে অন্য কোনও গভীর রাজনৈতিক সমীকরণ লুকিয়ে রয়েছে? ভারতীয় রাজনীতিতে দলবদল, জোট রাজনীতি বা পর্দার আড়ালের আঁতাত নতুন কোনও ঘটনা নয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই মুহূর্তে মুর্শিদাবাদের রানিনগর এক নতুন এবং অত্যন্ত চমকপ্রদ রাজনৈতিক ধাঁধার জন্ম দিয়েছে। একদিকে যখন কেন্দ্রের রাজনীতিতে বিরোধী দলগুলি বিভিন্ন ইস্যুতে কেন্দ্রের শাসক শিবিরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়, ঠিক তখনই বাংলার একটি মফস্বল এলাকার স্থানীয় স্তরের ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে যে নজিরবিহীন রাজনৈতিক সমীকরণ প্রকাশ্যে এল, তা রাজ্য রাজনীতিতে এক বড়সড় বিতর্কের ঝড় তুলেছে।
ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মুর্শিদাবাদ জেলার রানিনগর ১ পঞ্চায়েত সমিতি। দীর্ঘ আইনি টানাপোড়েন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অনাস্থা প্রস্তাবের দীর্ঘ প্রক্রিয়া কাটিয়ে অবশেষে সেখানে নতুন বোর্ড গঠিত হয়েছে। কিন্তু এই বোর্ড গঠন প্রক্রিয়াকে ঘিরে যে তথ্য সামনে এসেছে, তাতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। মুখের কথায় তৃণমূল কংগ্রেসের পতাকা বা দাপট দেখানো হলেও, কাগজের কলমে এবং প্রশাসনিক নথিতে নাকি কলকাঠি নেড়েছে সম্পূর্ণ অন্য এক রাজনৈতিক দল—এনসিপিআই (NCPI)। আর এই পুরো ঘটনার নেপথ্যে রয়েছেন মুর্শিদাবাদেরই এক দাপুটে সাংসদ। তলে তলে এই ‘গভীর খেলা’ ঠিক কীভাবে পরিচালিত হলো এবং এর পিছনে আসল অঙ্কটা কী, তা নিয়ে এখন রাজনৈতিক মহলে চলছে তীব্র চুলচেরা বিশ্লেষণ।
চলুন, শুরু থেকে পুরো ঘটনার দিকে একটু নজর ফেরানো যাক। মুর্শিদাবাদের রানীনগর ১ পঞ্চায়েত সমিতিতে দীর্ঘ দিন ধরেই ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে টানাপোড়েন চলছিল। অবশেষে অনাস্থা প্রস্তাব সফল হওয়ার পর মঙ্গলবার সেখানে নতুন বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ার পুরোভাগে ছিলেন মুর্শিদাবাদের সাংসদ আবু তাহের খান। তাঁর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বেই এদিনের বোর্ড গঠন সম্পন্ন হয়। রানিনগর ১ পঞ্চায়েত সমিতিতে মোট আসন বা সদস্য সংখ্যা হলো ১৮ জন। কিন্তু বোর্ড গঠনের গুরুত্বপূর্ণ দিনে উপস্থিত ছিলেন ১৫ জন সদস্য। বাকি তিন জন সদস্য—যাদের মধ্যে ছিলেন তৃণমূলের তৎকালীন প্রাক্তন সভাপতি, সহ-সভাপতি এবং আরও একজন সদস্য—তারা সচেতনভাবেই এই বৈঠক এড়িয়ে যান এবং অনুপস্থিত ছিলেন।
বাকি যে ১৫ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় বেশ চমকপ্রদ। এর মধ্যে কংগ্রেসের ২ জন, সিপিআইএমের ২ জন, বিজেপির ১ জন এবং বাকি ১০ জন ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের নিজস্ব সদস্য। এই সংখ্যার হিসাব কষেই শেষ পর্যন্ত ১১ জন সদস্যের সমর্থন জোগাড় করে পঞ্চায়েত সমিতির নতুন সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন রোজিনা বিবি। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মনে হতেই পারে যে এটি পুরোপুরি তৃণমূল কংগ্রেসের একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক জয়। কিন্তু এর পরেই শুরু হয় আসল রহস্য এবং বিতর্ক।
যখন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রশ্ন করা হয় যে এটি ঠিক কোন রাজনৈতিক দলের বোর্ড গঠিত হলো, তখন মুর্শিদাবাদের সাংসদ আবু তাহের খান সরাসরি কোনও দলের নাম নিতে চাইলেন না। তাঁর অত্যন্ত রহস্যময় এবং সাবধানী মন্তব্য ছিল, “কোনও পার্টির কথা নয়, এমপি সাহেবের নেতৃত্বেই পঞ্চায়েত সমিতি দখল হয়েছে।” একজন বর্ষীয়ান সাংসদ যখন বোর্ড গঠনের পর প্রকাশ্যে দলের নাম উচ্চারণ করতে নারাজ হন এবং নিজের ব্যক্তিগত নেতৃত্বের ওপর জোর দেন, তখনই সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ জাগা স্বাভাবিক যে এর পিছনে বড় কোনও অভ্যন্তরীণ জটিলতা বা রাজনৈতিক সমঝোতা লুকিয়ে রয়েছে।
পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হয়ে যায় যখন বিরোধী দলগুলোর প্রতিক্রিয়া সামনে আসে। সিপিআইএমের পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য ইকবাল হক এই বোর্ড গঠন নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর সাফ দাবি, মুখে যতই তৃণমূল কংগ্রেসের বিজয়ের কথা প্রচার করা হোক না কেন, আসলে এই বোর্ড গঠন করেছে বিজেপির শরিক বা সহযোগী দল হিসেবে পরিচিত এনসিপিআই (NCPI)। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দিতে বাইরে থেকে তৃণমূলের সাইনবোর্ড ব্যবহার করা হলেও, অন্দরে কলকাঠি নাড়ছে অন্য শক্তি। ইকবাল হক আরও অভিযোগ করেন যে রেজ্যুলেশন বা সরকারি নথিতে পরিষ্কার লেখা রয়েছে যে এই বোর্ড গঠন করেছে এনসিপিআই। তাঁর কড়া ভাষায় অভিযোগ, গত তিন বছর ধরে এই অঞ্চলে কোনো কাজ হয়নি, কেবল লুটপাটের রাজত্ব চলছে। অতীতে তৃণমূল যা করেছে, এখন অন্যরা তাই করছে, আর তাদেরই সহযোগীরা ফের ক্ষমতার অলিন্দে ফিরে আসছে।
অন্যদিকে, এই বোর্ড গঠনের ভোটাভুটুর দিনও এক অদ্ভুত রাজনৈতিক ছবি দেখা গিয়েছে। সিপিআইএমের সদস্যরা এই পুরো প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করলেও, কংগ্রেসের দুই সদস্য এ দিন রহস্যজনকভাবে সম্পূর্ণ নীরব ছিলেন। তারা কোনও প্রতিবাদ না করে নীরবে পুরো বিষয়টি মেনে নেন। এর থেকেই রাজনৈতিক মহলে জোড় গুঞ্জন শুরু হয়েছে যে, তবে কি বিরোধী শিবিরের মধ্যেও একটা অদৃশ্য সমঝোতা বা আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়ে গিয়েছিল?
নবনির্বাচিত পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি রোজিনা বিবি অবশ্য সমস্ত জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে জানিয়েছেন যে এই জয় সাধারণ মানুষের জয় এবং তাঁরা উন্নয়নের পক্ষেই কাজ করবেন। তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এও স্পষ্ট করে দেন যে তাঁরা মমতা ব্যানার্জীর দল তৃণমূল কংগ্রেসেরই অংশ। কিন্তু বাইরে তৃণমূলের পতাকা আর অন্দরে এনসিপিআইয়ের প্রভাব বা হিসাব-নিকাশের যে তত্ত্ব বিরোধীরা তুলছেন, তা সহজেই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এই ঘটনার পিছনে গভীর রাজনৈতিক অর্থ খুঁজতে গেলে আমাদের একটু বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে তাকাতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ও গ্রামীণ রাজনীতিতে ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে অনেক সময়ই আদর্শগত তফাতগুলো ফিকে হয়ে যায়। কোনওরকমে বোর্ড দখল করা এবং স্থানীয় স্তরে আধিপত্য বজায় রাখাই অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলোর একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। তৃণমূল কংগ্রেস নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতে বা হাতছাড়া হয়ে যাওয়া অঞ্চলগুলো পুনরুদ্ধার করতে অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় সমীকরণ বা ছোট দলগুলোর সঙ্গে অদৃশ্য সমঝোতায় যেতে পিছপা হয় না। আবার অন্যদিকে, আঞ্চলিক দলগুলো বা অন্য কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মও সুযোগ বুঝে নিজেদের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়ে নেয়।
মুর্শিদাবাদের মতো সংবেদনশীল রাজনৈতিক জেলায় এই ধরনের সমীকরণ নতুন কিছু নয়। এখানে জাতিগত ও ধর্মীয় জনসংখ্যার বিন্যাস এবং স্থানীয় নেতাদের ব্যক্তিগত প্রভাব প্রায়শই দলীয় নির্দেশ বা আদর্শের চেয়ে অনেক বড় হয়ে দাঁড়ায়। রানিনগরের এই ঘটনায় ‘ভিতরে এনসিপিআই, বাইরে তৃণমূল’—এই তত্ত্বটি যদি সত্যি হয়, তবে তা রাজ্য রাজনীতির এক অদ্ভুত রূপকে আমাদের সামনে নিয়ে আসে। একদিকে কেন্দ্র বা অন্য রাজ্যে রাজনৈতিক বিরোধিতার চড়া সুর, আর অন্যদিকে গ্রামীণ বাংলার মাটিতে ক্ষমতা দখলের স্বার্থে এমন সব অদ্ভুত জোট বা সমঝোতা—এটাই যেন বর্তমান রাজনীতির এক নির্মম অথচ বাস্তব চিত্র।