BJP-র পার্টি অফিসে বিক্ষোভ দলেরই একাংশের, অগ্নিমিত্রার আসানসোলে হচ্ছেটা কী?

জায়গাটা হল আসানসোলে বিজেপির জেলা কার্যালয়। সকাল থেকেই সেখানে একটা চরম উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পথচলতি মানুষ—সবাই দেখছে যে বিজেপির দলীয় অফিসের সামনে বিশাল পুলিশ বাহিনী আর ক্ষোভে ফেটে পড়া দলেরই কিছু কর্মী-সমর্থক প্ল্যাকার্ড হাতে স্লোগান দিচ্ছেন।

Advertisement
BJP-র পার্টি অফিসে বিক্ষোভ দলেরই একাংশের, অগ্নিমিত্রার আসানসোলে হচ্ছেটা কী? BJP-র পার্টি অফিসে বিক্ষোভ দলেরই একাংশের

 আপনি যদি ভেবে থাকেন যে রাজনৈতিক দলের অন্তর্দ্বন্দ্ব বা কোন্দল শুধু ভোট বা টিকিটের বেলাতেই দেখা যায়, তাহলে এই ঘটনা জানার পর আপনার সেই ধারণা পুরো পাল্টে যাবে। একটু ভালো করে ভেবে দেখুন তো, একটা দলের অন্দরে যখন নেত্রীরা বা কর্মীরা নিজেদের দলেরই বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখান, কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ব্যারিকেড ভাঙার উপক্রম করেন, তখন সেই দলের ভিত কতটা নড়বড়ে হয়ে গেছে, সেটা কি আর আলাদা করে বুঝিয়ে বলতে হয়? ঠিক এই কাণ্ডটাই ঘটেছে আসানসোলে বিজেপির জেলা কার্যালয়ের সামনে! 

ঘটনাটা ঠিক কী? জায়গাটা হল আসানসোলে বিজেপির জেলা কার্যালয়। সকাল থেকেই সেখানে একটা চরম উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পথচলতি মানুষ—সবাই দেখছে যে বিজেপির দলীয় অফিসের সামনে বিশাল পুলিশ বাহিনী আর ক্ষোভে ফেটে পড়া দলেরই কিছু কর্মী-সমর্থক প্ল্যাকার্ড হাতে স্লোগান দিচ্ছেন। কেন বলুন তো? কারণ মহিলা মোর্চার একটা পদের দখলকে কেন্দ্র করে দলের অন্দরের জমা হওয়া পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এদিন একেবারে আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়েছে! একটু ভাবুন তো দৃশ্যটা! রাজ্যে ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসানের পর একটা দল রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে একশো দিনের কিছু বেশি সময়। আর এরই মধ্যে দলের অন্দরে দেখা দিয়েছে গোষ্ঠী কোন্দল !

জামুড়িয়া মণ্ডল-১-এর মহিলা মোর্চার সভাপতির পদ নিয়ে এই পুরো ঝামেলা শুরু হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের মূল অভিযোগ, ২০২১ সাল থেকে দলের জন্য যারা রক্ত জল করে কাজ করছেন, যারা সমস্ত রাজনৈতিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে দলের মহিলা সংগঠনকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তাদের সঙ্গেই নাকি বেইমানি করা হয়েছে! স্বর্ণ বাউরী নামে এক নেত্রীর দাবি, গত ১৫ অগাস্ট স্বাধীনতা দিবসের দিন নাকি খোদ দলের পক্ষ থেকেই মহিলা মোর্চার জামুড়িয়া মণ্ডল-১-এর সভাপতি হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। ভাবুন! ১৫ অগাস্ট নাম ঘোষণা হওয়ার পর আনন্দের জোয়ারে ভেসেছিল তাঁর পরিবার আর সমর্থকরা। কিন্তু তারপরেই হঠাৎ এমন কী জাদু হলো, যার জেরে সেই নামটাই তালিকা থেকে হঠাত্ গায়েব হয়ে গেল! আর তাঁর জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হলো অন্য কাউকে!

Advertisement

এই নাটকীয় বদল ঘটার পরেই ফুঁসে ওঠেন স্বর্ণ বাউরী ও তাঁর সমর্থকরা। তাঁদের সোজা কথা—কেন এই অন্যায় করা হলো? কোন জাদুকরের ইশারায় ১৫ আগস্টের ঘোষণা ২১শে আগস্ট বদলে গেল? সেই কৈফিয়ত পেতেই তাঁরা সোজা চলে আসেন আসানসোলে বিজেপির জেলা কার্যালয়ের সামনে। আর সেখানে এসে শুরু হয় জোরদার বিক্ষোভ। স্বর্ণ বাউরীর নিজের মুখে শোনা গেল এক বিস্ফোরক অভিযোগ! তিনি সরাসরি আঙুল তুললেন স্থানীয় মণ্ডল সভাপতি তাপস রায় এবং পিনাকী রায়ের দিকে। তাঁর সোজাসাপ্টা দাবি, এই দুই নেতার গভীর ষড়যন্ত্রের ফলেই তাঁর নাম ওই তালিকা থেকে কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে! তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যতদিন না তাঁর নাম ফের ওই পদে পুনর্বহাল করা হচ্ছে, ততদিন তিনি এই লড়াই থামাবেন না।

শুধু কি স্বর্ণ নিজে? তাঁর স্বামী সুশান্ত বাউরীও এই লড়াইয়ে একেবারে সামনের সারিতে দাঁড়িয়েছেন। তিনি তো আরও এক ধাপ এগিয়ে একেবারে বোমা ফাটিয়েছেন! সুশান্ত বাবুর দাবি, তাঁর স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েও যেভাবে মহিলা কর্মীদের সংঘটিত করেছেন, তা কি দলের নেতারা ভুলে গেলেন? তিনি প্রশ্ন তুলেছেন যে, ১৫ আগস্ট প্রকাশ্যে নাম ঘোষণা হওয়ার পর কীভাবে আবার সেই নাম পিছন থেকে কেটে দেওয়া সম্ভব? এর পেছনে কি শুধু চেয়ারের লোভ, নাকি অন্য কোনো বড় ডালপালা ছড়ানো দুর্নীতি জড়িয়ে আছে?

আর এখানেই আমাদের দ্বিতীয় এবং সবথেকে বড় টুইস্ট! সুশান্ত বাউরি স্থানীয় মণ্ডল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আরও মারাত্মক সব অভিযোগ এনেছেন। তিনি সরাসরি দাবি করেছেন যে, এই স্থানীয় সংগঠনের সঙ্গে নাকি বালি কারবারিদের একটা গভীর যোগসাজশ রয়েছে! একটু ভাবুন! রাজনীতির মঞ্চে বালি মাফিয়াদের যোগসাজশের অভিযোগ তো আমরা কতই না শুনেছি, কিন্তু নিজেদের দলেরই মণ্ডল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এই ধরনের বিস্ফোরক অভিযোগ যখন খোদ দলের কর্মীরা তোলেন, তখন পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা একবার অনুমান করুন! শুধু তাই নয়, দলেরই সৎ কর্মীদের ওপর হামলার চেষ্টার মতো গুরুতর অভিযোগও তাঁরা তুলেছেন স্থানীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে। যদিও এই সমস্ত অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও এই ধরনের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসায় পুরো রাজনৈতিক মহলে হুলুস্থুল পড়ে গেছে।

আচ্ছা, আপনাদের কি মনে হয় না যে এই ধরনের ঘটনা দলগুলোর অভ্যন্তরে তলে তলে চলা ক্ষমতার লড়াইয়ের একটা ছোট্ট নমুনা মাত্র? যেখানে সাধারণ কর্মীরা খেটে মরে, আর ওপরের তলার নেতারা নিজেদের পছন্দের লোক বসানোর জন্য দলের নিয়মকানুনকেও বুড়ো আঙুল দেখায়? বিক্ষোভকারীরা জানিয়েছেন যে তারা এই গোটা বিষয়টি স্থানীয় বিধায়ক থেকে শুরু করে একেবারে জেলা নেতৃত্ব পর্যন্ত সবাইকে বিস্তারিতভাবে জানিয়েছেন। এমনকি রাজ্য স্তরে নাকি স্বর্ণ বাউরীর নাম বৈধ হিসেবেই তালিকাভুক্ত ছিল, কিন্তু জেলা স্তরের কিছু নেতার কারসাজিতেই সেই নাম নাকি কাটা পড়েছে! কী অদ্ভুত ব্যাপার বলুন তো! রাজ্য এক কথা বলছে আর জেলা আরেক কথা বলছে—তাহলে কি দলের ওপরতলার সাথে নীচুতলার কোনো সমন্বয়ই আর অবশিষ্ট নেই?

এই পরিস্থিতিতে বিরোধীরা যখন কোন্দলে জর্জরিত, তখন বিজেপির জেলা সাধারণ সম্পাদক অপূর্ব হাজরা অবশ্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে জানিয়েছেন যে, মহিলা মোর্চার মণ্ডল সভাপতিদের নিয়ে কিছু ছোটখাটো সমস্যা তৈরি হয়েছে ঠিকই, তবে সেটা এমন কিছু বড় ব্যাপার নয়। সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে কথা বলা হবে, মহিলা মোর্চার রাজ্য ও জেলা সভাপতিদের সাথে বসে এই বিষয়ে একটা সঠিক ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেছেন যে, একটা বড় রাজনৈতিক দলে মতবিরোধ বা ক্ষোভ থাকা খুবই স্বাভাবিক বিষয়, এবং আলোচনার মাধ্যমেই এই সমস্ত সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।

Advertisement

কিন্তু প্রশ্ন হল—আলোচনার মাধ্যমে কি আর এই ক্ষোভ প্রশমিত হবে? ১৫ অগাস্টের ঘোষণা ফিরিয়ে নেওয়ার পর যে আগুন জ্বেলে উঠেছে কর্মীদের মনে, তা কি অত সহজে নেভানো যাবে? জামুড়িয়া মণ্ডল-১-এর এই সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত ঘিরে বিজেপির অন্দরের যে বেআব্রু ছবি আজ প্রকাশ্য রাস্তায় চলে এল, তা কিন্তু দলটার জন্য একটা বড় ধাক্কা। বিরোধী শিবিরে এই ধরনের কোন্দল দেখে শাসক শিবিরও কিন্তু এখন বেশ ভালোই হাততালি দিচ্ছে! তারা তো সুযোগ খুঁজেই বসে থাকে কখন প্রতিপক্ষের ঘরে ভাঙন ধরবে।

রিপোর্টারঃ অনিল গিরি

POST A COMMENT
Advertisement