হুমায়ুন কবির ও শুভেন্দু অধিকারী রেজিনগরে ইতিহাস। প্রায় ৭০ শতাংশ মুসলিম ভোটার অধ্যুষিত রেজিনগরে জিতলেন বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকার। ধর্মীয় জনবিন্যাসের নিরিখে এই কেন্দ্রে বিজেপির জেতার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। সেখানেই জয় পেয়ে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিল গেরুয়া শিবির। তাহলে কি সংখ্যালঘুরাও আস্থা দেখাচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারীর উপর? সেই প্রশ্নই উঠতে শুরু করেছে।
বিরোধী ভোটের বিভাজন কি বিজেপিকে সুবিধা দিল?
রেজিনগরের বিজেপি জেতার কারণ কী? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী লড়াইয়ে একাধিক রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি রেজিনগরে বিজেপির জেতার অন্যতম কারণ। বিজেপির শাখারভ সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির গুলাম নবি আজাদ, তৃণমূলের রবিউল আলম চৌধুরী, ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেসের সফিউজ্জামান শেখ এবং কংগ্রেসের মহম্মদ আবদুল্লাহিল কাফি-সহ অন্যান্য প্রার্থী।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দাবি, এই বহুমুখী লড়াইয়ে বিরোধী ভোটের বিভাজন বিজেপির পক্ষে সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করে দেয়। তৃণমূল, আম জনতা উন্নয়ন পার্টি, কংগ্রেস এবং অন্য প্রার্থীদের মধ্যে ভোট ভাগ হয়ে যায়। আর তারই সুফল পায় বিজেপি। কোনও একটি দলের বিরোধী ভোট এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত না হলে তুলনামূলকভাবে সংগঠিত ভোটব্যাঙ্ক থাকা প্রার্থী সুবিধা পেতে পারেন- সেই তত্ত্ব রেজিনগরের ক্ষেত্রেও খেটেছে।
তবে ভোট ভাগাভাগিই বিজেপির জয়ের একমাত্র কারণ, এমনটা মানতে নারাজ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তাঁদের মতে, বিরোধী তৃণমূলের দুই ভাগে বিভক্ত হওয়া এই ভোটে বিজেপির জয়ের অন্যতম কারণ।
বাবরি মসজিদের আবেগ নয়, উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে জোর
রেজিনগরের উপনির্বাচনে বিজেপির প্রচারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের উপর জোর দেওয়া। প্রচারের শেষ পর্যায়ে বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে আবেগের রাজনীতির বদলে সেতু, হাসপাতাল, কলেজ, শিল্প পার্ক এবং কাজের সুযোগের মতো বিষয় সামনে আসে।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত এলাকায় প্রচার করে দাবি করেছিলেন, সাধারণ মানুষ ধর্মীয় বিতর্কের চেয়ে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানকে বেশি গুরুত্ব দিতে চান। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও প্রচারে স্থানীয় পরিকাঠামো এবং কর্মসংস্থান সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেন। এই কৌশল বিজেপিকে প্রচলিত রাজনৈতিক সমীকরণের বাইরে গিয়ে ভোটারদের কাছে পৌঁছনোর সুযোগ করে দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
হুমায়ুন কবিরের প্রভাব কম
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রেজিনগর কেন্দ্র থেকে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান হুমায়ুন কবির ১,২৩,৫৩৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, বিজেপির বাপন ঘোষ পেয়েছিলেন ৬৪,৬৬০ ভোট এবং তৃণমূলের আতাউর রহমান পেয়েছিলেন ৪১,৭১৮ ভোট। অর্থাৎ, আগের নির্বাচনে বিজেপি দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও জয়ী প্রার্থীর সঙ্গে তার ব্যবধান ছিল উল্লেখযোগ্য।
হুমায়ুন কবির নওদা কেন্দ্রটি ধরে রেখে রেজিনগর আসন ছেড়ে দেওয়ায় উপনির্বাচনের পরিস্থিতি বদলে যায়। তাঁর ছেলে গুলাম নবি আজাদকে প্রার্থী করে আম জনতা উন্নয়ন পার্টি সেই আসন ধরে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। হুমায়ুনের মতো জনপ্রিয় নন তাঁর ছেলে। তিনি এত বড় ভোটের ময়দানে তুলনামূলক নতুন। রাজনৈতিত বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সেটাও বিজেপি প্রার্থীর প্রতি ভোটারদের বিশ্বাসের অন্যতম কারণ।
শুভেন্দুর বার্তা
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রেজিনগরে ২০০ শয্যার হাসপাতাল, নতুন সেতু, কলেজ এবং শিল্প পার্কের মতো একাধিক উদ্যোগের প্রতিশ্রুতি দেন। পরিযায়ী শ্রমিকদের ফিরিয়ে আনা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও প্রচারে উঠে আসে। এটাই ছিল রেজিনগরে শুভেন্দুর মাস্টারস্ট্রোক। এমনকী তিনি সংখ্যাগুদের ভোট দেওয়ার বার্তাও দিয়েছিলেন। জানিয়েছিলেন, উন্নয়ন করবেন। সবার পাশে থাকবেন। ভোটে জেতানোর শর্তে।
ভোটের দিন হুমায়ুন কবীরকে ঘিরে বিতর্কের প্রভাব
৬ অক্টোবর ভোটগ্রহণের দিন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে পুলিশের সংঘাত এবং তাঁর আটক হওয়ার ঘটনা রেজিনগরের নির্বাচনী উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছিল। হুমায়ুন কবির পুলিশের বিরুদ্ধে ভোটপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছিলেন। পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগও সামনে আসে। বিজেপি ও রাজ্য নেতৃত্ব অবশ্য ভোটে কারচুপির অভিযোগ অস্বীকার করেছিল।এই ঘটনা নির্বাচনী প্রচার এবং ভোটের দিনের রাজনৈতিক পরিবেশে প্রভাব ফেলেছিল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
শাখারভের প্রতিক্রিয়া
রেজিনগরের বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকার বলেন, 'সংখ্যালঘু, সংখ্যাগুরু, এ সব কথা বলবেন না। এসব শুনে বাংলার মানুষ ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে। বাংলায় এখন একটাই ক্যাসেট বাজবে, এখানে উন্নয়ন চাই, রেজিনগরে কলেজ চাই, শিল্প চাই। সংখ্যালঘু মানুষরা অত্যন্ত বুদ্ধিমান। যখন কংগ্রেসের সরকার ছিল, তখন তাঁরা কংগ্রেসের সঙ্গে ছিলেন। পরবর্তীকালে যখন বামেরা ক্ষমতায় এল, তখন তাঁরা বামেদের সঙ্গে ছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের সময়ে সংখ্যালঘুরা সবাই তৃণমূল কংগ্রেসকে একচেটিয়া ভোট দিয়েছেন। এখন শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। সংখ্যালঘুরা নিজেদের উন্নয়নের স্বার্থে হৈ হৈ করে সবাই বিজেপি-কে ভোট দিয়েছেন।'