'চিকেন নেক' নিয়ে শুভেন্দুর এক সিদ্ধান্তে কুপোকাত বাংলাদেশ, সুফল পাবে দেশের ৮ রাজ্যও; কীভাবে?

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর শিলিগুড়ি করিডর তথা 'চিকেনস নেক' আবারও আলোচনার কেন্দ্রে। রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার এই সংবেদনশীল এলাকার প্রায় ১২০ একর জমি কেন্দ্র সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

Advertisement
'চিকেন নেক' নিয়ে শুভেন্দুর এক সিদ্ধান্তে কুপোকাত বাংলাদেশ, সুফল পাবে দেশের ৮ রাজ্যওঅমিত শাহ ও শুভেন্দু অধিকারী
হাইলাইটস
  • পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর শিলিগুড়ি করিডর তথা 'চিকেনস নেক' আবারও আলোচনার কেন্দ্রে
  • রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার এই সংবেদনশীল এলাকার প্রায় ১২০ একর জমি কেন্দ্র সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর শিলিগুড়ি করিডর তথা 'চিকেনস নেক' আবারও আলোচনার কেন্দ্রে। রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার এই সংবেদনশীল এলাকার প্রায় ১২০ একর জমি কেন্দ্র সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের দাবি, এই জমি সীমান্ত নিরাপত্তা, ফেন্সিং, জাতীয় সড়ক এবং অন্যান্য কৌশলগত পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা হবে। প্রসঙ্গত, শিলিগুড়ি করিডর ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়, কারণ এই সরু ভূখণ্ডই উত্তর-পূর্বের আটটি রাজ্যকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করে।

এই করিডরের প্রস্থ প্রায় ২২ কিলোমিটার এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০ কিলোমিটার। এর সীমানা নেপাল ও বাংলাদেশের সঙ্গেও যুক্ত, তাই জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিতে এটিকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর এলাকা হিসেবে ধরা হয়। বিজেপির অভিযোগ, আগের তৃণমূল কংগ্রেস সরকার এই এলাকায় নিরাপত্তা সংস্থাগুলিকে পর্যাপ্ত অধিকার ও জমি দেওয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহ দেখায়নি। অন্যদিকে, তৃণমূল এই অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে।

এই বিতর্কের মধ্যেই ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গায় অভিযুক্ত শারজিল ইমামের পুরনো একটি বক্তব্য আবারও সামনে এসেছে। যেখানে তিনি চিকেন নেক করিডর নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন। সেই মন্তব্যের পর জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছিল।

২০২০ সালে দিল্লির সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অভিযুক্ত শারজিল ইমাম বলেছিলেন, যদি ৫ লক্ষ মুসলিম একত্রিত হন, তাহলে 'চিকেন নেক' বন্ধ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দেশের বাকি অংশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব। শারজিল এই মন্তব্য করেছিলেন কারণ 'চিকেন নেক' এলাকাটিকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে ধরা হয়। এই মন্তব্য এতটাই বিতর্কিত ছিল যে, এর জেরে আজ পর্যন্ত আদালত থেকে শারজিল জামিন পাননি। একই সঙ্গে কেন্দ্র সরকারও একাধিকবার চেষ্টা করেছিল যাতে চিকেন নেক এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিরাপত্তা সংস্থা ও বিএসএফের হাতে পুরোপুরি তুলে দেওয়া যায়। এ নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারকে একাধিক প্রস্তাব পাঠানো হলেও, তৎকালীন সরকার তাতে রাজি হয়নি।

Advertisement

পশ্চিমবঙ্গে সরকার বদলের পর মুখ্যমন্ত্রী শুবেন্দু অধিকারী 'চিকেন নেক' করিডরের ১২০ একর জমি কেন্দ্রকে হস্তান্তর করেছেন। বিজেপির দাবি, করিডর সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করা জরুরি, যাতে অনুপ্রবেশ ও সম্ভাব্য হুমকি রোখা যায়। এখন এই জমি সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া, জাতীয় সড়ক এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরিকাঠামো গড়ে তুলতে ব্যবহার করা হবে। আরও সহজ ভাষায় বললে, বাংলাদেশ থেকে হওয়া অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিএসএফ সীমান্তে ফেন্সিং করবে।

এলাকায় আন্ডারগ্রাউন্ড রেল নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। ভারত সরকার এই এলাকায় ভূগর্ভস্থ রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে সড়কপথ বন্ধ হয়ে গেলেও সেনাবাহিনীর যাতায়াত বজায় থাকে এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন না হয়। বিজেপির দাবি, নতুন সরকার আসার পর এই বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, এই বিষয়টিকে ধর্ম ও ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির সঙ্গে জুড়ে দেখানো হচ্ছে। তাদের দাবি, সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারী সব সম্প্রদায়ের মানুষই দেশপ্রেমিক এবং নিরাপত্তার প্রশ্নকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা উচিত নয়।

এদিকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত সব বিষয়ে রাজ্য সরকার কেন্দ্রের সঙ্গে মিলেই কাজ করবে। তিনি আরও জানান, সীমান্ত এলাকায় পরিকাঠামো মজবুত করা এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ রুখতে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। রাজনৈতিক মহলে এই ইস্যু নিয়ে আলোচনা আরও বেড়েছে কারণ সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গে অবৈধ দখলদারি, বুলডোজার অভিযান, পুনর্নির্বাচন এবং নির্বাচনী হিংসা নিয়ে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে সংঘাত বাড়ছে।

শিলিগুড়ি করিডর বা চিকেন নেক শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা দেশের কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই এলাকায় নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং সামাজিক সম্প্রীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা বর্তমান ও পূর্ববর্তী সব সরকারের কাছেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ফেন্সিংয়ের জন্য বিএসএফকে জমি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে মোট ৪,০৯৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত ভাগ করে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমান্ত প্রায় ২,২১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩,২৪০ কিলোমিটার সীমান্তে ইতিমধ্যেই ফেন্সিং করা হয়েছে এবং এখনও প্রায় ৮৫০ কিলোমিটার সীমান্তে বেড়া দেওয়া বাকি রয়েছে, যার মধ্যে ১৭৫ কিলোমিটার দুর্গম এলাকা রয়েছে। এই ১৭৫ কিলোমিটারের মধ্যে ১২৭ কিলোমিটার অংশে ফেন্সিং হওয়ার কথা।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের সময় এই অংশে মাত্র ৮ কিলোমিটার এলাকায় ফেন্সিং করা গিয়েছিল। কেন্দ্র সরকার পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে বিএসএফের অধিকার ক্ষেত্র ১৫ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ৫০ কিলোমিটার করেছিল। অর্থাৎ বিএসএফ এখন সীমান্ত থেকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় তল্লাশি, গ্রেফতার ও বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা রাখে। তৎকালীন মমতা সরকার এটিকে রাজ্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ বলে দাবি করেছিল। ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় এর বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাবও পাশ করা হয়েছিল।

POST A COMMENT
Advertisement