বারুইপুর কাণ্ডে পথে মমতা।-ফাইল ছবিবারুইপুরে ১২ বছরের এক নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজ্যের রাজনীতি। নৃশংস এই অপরাধ, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, গণপিটুনি এবং তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘গৃহবন্দি’ থাকার অভিযোগ, সব মিলিয়ে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি সরকারের সামনে এটিই প্রথম বড় আইন-শৃঙ্খলার পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজ্যের নতুন সরকারের সামনে এই চ্যালেঞ্জ একাধিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে যেমন দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার চাপ রয়েছে, অন্যদিকে বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক আক্রমণেরও মোকাবিলা করতে হচ্ছে সরকারকে।
কীভাবে ঘটল ঘটনা
গত শনিবার বিকেলে বারুইপুরের ১২ বছরের এক নাবালিকা বন্ধুর জন্মদিনের উপহার কিনতে বাড়ি থেকে বের হয়। দীর্ঘক্ষণ বাড়ি না ফেরায় পরিবার থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করে। পরিবারের অভিযোগ, অভিযোগ জানানোর পরও পুলিশ যথাসময়ে তল্লাশি শুরু করেনি।
এরপর পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে নিজেরাই খোঁজ শুরু করেন। সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে সন্দেহভাজন কয়েকজনকে চিহ্নিত করা হয়। রবিবার ভোরে স্থানীয়রা এক সন্দেহভাজনের বাড়িতে পৌঁছলে, অভিযোগ, সে জেরার মুখে জানায় যে কয়েকজন মিলে নাবালিকাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল এবং দেহ কোথায় ফেলে রাখা হয়েছে তাও জানায়। রবিবার সকালে বাড়ি থেকে অল্প দূরের একটি পুকুর থেকে চটের বস্তার ভিতরে নাবালিকার দেহ উদ্ধার হয়।
ময়নাতদন্তে উঠে এল নৃশংসতার ছবি
প্রাথমিক ময়নাতদন্তে জানা যায়, নাবালিকাকে যৌন নির্যাতনের পর মাথায় ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল। শরীরজুড়ে আঁচড় ও কামড়ের চিহ্নও পাওয়া যায়। চিকিৎসকদের মতে, ফুসফুস ও পাকস্থলীতে জল থাকার অর্থ, পুকুরে ফেলে দেওয়ার সময়ও সে জীবিত ছিল। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই ক্ষোভ আরও ছড়িয়ে পড়ে।
উত্তপ্ত বারুইপুর, গণপিটুনিতে মৃত্যু
দেহ উদ্ধারের পর হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভে সামিল হন। রাস্তা অবরোধ, টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদ, রেল অবরোধ এবং পুলিশের গাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এই উত্তেজনার মধ্যেই অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ইন্দ্রজিৎ তান্তি নামে এক ব্যক্তাকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
নাবালিকার পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ যদি নিখোঁজ হওয়ার পরই দ্রুত ব্যবস্থা নিত, তাহলে মেয়েটিকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হতে পারত। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, তাঁরা এক অভিযুক্তকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিলেও পরে সে রহস্যজনকভাবে পুলিশি হেফাজত থেকে পালিয়ে যায়।
এছাড়া, এক স্থানীয় বিজেপি নেতা অভিযুক্তদের পালাতে সাহায্য করার চেষ্টা করেছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। যদিও ওই নেতা অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তিনি পুলিশের তদন্তেই সাহায্য করছিলেন।
গ্রেফতার ও তদন্ত
পুলিশ ইতিমধ্যেই মূল অভিযুক্ত আনন্দ সর্দার-সহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। আরও এক অভিযুক্তের খোঁজ চলছে। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে ৬ সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করা হয়েছে। ধর্ষণ-খুনের মামলার পাশাপাশি গণপিটুনি, পুলিশ আক্রান্ত হওয়া এবং রেল অবরোধের ঘটনাতেও পৃথক মামলা দায়ের হয়েছে।
রাজনৈতিক তরজা
ঘটনার পর থেকেই বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ কালীঘাটের বাড়ির সামনে ব্যারিকেড বসিয়ে তাঁকে কার্যত ‘গৃহবন্দি’ করে রেখেছিল, যাতে তিনি বারুইপুরে গিয়ে নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে না পারেন। মমতা সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন তোলেন, 'আমাকে বাইরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না কেন? আমি কি এতটাই ভয়ঙ্কর?'
তবে বিজেপির দাবি, জেড-প্লাস নিরাপত্তাপ্রাপ্ত ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই ওই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। বিরোধীদের অভিযোগকে রাজনৈতিক নাটক বলেও উড়িয়ে দিয়েছে শাসক দল।
এদিকে তৃণমূলের একটি প্রতিনিধি দল নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করে সরকারের সমালোচনা করেছে। পাল্টা বিজেপিও দাবি করেছে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ করা হয়েছে এবং তদন্ত নিরপেক্ষভাবেই এগোচ্ছে।
বিজেপির সামনে প্রথম বড় পরীক্ষা
রাজ্যে সরকার গঠনের পর বারুইপুরের এই ঘটনাই বিজেপির সামনে প্রথম বড় আইন-শৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। একদিকে দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার চাপ, অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক আক্রমণ, দুই দিকই সামাল দিতে হচ্ছে সরকারকে।
এই ঘটনায় সরকারের প্রশাসনিক দক্ষতা, পুলিশের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া, সবকিছুই এখন রাজ্যের রাজনৈতিক মহলের নজরে। আগামী দিনে তদন্তের গতি এবং বিচারের অগ্রগতিই নির্ধারণ করবে এই মামলার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব কতটা গভীর হবে।