কলেজে কলেজে মাথায় BJP MP-MLA, শিক্ষায় 'গৈরিকীকরণ'? যা বলছেন BJP, CPIM ও শিক্ষাবিদরা

কলেজের পরিচালন সমিতির মাথায় এবার বসলেন বিজেপি বিধায়ক এবং সাংসদরা। এরপরই শিক্ষা ব্যবস্থায় গৈরিকীকরণের অভিযোগ করছে বিরোধীরা। তারা মনে করছে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে বিরোধী স্বরকে দমিয়ে দেওয়া হবে। তবে পাল্টা যুক্তি দিয়েছে বিজেপিও। আসুন সব পক্ষের মতামত জেনে নেওয়া যাক।

Advertisement
কলেজে কলেজে মাথায় BJP MP-MLA, শিক্ষায় 'গৈরিকীকরণ'? যা বলছেন BJP, CPIM ও শিক্ষাবিদরাএবার কলেজে গৈরিকীকরণ?
হাইলাইটস
  • কলেজের পরিচালন সমিতির মাথায় এবার বসলেন বিজেপি বিধায়ক এবং সাংসদরা
  • এরপরই শিক্ষা ব্যবস্থায় গৈরিকীকরণের অভিযোগ করছে বিরোধীরা
  • এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে বিরোধী স্বরকে দমিয়ে দেওয়া হবে

এবার পশ্চিমবঙ্গের কলেজের পরিচালন সমিতির মাথায় বসলেন বিজেপির বিধায়ক এবং সাংসদরা। ইতিমধ্যেই রাজ্যের ২৪৭টি কলেজের তালিকা প্রকাশ করেছে উচ্চ শিক্ষা দফতর। সেই লিস্টে তাকালেই পরিষ্কার, কলেজের গভর্নিং বডির মাথায় বসানো হয়েছে বিজেপি নেতা-মন্ত্রীদেরই। আর নয়া সরকারের এহেন কাজের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থাতেও 'গৈরিকীকরণ' শুরু হল বলে অভিযোগ করছে বিরোধীরা। এমনকী এরপর রাজ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে বিরোধী স্বরকে দমিয়ে দেওয়া হবে বলেও দাবি করছেন তারা। যদিও এই অভিযোগকে পাত্তাই দিচ্ছে না শাসক দল বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের দাবি, রাজ্যে বিরোধী পরিসর রয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মাথায় রাখতে হবে, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্রে রাজনীতিকরণের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। বাম আমলে অনিলায়ন, তৃণমূল আমলে তৃণমূলীকরণের বিস্তর অভিযোগ ছিল। এরপর আবার শিক্ষাক্ষেত্রের গৈরিকীকরণ শুরু হয়েছে বলে দাবি সামনে আসছে।  

এই প্রসঙ্গে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, কবি তথা অধ্যাপক অংশুমান কর বলেন, 'এই ধরনের একটা সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে দেখে আমি খুবই হতাশ। তার কারণ, নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পরেও বিজেপির তরফ থেকে জানানো হয়েছিল যে কোনওরকম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাথায় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা থাকবেন না। ঠিক তার উল্টো কাজটা সরকার করল। এটা তো একেবারেই কাঙ্ক্ষিত নয়।'

তাঁর মতে, কলেজের গভর্নিং বডির প্রেসিডেন্ট যদি একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হন, তাহলে সেই জায়গার পড়াশুনোর পরিবেশটা সম্পূর্ণভাবে রাজনীতিকরণ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, 'তৃণমূলের আমলে ঠিক এভাবেই সবটা রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত ছিল। যেই সব অধ্যাপকেরা স্বাধীনভাবে কাজ করার চেষ্টা করেছেন, তাঁদের লাঞ্ছিত হতে হয়েছে। আমার নিজের আশঙ্কা, সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে।' 

তাঁর মতে, এভাবে গভর্নিং বডির মাথায় কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে বসালে ভুল বার্তা যায়। সেই কলেজের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, অশিক্ষক কর্মচারীরা মনে করতে শুরু করেন, কোনওক্ষেত্রেই সরকারের সমালোচনা করা যাবে না। তার কারণ মাথায় বসে রয়েছেন সরকারের একজন প্রতিনিধি।

Advertisement

সিপিআইএম নেতা তথা এসএফআই-এর প্রাক্তন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ময়ূখ বিশ্বাস আবার সরাসরি শিক্ষাক্ষেত্রে গৈরিকীকরণের অভিযোগ করলেন। তিনি বলেন, 'জাতীয় শিক্ষানীতি চালু করেছিল বিজেপি। সেটা আরএসএসের মদতেই হয়েছে। কর্পোরেটের স্বার্থেই হয়েছে। এর প্রতি পদে পদে রয়েছে শিক্ষাক্ষেত্রে গৈরিকীকরণ। ওরা অন্যান্য রাজ্যে অনেক আগেই এটা করেছে। ক্ষমতায় আসার পর এখানে শুরু করেছে। এটা আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। এটাই বিজেপির পলিসি ছিল। অতীতে তৃণমূল যেমন করে চলেছে, তারই কন্টিনিউয়েশন।'


তাঁর মতে, জাতীয় শিক্ষানীতি মেনে চলতে চাইছে বর্তমান রাজ্য সরকার। যেই কারণে বিজেপির বিধায়ক, নেতা-মন্ত্রীরা কলেজের মাথায় বসছেন। তিনি বলেন, 'সেই জন্যই ১২ পাশ না করা অর্জুন সিং এখন ডিকটেট করবেন ব্যারাকপুরের বিভিন্ন কলেজকে। এভাবেই শিক্ষাকে কন্ট্রোল করবে। একটা গান রয়েছে, আজকে যিনি কয়লা দেখেন কালকে তিনি শিক্ষা... কয়লা ছেড়ে শিক্ষা নিয়ে যাতে ব্যবসা হয়। এটাই হচ্ছে ব্যাপার।'


তিনি জানান, বিজেপির এহেন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে লড়াই চলবে। যুবসমাজ এটার বিরুদ্ধে লড়াই করছে। কলেজে কলেজে, স্কুলে স্কুলে যাচ্ছে। এই জন্যই বিজেপির রাগ হচ্ছে। গোঁসা হচ্ছে। তাঁর দাবি, 'আমরা চাই কলেজে শিক্ষক থাকুক। কলেজের কোর্সগুলো ফিরুক। কলেজ যেন বেসরকারি হাতে না চলে যায়।'


যদিও এই সমস্ত অভিযোগকে একবারে উড়িয়ে দিলেন বিজেপি নেতা রাজর্ষি লাহিড়ী। বরং তিনি আগের শিক্ষা ব্যবস্থার যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিলেন। তিনি বলেন, 'শিক্ষা ব্যবস্থার গৈরিকীকরণ কথাটার অর্থ কী? এটা কী জিনিস? এটা খায় না গায়ে মাখে? এই ব্যাপারটা আগে বুঝতে হবে। যাঁরা চিরাচরিত ভাবে ৭০ বছর ধরে যে শিক্ষা ব্যবস্থার রক্তিকরণ করে গিয়েছে, সেটার তো পরিবর্তন চাই। যেখানে দাঁড়িয়ে সিলেবাসে মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের ভক্তি আন্দোলন আট লাইনে এসে, চার লাইনে এসে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। আর মুঘলস দ্য গ্রেট হয়ে গিয়েছে। মার্ক্সিস্ট হিস্টোরিয়ানসরা কাল্পনিক ইতিহাস লিখে দিয়ে গিয়েছেন। আকবর দ্য গ্রেট। ৩০ হাজার নিরপরাধ মানুষকে চিতোর জেতার পরে কচুকাটা করা আকবরকে আকবর দ্য গ্রেট বলা হয়েছে... এভাবেই মার্ক্সিস্ট ইতিহাস তৈরি হয়ে গিয়েছে।'

তিনি দাবি করেন, কিছু ইতিহাসবিদ ইচ্ছে করে ভারতের ইতিহাসকে বাদ দিয়েছেন। আর সেই ভুল ইতিহাসের বদল চাইছেন তাঁরা। রাজর্ষির প্রশ্ন, 'এটাকে গৈরিকীকরণ বলছে? যেটা ভারতবর্ষের সত্যিকারের ইতিহাস? আমরা ভারতবর্ষের যে সত্তা সেটাকে সামনে আনতে চাইছি। সেটাকে ওরা গৈরিকীকরণ বলছে। ভারতের যেটা প্রকৃত ইতিহাস, সত্য ইতিহাস, ভারতবর্ষ, আমার পূর্বপুরুষের, আপনার পূর্বপুরুষের, সবার পূর্বপুরুষের যেটা আসল ইতিহাস, সেটাকে ওরা গৈরিকীকরণ বলছে।'

সেই সঙ্গে তিনি কলেজের মাথায় বিজেপি বিধায়ক বসানোর পক্ষেও যুক্তি দিলেন। তাঁর প্রশ্ন, 'রাজনীতিকরণটা কোথায় হচ্ছে? তাঁরা কি নিজেদের লোক ঢোকাচ্ছে? যদি কোনও ছাত্র-ছাত্রী তৃণমূলের পরিবার থেকে আসে বা কমিউনিস্ট পার্টির পরিবার থেকে আসে, তারা কি সেখানে স্থান পাবে না? আজকে দাঁড়িয়ে যে এত দুর্নীতি হয়েছে, বিধায়ক মাথায় যদি থাকে, তাহলে তো দায়টা থাকবে। বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে।'

পাশাপাশি তিনি মনে করেন, রাজ্যে বিজেপি আসার পরই বিরোধীরা জায়গা পেয়েছে রাজনীতি করার। সিপিআইএম নিজের পার্টি অফিস খুলতে পেরেছে। রাস্তায় আন্দোলন করছে। 

 

POST A COMMENT
Advertisement