মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-- ফাইল ছবিআমরা কথায় বলি, 'নতুন বোতলে পুরনো মদ।' এবারেমমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন হল, সেটা সম্পর্কে আমি বলব, নতুন বোতলে পুরনো মদ পরিবেশন হয়েছে। কীরকম? একটু বুঝিয়ে বলছি আপনাদের। স্ট্রাকচার-টা একই রকম আছে। যেমন, নির্বাচনে না লড়লেও, সেই অমিত মিত্র হলেন অর্থমন্ত্রী। এখন শুনছি, খড়দা থেকে বিধানসভা উপনির্বাচনে তিনি জিতবেন, এইটা ধরে নিয়ে তাঁকে সেখান থেকে প্রার্থী করা হবে এবং সেটা ছ'মাসের মধ্যে করতে হয়।
তাহলে, নতুন বোতলে পুরনো মদ, কেন বলছি? কারণ, পশ্চিমবঙ্গে যাঁরা মন্ত্রী হলেন এবং যাঁরা মন্ত্রী ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেক নতুন মুখ এসেছে। কাজেই, তাঁরা কিন্তু বোতলটাকে নতুন করে দিচ্ছেন। অর্থাৎ, ক্যারেক্টারগুলোতে অনেকেই কিন্তু একটা বড় অংশের নবীন প্রজন্ম! আমি হিসেব করে দেখছিলাম, এক ডজনেরও বেশি নতুন মন্ত্রী হয়েছেন। মহিলাদের অনেককেই মন্ত্রী করা হয়েছে এবং সবচেয়ে বড় কথা হল, যে সব জায়গাগুলোতে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, সেই সব জায়গাগুলোতে কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটু বেশিই গুরুত্ব দিয়েছেন।
পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে এইজন্য বদলানো হল, শিক্ষামন্ত্রীকে এই বদলটা দরকার ছিল বলে মনে করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কারণ, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিভিন্ন উপাচার্য এবং বেশ কিছু স্তরে, এত বেশি অভিযোগ উঠছিল। যেমন, দলাদলি, অধ্যাপক নিয়োগ এবং উপাচার্য এবং উপাচার্যের বিরুদ্ধে একটি গোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল। এরমধ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা এবং সেখানকার ছাত্রদের সমস্যা আছে। আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তো মস্ত বড় একটা সমস্যার কারণ হয়ে উঠেছে। ভুলে গেলে চলবে না যে, এই সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তো আছেই, এমনকী, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের, প্রত্যেকটা স্তরে এত বেশি সমস্যা রয়েছে! সেখানে সিলেবাস সংস্কার থেকে শুরু করে, প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষাকে ছড়িয়ে নিয়ে যাওয়া, নানা রকমের সমস্ত স্কিমগুলোর উপকার পাওয়া, এগুলোতে পারফর্ম্যান্স রিপোর্ট কিন্তু ভালো ছিল না।
যেহেতু, অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হলেন রাজ্যপাল, তিনি কিন্তু মুখ্য সচিবকে সরাসরি অভিযোগও জানাচ্ছিলেন। যেসব জায়গায় ফল্ট লাইনগুলো ছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন সেগুলোকে রেক্টিফাই করার চেষ্টা করছেন। এর আগে, তিনি কিন্তু সংখ্যালঘু মন্ত্রকটা নিজের হাতে রেখেছিলেন। এবারে তিনি ‘মাদ্রাসা মন্ত্রক’ বলে, একজন সংখ্যালঘু প্রতিনিধিকে মন্ত্রকের দায়িত্ব দিয়েছেন।
মন্ত্রিসভার সদস্যদের চরিত্রে যে আমূল পরিবর্তন হয়েছে, তা তো নয়। কেননা, নতুন চরিত্র, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, এক্ষুনি কোথা থেকে পাবেন? জ্যোতিবাবুর ৩৪ বছরের শাসনেও তো আমরা দেখেছি, সেই কমল গুহ, শান্তি ভট্টাচার্য, নির্মল বসু এবং অসীম দাশগুপ্ত। জ্যোতিবাবুর আমলে অশোক মিত্র ইস্তফা দিয়ে, অসীম দাশগুপ্ত এসেছিলেন। অসীমবাবু শেষ পর্যন্ত অর্থমন্ত্রী ছিলেন।
মমতার জমানায় অর্থমন্ত্রী, অমিত মিত্র কিন্তু থেকে গেলেন। অমিত মিত্র যখন প্রথম অর্থমন্ত্রী হয়েছিলেন, আমার মনে আছে, তখন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা, জয়রাম রমেশ, কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রী ছিলেন। প্রগতি ময়দানের একটা অনুষ্ঠানে, অমিত মিত্রের সামনেই তখন তিনি বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম থেকে তৃণমূলে আসার পরে কি পরিবর্তন হয়েছে, জানি না। আসল যে পরিবর্তন, সেটা কিন্তু অমিত মিত্রের মধ্যে হয়েছে। যেমন, ট্রাউজার পরিহিত ফিকি-র মহাসচিব, অমিত মিত্র কিন্তু হয়ে গেছেন, ধুতি পরিহিত বাঙালি অর্থমন্ত্রী। সুতরাং, পশ্চিমবঙ্গে, অমিত মিত্রের পরিবর্তনটাই হল, আসল পরিবর্তন। অমিত মিত্র সেই যে ধুতি পরলেন, এখনও কিন্তু সেই ধুতিটা তিনি ছাড়েননি।
জয়রাম রমেশ বলেছিলেন, 'তিনি ফিকি-তে দ্রুত আর্থিক সংস্কারের কথা বলতেন। অ্যাডাম স্মিথের যোগ্য শিষ্য হিসেবে, খোলা বাজারের উন্মুক্ত বাণিজ্যের কথা বলতেন। এখন তিনি মোটামুটি বামপন্থীদের মতো, নিয়ন্ত্রণের অর্থনীতির কথা বলছেন।' জবাবে অমিত মিত্র বলেছিলেন, ‘বোধহয়, জয়রামরমেশ অ্যাডাম স্মিথের প্রথম বইটা পড়েননি। দ্বিতীয় বইতে খোলা বাজার বা লেসি ফেয়ারের কথা বলা হলেও প্রথম বইটাতে বলা হয়েছিল, বাজারের নৈতিকতার কথা। অর্থাৎ, প্রথমে নৈতিকতা হওয়া দরকার। তারপর তো খোলা বাজার আসবে। সুতরাং, সেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন, অমিত মিত্র। আজও কিন্তু সেই অমিত মিত্র, প্রাসঙ্গিক থেকে গেলেন।
পুরনো মন্ত্রীদের যে রদবদল হয়েছে, তাতে চরিত্র খুব বেশি না বদলালেও দফতর কিন্তু বদল হয়েছে। যেরকম, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের খাদ্য দফতর চলে যাওয়া। মদন মিত্রের মন্ত্রী হতে না পারা। তাঁর এত বাক্যবাণ নিক্ষেপ করার পরেও, টিভি চ্যানেলে এত কথা বলার পরেও, তিনি কিন্তু মন্ত্রী হতে পারলেন না। তাঁর ইচ্ছে থাকলেও, পরিবহনই হোক বা অন্য কোনও দফতর কিন্তু তিনি পেলেন না।
আবার, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের মতো প্রবীণ বিদ্যুৎমন্ত্রীকে সরিয়ে দিয়ে, অরূপ বিশ্বাসকে সেখানে নিয়ে আসা। আসলে, অরূপ বিশ্বাস, অনেক বেশি অনুগত। তিনি অনেক বেশি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়ন্ত্রণে থাকবেন এবং তাঁর কথা শুনে চলবেন। এটাই কী সবথেকে বড় কারণ? বিদ্যুৎমন্ত্রী তো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এখানে সিইএসসি-র বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত আছে, যেগুলো বিদ্যুৎমন্ত্রীকে সমাধান করতে হবে।
এছাড়া, শিক্ষামন্ত্রী বদলও যেরকম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আবার চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে, ববি হাকিমের দফতর দিয়ে দেওয়া এবং ববি হাকিমকে শুধু হাউজিংয়ে রেখে দেওয়া, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতা পুর নির্বাচন আসছে এবং ববি হাকিমকে, অনেক বেশি সময় সেখানে দিতে হবে, হয়তো সেটাও একটা কারণ। নগর উন্নয়ন দফতর, যথেষ্ট বিতর্কিত বিষয় এবং সেটা যেহেতু কলকাতা পুরসভার সঙ্গে যুক্ত বিষয়,সম্ভবত সেই কারণেই, চন্দ্রিমাকে দায়িত্ব দিয়ে, ববিকে সেখান থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।