CPIM-এর প্রতিবাদরেলের জমিতে হকার উচ্ছেদ নিয়ে উত্তপ্ত বঙ্গ রাজনীতি। আসলে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে নতুন সরকার তৈরি হওয়ার পরই হকার উচ্ছেদে গতি বাড়িয়েছে রেল। হাওড়া, শিয়ালদার মতো বড় স্টেশন থেকে শুরু করে দমদম, যাদবপুর সহ একাধিক স্টেশনে চলছে 'বেআইনি হকার' উচ্ছেদ। আর এই উচ্ছেদের বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ গড়ে তুলছে বামেরা। সিপিআইএম-এর গার্গী চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে ময়ূখ বিশ্বাস, কলতান দাশগুপ্ত, সৃজন ভট্টাচার্যের মতো নেতা-নেত্রীরা সমনে থেকে এই উচ্ছেদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। তাঁরা স্পষ্ট বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে 'বুলডোজার অ্যাকশন' চলবে না। সঠিক পুনর্বাসন দিয়েই হকার উচ্ছেদ করতে হবে।
আর যখন রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস (ভোটের অঙ্কে) কার্যত ভেঙে খান খান, সেখানে সিপিআইএম-এর এহেন আন্দোলন নজর কেড়েছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। অনেকেই মনে করছেন হকারদের পাশে থেকেই বাংলার রাজনীতির ময়দানে নিজেদের ভিত শক্ত করছে সিপিআইএম। তাঁরা এখন তৃণমূলকে পিছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করছে।
এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দেবলীনা শেঠ বলেন, 'সিপিআইএম যেহেতু একটা রেজিমেন্টেড দল। ওরা ফলতায় দু'নম্বরে উঠে এসেছে। ওদের ভোট কিছুটা বেড়েছে। ওরা তো তৃণমূলের ভাঙনের সময় নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করার চেষ্টা করবেই।'
তৃণমূল প্রসঙ্গে তাঁর দাবি, 'তৃণমূল দলটা অদ্ভুতভাবে ইনক্লুসিভ দল ছিল। মানে সবাইকে নিয়ে চলত। এবার এই সবাইটা কারা? তাদের জমিটা কোথায়? এই প্রশ্নচিহ্নের মুখে আমরা পড়ে গিয়েছি। সেখানে নন-রেজিমেন্টেশনের জায়গা থেকে তৃণমূল একটা ন্যাচারাল ডেথের দিকে চলে যাচ্ছে কি? আমি ঠিক জানি না। কারণ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও কিন্তু যথেষ্ট বয়স হয়েছে। এখন কি ফেরা সম্ভব?'
যদিও মাথায় রাখতে হবে, সিপিআইএম হাজার প্রতিরোধের চেষ্টা করেও এখনও তেমন কিছুই করে উঠতে পারেনি। রেল সেই বুলডোজার অ্যাকশন নিয়েছে। যদিও এটাকে নিজেদের হার হিসেবে দেখতে নারাজ সিপিআইএম নেতা ময়ূখ বিশ্বাস। তিনি বলেন, 'বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রশক্তি। এত বিপুল পরিমাণ সিআরপিএফ ছিল, বুলডোজার এসেছে। রেলের আরপিএফ ছিল। পাশাপাশি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন, ডাবল ইঞ্জিন সরকারের পুলিশ প্রশাসন এবং সমস্ত কিছু নিয়েই রাষ্ট্রশক্তি ঝাঁপিয়ে পড়েছে। যে কোনও যুদ্ধের মধ্যে উত্থান-পতন থাকে। কিন্তু টিকে থাকতে হয়।'
যদিও এই হকার উচ্ছেদের সময়ই বারবার বামেদের আমলের 'অপারেশন সানশাইন' নিয়ে পাল্টা দিচ্ছে বিজেপি। আর এই বিষয়টা নিয়েও মুখ খুলেছেন ময়ূখ। তিনি বলেন, 'অপারেশন সানশাইন আর এর মধ্যে এক মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।অপারেশন সানশাইনে সেই সময় দাঁড়িয়ে বিকল্প পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এখানে তেমন কিছুই করা হয়নি।'
সিপিআইএম কি ভোট রাজনীতিতে নিজেকে তুলে ধরতে পারবে?
২০২৬-এর ভোটের পর বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'স্বপ্নের তৃণমূলের' ভাঙন কার্যত স্পষ্ট। প্রথমে বিধানসভায় 'ঋতব্রত মডেল'। তারপর আবার লোকসভায় কাকলি মডেল। এই দুই মডেলে খান খান তৃণমূল। কিন্তু ২০২৬-এর ভোটেও মোটামুটি ৪০ শতাংশ ভোট পেয়েছে ঘাসফুল। অর্থাৎ এই ভোট বিজেপির বিরুদ্ধে গিয়েছে। এখন প্রশ্ন হল, হকার উচ্ছেদের প্রতিরোধের মাধ্যমে কি এই ভোটের কিছুটা ঘরে তুলতে পারবে বামেদের ব্রিগেড? এর উত্তরে দেবলীনা বলেন, 'ভোটের এখন অনেক দেরি। কাজেই ভোট ব্যাঙ্কের থেকেও এটা ওদের জন্য এটা একটা স্ট্র্যাটেজি। গরিব মানুষের পাশে থাকাটা একটা নীতিগত সিদ্ধান্ত।'
পাশাপাশি তাঁর মন্তব্য, 'সিপিআইএম একটা প্রতিরোধ তৈরি করেছে। তৃণমূল দলটা পুরো বাড়িতে বসে গিয়েছে। সিপিআইএমদের আমরা দেখছি তারা পথে নামছে। তারা প্রতিবাদ করছে। তখন তো সেটাকে একটা জায়গায় তারিফ করতে হবে। এই যে মানুষগুলো যাঁরা একটা বুলডোজারের মুখে পড়ে সবকিছু হারাচ্ছে, তাঁদের জন্য কেউ ভাবছে। একটা জায়গায় আমাদের স্বীকৃতি দিতেই হবে।'
একই মত ময়ূখেরও। তিনিও জানালেন, এর সঙ্গে ভোট রাজনীতির কোনও সম্পর্ক। তাঁরা নীতিগত অবস্থান থেকেই এই কাজটা করছে সিপিআইএম। পাশাপাশি তাঁর দাবি, যে কোনও শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন। শুধুমাত্র বিজেপির আইটি সেলই তাঁদের নিন্দা করছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
যদিও দেবলীনার মতে, সবে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। এখন সবাই ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ মোডে রয়েছে। আর গেরুয়া বাহিনীও খুব সহজে সিপিআইএম-কে জায়গা ছেড়ে দেবে না। তারা চাইবে না কোনও রেজিমেন্টেড দল উঠে আসুক। বরং সিপিআইএম-এর জন্য সামনের লড়াই বেশ কঠিন বলেই মনে করছেন তিনি।