যাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে তোলাবাজি, হুমকি এবং দাদাগিরির নানা অভিযোগ ঘুরে বেড়াত, সেই কুমারেশই এখন পুলিশের হেফাজতে। গ্রেফতার দাসপুরে প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়কের ছেলে কুমারেশ ভূঁইয়া। এক সময় যাঁর নাম শুনলেই আতঙ্ক ছড়াত বলে অভিযোগ, যাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে তোলাবাজি, হুমকি এবং দাদাগিরির নানা অভিযোগ ঘুরে বেড়াত, সেই কুমারেশই এখন পুলিশের হেফাজতে। আর সেই ঘটনাকে ঘিরেই উঠছে বড় প্রশ্ন। এত অভিযোগ যদি আগে থেকেই ছিল, তা হলে এত দিন ব্যবস্থা নেওয়া হল না কেন?
পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুরে রবিবার সন্ধ্যায় বালিপোতা এলাকা থেকে আটক করা হয় কুমারেশ ভূঁইয়াকে। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। অভিযোগ, তোলাবাজি, ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে এসসি-এসটি আইনের ধারাও যুক্ত করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকেই এলাকায় ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, অভিযোগ নতুন নয়। নতুন শুধু রাজনৈতিক পরিস্থিতি। এত দিন যেটা ‘দাপট’ বলে পরিচিত ছিল, এখন সেটাই প্রকাশ্যে ‘অভিযোগ’ হয়ে উঠছে। এলাকায় বহু দিন ধরেই রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠত বলে দাবি স্থানীয়দের।
সূত্রের খবর, বালিপোতা এলাকায় কুমারেশের একটি দোকান ছিল। নির্বাচনে রাজনৈতিক পালাবদলের পর সেই দোকান দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল বলে স্থানীয়দের দাবি। রবিবার দোকান খুলতে গেলে বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। তার পরেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাধা পেয়ে কুমারেশ উল্টে হুমকি দিতে শুরু করেন। এর পরেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন এলাকার মানুষ। শুরু হয় বিক্ষোভ। পরে পুলিশ গিয়ে তাঁকে আটক করে।
ঘটনার পর থেকেই দাসপুরের বিভিন্ন এলাকায় একটাই আলোচনা; ক্ষমতা চলে গেলে কি অভিযোগও হঠাৎ সামনে আসে? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, বাংলার গ্রামীণ রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রতিনিধিদের পরিবারকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আলাদা ক্ষমতার বলয়। নির্বাচিত পদে না থেকেও বহু ক্ষেত্রে তাঁরা হয়ে উঠেছেন এলাকার ‘অঘোষিত সিদ্ধান্তগ্রহণকারী’।
স্থানীয় বিজেপি নেতা রাজু আড়ি দাবি করেছেন, “বিধায়কের ছেলে হওয়ার সুবাদে এলাকায় এমন কোনও কাজ ছিল না যেখানে ওর প্রভাব ছিল না। তোলাবাজি, মারধর, ভয় দেখানো; সবেতেই নাম জড়িয়েছিল।” যদিও এই সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে কুমারেশের তরফে এখনও প্রকাশ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
দাসপুরের রাজনীতিতে ভূঁইয়া পরিবারের প্রভাব দীর্ঘদিনের। কুমারেশের বাবা অজিত ভূঁইয়া ছিলেন তৃণমূলের বিধায়ক। তাঁর মৃত্যুর পর দল প্রার্থী করে স্ত্রী মমতা ভূঁইয়াকে। সহানুভূতির ভোটে জয়ও পান তিনি। কিন্তু তার পর থেকেই এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাবের কেন্দ্র হিসেবে উঠে আসতে শুরু করে পরিবারের নাম; এমনটাই অভিযোগ স্থানীয়দের একাংশের।
স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসন থেকে ব্যবসা, কলেজ রাজনীতি থেকে ঠিকাদারি; নানা ক্ষেত্রে বাড়তে থাকে প্রভাব। নাড়াজোল রাজ কলেজের নামও উঠে আসছে বারবার। অভিযোগ, ছাত্র রাজনীতি এবং প্রশাসনিক কাজেও হস্তক্ষেপ করা হত। যদিও এই সমস্ত অভিযোগের স্বাধীন যাচাই করেনি আনন্দবাজার অনলাইন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধুমাত্র একজন প্রাক্তন বিধায়কের ছেলে গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনা নয়। বরং এটি বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক বড় প্রতিচ্ছবি। যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় অনেক সময় আইনের থেকেও বড় হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ। আর সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ভয়েই মুখ খুলতে চান না।
সমাজবিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, বাংলার বহু এলাকায় “দাদাগিরি”, “তোলাবাজি” এবং “কাটমানি” শব্দগুলি প্রায় স্বাভাবিক রাজনৈতিক অভিধানের অংশ হয়ে গিয়েছিল। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তৈরি হয়েছিল স্থানীয় শক্তিকেন্দ্র। ক্ষমতা থাকলে অভিযোগ চাপা পড়ে থাকত, আর ক্ষমতার পালাবদল হলেই সামনে আসত পুরনো ক্ষোভ।
এই ঘটনার পর প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, বহু অভিযোগ আগেও জানানো হয়েছিল। তা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই কি এত দিন নীরব ছিল প্রশাসন? উঠছে সেই প্রশ্নও।
যদিও শাসকদলের একাংশের বক্তব্য, আইন আইনের পথেই চলছে। কেউ দোষী হলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবেই। তবে সাধারণ মানুষের একাংশ বলছেন, এই অবস্থান কি আগে নেওয়া যেত না?
রিপোর্টারঃ শাহজাহান আলি