ক্যানিংয়ে এবার হইহই করে দুর্গাপুজো একসময় যেখানে উৎসবের আনন্দের মধ্যেও ছিল আতঙ্কের ছায়া, সেখানেই এবার যেন অন্য ছবি। আশঙ্কার দিন পেরিয়ে এবার নতুন করে দুর্গাপুজোয় ফিরেছে ক্যানিংয়ে। প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক শওকত মোল্লাকে ঘিরে ভয়ের যে অভিযোগ এতদিন স্থানীয়দের মুখে শোনা যেত, এবার সেই ছবিই বদলে যাওয়ার দাবি করছেন এলাকার বহু মানুষ। আর সেই বদলে যাওয়া আবহেই এবার বড় করে দুর্গাবোধন। যেন এতদিনের জমে থাকা ভয়কে সরিয়ে আলোর উৎসবের ফেরা।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং পূর্ব বিধানসভা এলাকার জীবনতলা থানার অধীনে গত বছর দুর্গাপুজোর সংখ্যা ছিল ১১৮। স্থানীয়দের দাবি, সেই সময় বেশ কিছু পুজো নানা কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাঁদের অভিযোগ ছিল, পুজোর সময় মাইক বাজানো, শাঁখ-ঘণ্টা কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রেও এক ধরনের চাপ বা আশঙ্কার পরিবেশ তৈরি হত। স্থানীয়দের একাংশের বক্তব্য, নবমীর দিনেই প্রতিমা বিসর্জন দিতে হত। আজানের সময় মাইক বন্ধ করে দিতে হত বলেও দাবি তাঁদের। ফলে পুজোর আনন্দ থাকলেও, তার সঙ্গে মিশে থাকত অস্বস্তি।
রাজনৈতিক পালাবদলের পর এ বছর ক্যানিং এলাকায় দুর্গাপুজোর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৩৬। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় বেড়েছে ১৮টি পুজো। শুধু সংখ্যা বাড়েনি, স্থানীয়দের দাবি, কয়েক বছর ধরে যে পুজোগুলি বন্ধ ছিল, তার মধ্যে বেশ কয়েকটিও এবার ফের শুরু হয়েছে। আর সেই কারণেই পুজোর আয়োজন ঘিরে এলাকার মানুষের উৎসাহও এবার চোখে পড়ার মতো।
পুজো উদ্যোক্তাদের কথায়, এবারের উৎসবের আবহ আগের তুলনায় আলাদা। কোথাও মণ্ডপ তৈরির ব্যস্ততা, কোথাও প্রতিমা আনার প্রস্তুতি, আবার কোথাও পুজোর পুরনো রীতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। বহুদিন পর নিজেদের মতো করে পুজো করার সুযোগ মিলছে, এমনটাই মনে করছেন এলাকার বাসিন্দারা।
একসময়কার সেই দিনগুলোর কথা উঠলেই অবশ্য স্থানীয়দের গলায় ফিরে আসে অন্য সুর। তাঁদের কেউ কেউ দাবি করছেন, পুজোর দিনগুলিতে সবসময় একটা ভয় কাজ করত। কখন কী নিয়ে আপত্তি উঠবে, কখন কী বন্ধ করতে হবে, সেই দুশ্চিন্তা নাকি উৎসবের আনন্দকেও অনেকটাই ম্লান করে দিত। শাঁখ-ঘণ্টার শব্দ, ঢাকের বাদ্যি কিংবা মাইকের আওয়াজ, যা একটা দুর্গাপুজোর স্বাভাবিক অংশ, সেগুলিও নাকি অনেক সময় সীমাবদ্ধতার মধ্যে করতে হত।
আর এই বদলে যাওয়া পরিস্থিতির সঙ্গে স্থানীয়রা সরাসরি রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবর্তনকেও জুড়ে দেখছেন। তাঁদের বক্তব্য, সরকার বদলের পর প্রশাসনিক পরিবেশেও পরিবর্তন এসেছে। তাঁদের একাংশের দাবি, এবার পুজো নিয়ে আগের মতো আতঙ্ক নেই। সেই জায়গায় এসেছে আত্মবিশ্বাস। তাই কয়েক বছর ধরে বন্ধ থাকা পুজো ফেরানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
এলাকার এক বাসিন্দার কথায়, 'রাজ্যে এখন সনাতনী সরকার, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আমাদের পুজো করতে আর কোনও ভয় বা ভীতি থাকবে না।' তাঁর এই বক্তব্যের মধ্যেই যেন ধরা পড়ছে স্থানীয় রাজনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে ধর্মীয় উৎসবের আবহকে জুড়ে দেখার প্রবণতা। কারও কাছে এটি শুধু দুর্গাপুজো নয়, বরং রাজনৈতিক পরিস্থিতির বদলের পর নিজেদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার প্রতীক।
এই আবহের মাঝেই উঠে আসছে শওকত মোল্লার প্রসঙ্গ। প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক বর্তমানে জেলবন্দি। তাঁকে ঘিরে অতীতে এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব এবং পুজোকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ নিয়ে নানা কথা সামনে এসেছে। সেই অতীতের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা টানছেন এলাকার বাসিন্দারাই। তাঁদের বক্তব্য, আগে যে পরিবেশ নিয়ে তাঁরা আতঙ্কিত থাকতেন বলে দাবি করছেন, এখন সেই জায়গায় অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎসব করতে পারছেন।
গত বছরের ১১৮ থেকে এ বছরের ১৩৬, সংখ্যার হিসেবে পরিবর্তনটা হয়তো মাত্র ১৮টি পুজোর। কিন্তু স্থানীয়দের কাছে এই ১৮টি পুজো শুধুমাত্র একটি সংখ্যা নয়। তাঁদের চোখে এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ফিরে পাওয়ার অনুভূতি। বন্ধ হয়ে যাওয়া আয়োজন আবার শুরু করার সাহস। আর সেই সাহস থেকেই এবার আরও বড় করে দুর্গাবোধনের প্রস্তুতি।
রিপোর্টার- প্রসেনজিৎ সাহা