পশ্চিমবঙ্গের ফরাক্কা বাঁধ নিয়ে এত সমস্যা কেন?বঙ্গোপসাগর থেকে এলাহাবাদের সঙ্গমে সঙ্গমে পৌঁছায় ইলিশ। শুনতে আশ্চর্য ও চমকপ্রদ লাগলেও আজ থেকে ৫১ বছর আগে এ ছিল একেবারে খাঁটি ঘটনা। ১৯৭৫ সালের আগে বর্ষাকালে ইলিশ মাছ এই দীর্ঘ রাস্তা পার করে এলাহাবাদ পর্যন্ত পৌঁছে যেত বলে নজির রয়েছে। এমনকি সরকারি কাগজপত্রেও একথার উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু ১৯৭৫ সালে পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গা নদীর উপর একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়, যা ইলিশের উজানের এই চলা পাকাপাকি বন্ধ করে দেয়। এই বাঁধটিই আজকের সবচেয়ে আলোচিত ফরাক্কা বাঁধ বা ফরাক্কা ব্যারেজ। মুর্শিদাবাদ জেলায় গঙ্গার উপর তৈরি এই বাঁধের দূরত্ব বাংলাদেশ থেকে মাত্র ১৬-১৮ কিমি। এখন এই বাঁধ নিয়ে চলছে তীব্র আলোচনা। কিন্তু প্রায় ২.২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ১০৯টি গেট বিশিষ্ট এই বাঁধ নির্মাণের প্রয়োজন পড়েছিল কেন?
হুগলি নদীতে অতিরিক্ত পলি জমে জমে তা ক্রমশ নদীকে অগভীর করে তুলছিল। বড় বড় জাহাজগুলিকে বন্দরে পৌঁছতে নানা কসরত করতে হত। এই বিষ.টির দিকে নজর দিয়ে বিশেষজ্ঞরা পরিকল্পনা করেন, গঙ্গা থেকে কিছু অতিরিক্ত জল হুগলি নদীতে প্রবাহিত করা হলে পলি ধুয়ে যাবে এবং বন্দরটি চালু থাকবে। উল্লেখ্য বিষয় হল, ১৮৫৩ সালে ইংরেজ আমলেও ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার গঙ্গার জল হুগলি নদীতে প্রবাহিত করার জন্য ফারাক্কার কাছে একটি বাঁধ নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তখন নানা কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
বিহার ও ঝাড়খণ্ডের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গা পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলায় প্রবেশ করে। এখানে এটি কেবল গঙ্গা নামেই পরিচিত থাকে। এরপর এটি ফরাক্কায় পৌঁছায়। ফরাক্কা ব্যারেজ গঙ্গার জল নিয়ন্ত্রণ করে। এই ব্যারেজের চারপাশ থেকেই গঙ্গা দু'ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে।
গঙ্গার যে শাখাটি ভারতে, অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে, তাকে ভাগীরথী বলা হয়। পরবর্তীকালে এটি হুগলি নদী নামে পরিচিত হয়। কলকাতা ও হলদিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলি এই নদীর তীরে অবস্থিত। মূলত এই নদীর জন্যই ফরাক্কা ব্যারেজ নির্মাণ করা হয়েছিল। ফারাক্কা ব্যারেজ থেকে ৩৮ থেকে ৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সংযোগ খালের মাধ্যমে হুগলি নদীতে গঙ্গার জল ছাড়া হয়, যাতে কলকাতা বন্দরে পলি জমতে না পারে। অন্যদিকে, অপর শাখাটি পদ্মা নামে বাংলাদেশে চলে গিয়েছে।
যখন হুগলি নদীতে ব্যারেজ থেকে জল ছাড়া হতে শুরু করে, তখন বাংলাদেশে পদ্মার জল অনেকাংশেই কমে যায়। ঢাকার দাবি, এরফলে তাদের কৃষি, মৎস্য ও পানীয় জল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৯৭৫ সাল থেকেই এই নিয়ে শুরু হয় লম্বা বিবাদ। অবশেষে ১৯৯৬ সালে আসে ফরাক্কা চুক্তি। যার আওতায় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা হয়।
ফরাক্কা জলচুক্তি হল গঙ্গা নদীর জলবন্টন নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যেকার চুক্তি। ১৯৯৬ সালের ১২ই ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এইচ. ডি. দেবে গৌড়া এবং শেখ হাসিনা এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। আদতে এই চুক্তির মেয়াদ ছিল ৩০ বছর। যা ২০২৬ সালে শেষ হতে চলেছে। ফলে ফরাক্কা চুক্তি আবার আলোচনায় উঠে এসেছে।
জল বন্টনের হিসাব
এখন বাংলাদেশের আপত্তির কারণ কী?
দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার এই চুক্তিটি সঠিক ভাবে কাজ করেছে। তবে, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের পর ঢাকার সুর পাল্টে গেছে। বাংলাদেশ আরও জল চাইছে। বাংলাদেশের বক্তব্য হল, চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যা কম ছিল, জলবায়ু ভিন্ন ছিল এবং পরিবেশ আজকের চেয়ে বেশি অনুকূল ছিল। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি অনেকটাই আলাদা। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং খরা নদীর প্রবাহে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই আরও জল চাই তাদের। এমনকি বিষয়টি নিয়ে রাষ্ট্রসংঘে যাওয়ারও হুমকি দিচ্ছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ এখন কী চাইছে?
বাংলাদেশ এখন এই চুক্তি পুনরায় করার আগে নতুন চুক্তিতে একটি 'গ্যারান্টি' অন্তর্ভূক্ত করার দাবি জানাবে বলে খবর। এই গ্যারান্টির অর্থ হল, শুষ্ক মরশুমেও বাংলাদেশ যাতে জল সরবরাহ পেতে থাকে। প্রয়োজনে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক ফোরামে যেতেও ঢাকা প্রস্তুত।
মঙ্গলবার ঢাকায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স কর্তৃক আয়োজিত 'গঙ্গা জলচুক্তি: পুনঃআলোচনার বিষয়সমূহ' শীর্ষক এক সেমিনারে বাংলাদেশের জলসম্পদ মন্ত্রী শহিদুদ্দিন চৌধুরী আনি এ কথা বলেন।
নতুন চুক্তি থেকে বিহার কী চায়?
যখন বাংলাদেশের সঙ্গে ফরাক্কা জলচুক্তি রিন্যিউ বিষয়টি সামনে আসছে, তখন বিহারও বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে। এই চুক্তির সঙ্গে বিহারের কী সম্পর্ক? বিহারে এই চুক্তির বিরোধিতা এতটাই প্রবল যে, ২০১৬ সালে তৎকালীন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার ঘোষণা করেছিলেন, বিহারের সমস্যার একমাত্র সমাধান হলো ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে ফেলা।
আসলে বিহার দীর্ঘদিন ধরেই বন্যা, নদীভাঙন, পলি জমা এবং জল ব্যবস্থাপনার মতো সমস্যার সম্মুখীন হয়ে আসছে। ফরাক্কা সেতুর কারণে গঙ্গা নদীতে পলি জমে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে গেছে এবং বন্যার ঝুঁকি বেড়েছে। ভাগলপুর ও মুঙ্গের সহ বিহারের বেশ কয়েকটি জেলা প্রতি বছর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবছরও হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে গরমের মরশুমে জল ছাড়তে হয়। এর ফলে বিহারে সেচ ও পানীয় জলের সঙ্কট দেখা দেয়। বক্সারে গঙ্গার প্রবাহ কম, অন্যদিকে ফারাক্কায় বেশি জল ছাড়া হয়। বিহারের নেতাদের দাবি, এই চুক্তি করার সময় বিহারের স্বার্থ দেখা হয়নি।ট
পশ্চিমবঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেন?
পশ্চিমবঙ্গের জন্য ফরাক্কা শুধু বাংলাদেশকে জল সরবরাহ করার বিষয় নয়। ফরাক্কা প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল গঙ্গা থেকে হুগলিতে জল এনে কলকাতা বন্দরের জাহাজ চলাচল ক্ষমতা বজায় রাখা। তাই বাংলার জন্য প্রশ্ন হল: বাংলাদেশকে আরও জল দেওয়া হলে হুগলিতে কি যথেষ্ট জল থাকবে? অর্থাৎ, বাংলার উদ্বেগ হল এমন একটি জলবণ্টন নিশ্চিত করা, যা রাজ্যের নিজস্ব চাহিদা এবং কলকাতা-হলদিয়া অঞ্চলের নদী ও বন্দর ব্যবস্থাকে প্রভাবিত না করে।
আবার বর্ষাকালে ফারাক্কা ব্যারেজে জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় বিহারে বন্যা দেখা দেয়। এবারও ঠিক তাই ঘটেছে। ক্রমবর্ধমান বন্যা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে ফারাক্কা ব্যারেজের সমস্ত গেট খুলে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন, যাতে জল আরও দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারে এবং বিহারের উপর চাপ কমে। পাটনার বেশ কয়েকটি ঘাট বর্তমানে জলমগ্ন।
ক্রমবর্ধমান বন্যা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং তাঁকে পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত করেন। চৌধুরী বলেন, ফারাক্কা ব্যারেজের সমস্ত গেট খুলে দিলে গঙ্গার প্রবাহ সহজ হতে পারে এবং বিহারের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হতে পারে।
কেন্দ্রের পক্ষে চ্যালেঞ্জ
ফলে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের সময়সীমার আগে ফরাক্কা জলচুক্তি নিয়ে আলোচনা এখন আর শুধু ভারত-বাংলাদেশের বিষয় নয়। এটি এখন বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশের মধ্যে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন, পরবর্তী চুক্তি ফাইনাল করার আগে কেন্দ্রীয় সরকারকে এই তিন পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।