কনভয় এলাকায় পৌঁছতেই বাইরে থেকে বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয় বলে অভিযোগ। Halishahar News: হালিশহরে মৃত তৃণমূল কর্মী বীরজু কেওটের বাড়িতে গেলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দুপুর ২টো নাগাদ পৌঁছন। সঙ্গে ছিলেন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ দোলা সেন এবং সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতার সফর ঘিরে এলাকায় আগে থেকেই উত্তেজনা ছিল। তাঁর কনভয় এলাকায় পৌঁছতেই বাইরে থেকে বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয় বলে অভিযোগ। মমতাকে লক্ষ্য করে ‘চোর’ স্লোগান ওঠে। তাঁর গাড়ির দিকে কাদা, জুতো এবং পাথর ছোড়ার অভিযোগও উঠেছে।
পুলিশের ঘেরাটোপে শেষ পর্যন্ত এলাকা থেকে বেরিয়ে যান মমতা। তৃণমূল কর্মী বীরজু কেওটের পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ ঘিরেই গত কয়েক দিন ধরে উত্তপ্ত উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচরাপাড়া। পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ হেফাজতে বীরজুকে মারধর করা হয়েছিল। এমনকি দড়ি দিয়ে বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগও তুলেছেন তাঁর স্ত্রী।
মমতার গাড়িতে কাদা, পাথর ছোড়ার অভিযোগ
রবিবার বীরজুর বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন মমতা। তাঁর সঙ্গে ছিলেন দোলা সেন এবং কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় তাঁকে লক্ষ্য করে বিক্ষোভ দেখানো হয় বলে অভিযোগ তৃণমূলের।
মমতা পরে বলেন, তাঁদের গাড়ি লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, পুলিশের সামনেই তাঁদের উপর হামলার চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশকে সরাসরি দায়ী না করে তিনি বলেন, রাজ্যে ‘অরাজকতা’ তৈরি হয়েছে।
মমতার অভিযোগ, 'আমাদের গাড়িতে পাথর ছোঁড়া হচ্ছে। কাস্টডিয়ান ডেথ হচ্ছে। বাংলা লুম্পেনদের হাতে চলে গিয়েছে। পুলিশের সামনে আমাদের উপর হামলার চেষ্টা করছে লুম্পেনরা। পুলিশকে আমি দোষ দিই না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই তো অরাজকতা সৃষ্টি করছেন।'
বাড়ির গলি থেকে মূল রাস্তায় আসার সময় মমতাকে কিছুটা পথ হেঁটে আসতে দেখা যায়। পরে পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে তাঁকে গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়।
কী বললেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়?
ঘটনার পর রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনারের পদত্যাগের দাবি তুলেছেন তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, হালিশহরের ঘটনায় পরিকল্পিতভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণের চেষ্টা করা হয়েছে।
কল্যাণের দাবি, ঘটনার পিছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দিকেও অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মমতাকে লক্ষ্য করে যে ভাবে বিক্ষোভ এবং হামলার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা আগে থেকেই পরিকল্পিত।
হালিশহরে কেন এত উত্তেজনা?
বীরজু কেওটের পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই হালিশহর এবং কাঁচরাপাড়া এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বীরজু ছিলেন তৃণমূলের কর্মী। তাঁর স্ত্রী জেনি শর্মা কেওট কাঁচরাপাড়া পুরসভার ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলর।
পরিবারের দাবি, শুক্রবার সকালে বীরজুকে হালিশহর থানার পুলিশ গ্রেফতার করে। তাঁর নামও FIR এ ছিল না বলে দাবি পরিবারের। তা সত্ত্বেও তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। যদিও পুলিশের দাবি, তাঁকে তোলাবাজি এবং দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল। গ্রেফতারের পরে নিয়ম অনুযায়ী তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হয়। এরপর তাঁকে ব্যারাকপুর মহকুমা আদালতে হাজির করানো হয়।
আদালত তাঁকে পাঁচ দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। এর পরেই ঘটে যায় এই ঘটনা।
পুলিশ হেফাজতে অসুস্থ, হাসপাতালে মৃত্যু
পুলিশের দাবি, হেফাজতে থাকার সময় রাতে অসুস্থ হয়ে পড়েন বীরজু। তাঁকে দ্রুত কল্যাণীর জেএনএম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
বীরজুর মৃত্যুর খবর সামনে আসতেই তাঁর পরিবার পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলে। পরিবারের বক্তব্য, পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার আগে তিনি স্বাভাবিক ছিলেন। এমনকি গ্রেফতারের পরে তাঁর স্ত্রীও তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন বলে দাবি করেছেন।
জেনি শর্মা কেওটের দাবি, রাত ৯টা নাগাদ তিনি স্বামীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। সেই সময় বীরজু সুস্থ ছিলেন বলেই তাঁর দাবি। তার কিছু পরেই পুলিশ হেফাজতে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় বলে অভিযোগ পরিবারের। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কারও স্বাস্থ্যের কীভাবে এমন অবনতি হতে পারে? প্রশ্ন পরিবারের।
‘দড়ি দিয়ে বেঁধে মারধর’, অভিযোগ পরিবারের
বীরজুর স্ত্রী পুলিশের বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, তদন্তকারী আধিকারিক তাঁর স্বামীকে মারধর করেছিলেন। শুধু মারধর নয়, দড়ি দিয়ে বেঁধে তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
পরিবারের আরও দাবি, বীরজুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার পরে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানানো হয়নি। পরে হাসপাতালে গিয়ে তাঁরা তাঁর মৃত্যুর খবর জানতে পারেন বলে অভিযোগ।
বীরজুর শরীরে আঘাতের চিহ্ন এবং রক্তের দাগ দেখতে পেয়েছিলেন বলেও দাবি করেছেন তাঁর স্ত্রী। এই অভিযোগগুলির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে পরিবার।
সরব অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়
বীরজুর মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। পুলিশি ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
অভিষেকের দাবি, বীরজুর নাম এফআইআরে ছিল না। তা সত্ত্বেও তাঁকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। এরপর পুলিশ হেফাজতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করেন অভিষেক।
অভিষেকের প্রশ্ন, 'কোনও ব্যক্তিকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার পরে তাঁর মৃত্যু হলে সেই মৃত্যুর দায় কার? পুলিশ যদি নাগরিকের নিরাপত্তার বদলে আতঙ্কের কারণ হয়ে ওঠে, তা হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে?'
বিজেপির বিধায়কের প্রতিক্রিয়া
ঘটনা নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন বিজপুরের বিজেপি বিধায়ক সুদীপ্ত দাস। তাঁর দাবি, বীরজু স্থানীয় তৃণমূল নেতা কমল অধিকারীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন।
তবে একই সঙ্গে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত প্রয়োজন বলেও জানিয়েছেন তিনি। পরিবারের কোনও সাহায্যের প্রয়োজন হলে পাশে থাকার আশ্বাসও দিয়েছেন বিজেপি বিধায়ক।
অন্য দিকে, তৃণমূল নেতা অমিত গুপ্তও ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন। পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে দাবি করেছেন তিনি।