বাংলায় ‘খারিজি’ মাদ্রাসা কত? তালিকা তৈরির কাজ শুরু, ইউপি মডেলে কড়া পদক্ষেপের ইঙ্গিত

সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, যেসব মাদ্রাসা প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে অস্বীকার করবে বা সরকারি নির্দেশ মানবে না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া বা সরকারি জমিতে নির্মিত অবৈধ পরিকাঠামো ভেঙে দেওয়ার মতো পদক্ষেপও বিবেচনা করা হচ্ছে।

Advertisement
বাংলায় ‘খারিজি’ মাদ্রাসা কত? তালিকা তৈরির কাজ শুরু, ইউপি মডেলে কড়া পদক্ষেপের ইঙ্গিত
হাইলাইটস
  • রাজ্যের স্বীকৃতিহীন, অনিবন্ধিত এবং ব্যক্তিগতভাবে পরিচালিত মাদ্রাসাগুলির উপর নজরদারি বাড়াতে বড় পদক্ষেপ নিতে চলেছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার।
  • প্রশাসনিক সূত্রের খবর, রাজ্যজুড়ে এই ধরনের মাদ্রাসাগুলির তালিকা তৈরির কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।

রাজ্যের স্বীকৃতিহীন, অনিবন্ধিত এবং ব্যক্তিগতভাবে পরিচালিত মাদ্রাসাগুলির উপর নজরদারি বাড়াতে বড় পদক্ষেপ নিতে চলেছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, রাজ্যজুড়ে এই ধরনের মাদ্রাসাগুলির তালিকা তৈরির কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। পাশাপাশি তাদের অর্থের উৎস, পাঠ্যক্রম, শিক্ষক-শিক্ষিকার তথ্য এবং ছাত্রছাত্রীদের নথি খতিয়ে দেখার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।

সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, যেসব মাদ্রাসা প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে অস্বীকার করবে বা সরকারি নির্দেশ মানবে না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া বা সরকারি জমিতে নির্মিত অবৈধ পরিকাঠামো ভেঙে দেওয়ার মতো পদক্ষেপও বিবেচনা করা হচ্ছে।

গত ৫ জুন রাজ্যের সমস্ত জেলা শাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে তাঁরা নিজেদের জেলায় থাকা অনিবন্ধিত, স্বীকৃতিহীন এবং সরকারি অনুদানবিহীন মাদ্রাসাগুলির বিস্তারিত তালিকা প্রস্তুত করেন। আগামী ৫ জুলাইয়ের মধ্যে সেই রিপোর্ট নবান্নে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলিকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তাদের সমস্ত তথ্য জমা দিতে বলা হবে। তা না হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে প্রশাসনিক সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে।

সরকারি মহলের একাংশের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক কারণে এই বিষয়টি উপেক্ষিত ছিল। অতীতের সরকারগুলি ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ নিতে চাননি। তবে বর্তমান সরকার এই বিষয়ে আপস করতে রাজি নয় বলেই সূত্রের দাবি।

প্রশাসনের উদ্বেগের অন্যতম কারণ নিরাপত্তা। অতীতে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা অভিযোগ করেছিল যে কিছু স্বীকৃতিহীন বা তথাকথিত ‘খারিজি’ মাদ্রাসাকে জঙ্গি সংগঠনগুলি অপব্যবহারের চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে ২০১৪ সালের বর্ধমানের খাগড়াগড় বিস্ফোরণের তদন্তে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) দাবি করেছিল, কিছু চরমপন্থী সংগঠন সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মাদ্রাসাগুলিকে নিজেদের কার্যকলাপের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করছিল। যদিও এই অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে।

প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রয়োজনে উত্তরপ্রদেশের আদলে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠন করে মাদ্রাসাগুলির অর্থায়নের উৎসও খতিয়ে দেখা হতে পারে। উত্তরপ্রদেশে অননুমোদিত মাদ্রাসাগুলির বিরুদ্ধে এমন অভিযান চালিয়ে হাজার হাজার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত হয়েছিল।

Advertisement

বর্তমানে রাজ্যের মাদ্রাসাগুলিকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথমত, সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত মাদ্রাসা, যেগুলি রাজ্য সরকারের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত হয় এবং পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষা পর্ষদের নির্ধারিত পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে। দ্বিতীয়ত, স্বীকৃত হলেও সরকারি অনুদানবিহীন মাদ্রাসা, যেগুলি একই পাঠ্যক্রম মেনে চলে কিন্তু সরাসরি সরকারি অর্থ পায় না। তৃতীয়ত, অনিবন্ধিত বা স্বীকৃতিহীন মাদ্রাসা, যাদের প্রকৃত সংখ্যা এখনও স্পষ্ট নয় এবং বর্তমান সমীক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্যই হল সেই সংখ্যা নির্ধারণ করা।

এ ছাড়া রয়েছে তথাকথিত ‘খারিজি’ মাদ্রাসা, যেগুলি মূলত ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হয় এবং কোনও সরকারি শিক্ষা বোর্ডের আওতায় পড়ে না। এই প্রতিষ্ঠানগুলির পাঠ্যক্রম মূলত ইসলামি ধর্মতত্ত্ব ও মৌলভি তৈরির ওপর কেন্দ্রীভূত।

প্রশাসনের একাংশের মতে, রাজ্যে বর্তমানে সক্রিয় অনিবন্ধিত ও খারিজি মাদ্রাসার প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে কোনও নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য নেই। তবে অতীতের কিছু গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এই সংখ্যা কয়েক হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

উল্লেখযোগ্যভাবে, অতীতের বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল সরকারও বিভিন্ন সময়ে স্বীকৃতিহীন মাদ্রাসাগুলিকে সরকারি কাঠামোর আওতায় আনার চেষ্টা করেছিল। তবে নানা কারণে সেই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ সফল হয়নি। অনেক প্রতিষ্ঠান সরকারি স্বীকৃতির জন্য আবেদনই করেনি, কারণ তাতে তাদের আর্থিক ও প্রশাসনিক তথ্য প্রকাশ করতে হতো।

তবে মাদ্রাসা মহলের একটি অংশ সরকারি তদারকির বিরোধিতা করছে না। তাঁদের বক্তব্য, সরকার নিয়মিতভাবে পাঠ্যক্রম, অর্থায়নের উৎস এবং ছাত্রছাত্রীদের কল্যাণমূলক ব্যবস্থার ওপর নজরদারি চালাতে পারে। স্বচ্ছতা বজায় রেখে কাজ করতে তাঁদের আপত্তি নেই।

সব মিলিয়ে, রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার লক্ষ্যেই এই বৃহৎ সমীক্ষা ও নজরদারি কর্মসূচি শুরু হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রের দাবি। তবে এই পদক্ষেপ আগামী দিনে রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে।

 

POST A COMMENT
Advertisement