খামখেয়ালি বর্ষার নেপথ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের কোন ঘূর্ণাবর্ত?ঠিক সময়েই দেশজুড়ে বর্ষার প্রবেশ ঘটেছে। কিন্তু ভরা আষাঢ়-শ্রাবণের মাঝেই হঠাত্ থমকে গেল বর্ষার চেনা ছন্দ। এ যেন এক অস্বাভাবিক এক নীরবতা। দেশের বিস্তীর্ণ অংশজুড়েই এখন মেঘের দেখা নেই। শনিবাসরীয় বিকেলে উপগ্রহ চিত্র(Satellite Images) অন্তত তাই বলছে। হিসেব বলছে, এই মুহূর্তে ভারতের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ আকাশে বর্ষার মেঘের লেশমাত্র নেই। কোথাও আকাশ একেবারে মেঘহীন। আবার কোথাও নামমাত্র মেঘ থাকলেও বৃষ্টির দেখা নেই। এই সময় যা একেবারেই হওয়ার কথা নয়।
গত ৯ জুলাইই কিন্তু ছবিটা অন্যরকম ছিল। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু সারা দেশকে আর্দ্র বাতাসের চাদরে ঢেকে ফেলেছিল। তার ঠিক দু’দিনের মাথায় কেন এমন তীব্র বৃষ্টির ঘাটতি তৈরি হল? ক'দিন আগেই যে সমস্ত মেট্রো শহরে ভারী বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট জলমগ্ন হয়ে পড়েছিল, সেখানেই এখন আচমকা ‘ড্রাই স্পেল’। আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, ভারতের এই মেঘহীন আকাশের রহস্য লুকিয়ে রয়েছে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে।
মহাসাগরের দানবেই কাড়ল মৌসুমি বায়ুর ‘অক্সিজেন’?
খুব সহজভাবে বিষয়টি বোঝা যাক। ভারতে বর্ষার বৃষ্টির পিছনে মূলত ২টি অনুঘটক কাজ করে। এক, ভারত মহাসাগর থেকে ধেয়ে আসা জলীয় বাষ্পপূর্ণ বাতাস। দুই, দেশের স্থলভাগের ওপর থাকা নিম্নচাপ বলয় বা ‘মনসুন ট্রাফ’ (Monsoon Trough)। এই দুইয়ের যুগলবন্দিতেই দেশজুড়ে টানা বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু এই মুহূর্তে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে তৈরি হওয়া একটি অতি শক্তিশালী ক্রান্তীয় সাইক্লোন বা সুপার টাইফুন (Super Typhoon Bavi) ভারতের বর্ষার সমস্ত শক্তি শুষে নিচ্ছে।
উপগ্রহ চিত্রে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, প্রশান্ত মহাসাগরের ওই দানবীয় ঘূর্ণাবর্তটি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সমস্ত আর্দ্রতা ও বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালনকে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে। ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের ওপর থাকা মনসুন ট্রাফ বা মৌসুমি অক্ষরেখাটি চরম দুর্বল হয়ে পড়েছে। আর এই কারণেই ভারতের আকাশে মেঘ তৈরির উপকরণ বা জলীয় বাষ্পের আকাল দেখা দিয়েছে। মধ্য ভারত ও দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলিতে আগামী বেশ কিছুদিন বৃষ্টির দাপট অনেকটাই কম থাকবে। এমনটাই বলছে মৌসম ভবন (IMD)। বায়ুমণ্ডলের এই প্রতিকূল পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দেশজুড়ে ব্যাপক বৃষ্টির সম্ভাবনা কম।
একে এল নিনোয় রক্ষা নেই, টাইফুন দোসর!
মৌসম ভবনের আশঙ্কা, জুলাই মাসের বাকি দিনগুলিতেও গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদি স্বাভাবিকের (LPA) চেয়ে কমই থাকবে। এই মাসে স্বাভাবিকের ৯৪ শতাংশের কম বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে তৈরি হতে থাকা ‘এল নিনো’ (El Nino)-র ওপরও নজর রাখছেন আবহবিদরা। সমুদ্রপৃষ্ঠের এই উষ্ণায়ন বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার খোলনলচে বদলে দেয়। আর এর জেরেই মরসুমের শেষের দিকে ভারতীয় মৌসুমি বায়ু আরও দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
তাত্ক্ষণিকভাবে বৃষ্টির এই ঘাটতির কারণে দেশের বহু অংশে দিনের বেলার তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ কয়েক ডিগ্রি চড়ে যেতে পারে। তবে আবহবিদদের আশ্বাস, ভারতের বর্ষা এখনই চিরতরে উধাও হয়ে যায়নি। এটি সাময়িকভাবে একটি দুর্বল পর্ব (Weak Phase) মাত্র। প্রশান্ত মহাসাগরের ওই ঝড়টি দুর্বল হলেই পরিস্থিতি অনেকটাই ঠিক হয়ে যাবে। সেটা কবে হবে, তার উপরেই নির্ভর করছে সবকিছু।