
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুভারত যখন ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের তোড়জোড় করছে, পশ্চিমবঙ্গে তিরঙ্গা যাত্রা করছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, বাংলাজুড়ে 'হর ঘর তিরঙ্গা' পালনের আহ্বান দিচ্ছেন, তখনই বাঙালি তথা ভারতের আইকন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে উত্তপ্ত রাজনীতি। যাবতীয় বিতর্কের সূত্রপাত কোচবিহারের স্বঘোষিত মহারাজ নগেন রায়ের মন্তব্য একের পর এক বিতর্কিত মন্তব্য ঘিরে। নগেন রায় আবার বিজেপি-র রাজ্যসভার সাংসদ। গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের নেতা। অনন্ত মহারাজ নামেই বেশি পরিচিত। ওদিকে অনন্ত মহারাজ যখন নেতাজিকে নিয়ে একের পর এক মন্তব্যে অস্বস্তিতে ফেলছে বিজেপি-কে, তখনই আবার বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যর মন্তব্য ঘিরেও চর্চা তুঙ্গে। নেতাজি নিয়ে একের পর এক এই ধরনের মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ চলছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ইতিমধ্যেই প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও।
ঠিক কী মন্তব্য করেছেন অনন্ত মহারাজ?
পৃথক রাজ্য গ্রেটার কোচবিহারপন্থী অনন্ত মহারাজ প্রথমবার নেতাজিকে নিয়ে কুকথা শুরু করেন। তারপর দেখা যায়, সোশ্যাল মিডিয়াতেও সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে নানা কুরুচিকর পোস্ট করা হচ্ছে। অনন্ত মহারাজ বলেন, 'কোচবিহারের মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ ভারত তথা সারা পৃথিবীকে স্বাধীন করে দিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁকে সম্রাট বানানো হলে হিন্দুস্তান-পাকিস্তান হতো না। আমাদের মহারাজাকে প্যালেসে থাকতে দেওয়া হয়নি। বিদ্যুৎ, জল কেটে দিয়েছিল। গান্ধী-নেহরুর আন্দোলনে দেশ স্বাধীন হয়েছিল কিন্তু বাকি রাষ্ট্রগুলি কীকরে স্বাধীন হল? সেখানে কোন গান্ধী ছিলেন? কোন নেহরু ছিলেন? আমাদের মহারাজা হিটলার এবং আজাদ হিন্দ ফৌজকে ধ্বংস করেছেন। নেতাজির বাপের শক্তি আছে নাকি আজাদ হিন্দ ফৌজ বানায়। ওগুলো সব ব্রিটিশ সৈন্য। জার্মান ওদের বন্দি বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, তারপর তাদেরকেই নেতাজিকে দিয়েছিল। আর নেতাজি সেটার অপব্যবহার করেছে। আমাদের পূর্বপুরুষ কোনও আজাদ হিন্দকে সাজা দেননি। সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে আমায় এনকাউন্টার করে দেবে। আর তখন তো ব্রিটিশ আমাদের শাসন করছিল, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে বন্দুক ধরবে কেন আজাদ হিন্দ ফৌজ? তাদের মৃত্যুদণ্ড কেন দেওয়া হল না?'

অনন্ত মহারাজের আরও বক্তব্য, 'শুধু মহাত্মা গান্ধি, জওহরলাল নেহরু বা কংগ্রেসের আন্দোলনের ফলেই ভারত স্বাধীন হয়েছে, এই ধারণা সঠিক নয় । কোচবিহারের মহারাজার ভূমিকাও ইতিহাসে যথাযথ গুরুত্ব পায়নি । কোচবিহারের মহারাজা যুদ্ধ করে হিটলার এবং আজাদ হিন্দ ফৌজকে পরাজিত করেছিলেন।' এখানেই না থেমে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সম্পর্কে তিনি আরও দাবি করেন, জার্মানির হাতে বন্দি হওয়া ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাদের নেতাজির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল এবং সেই সেনাদের নিয়েই আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠিত হয়। তাঁর বক্তব্য, 'নেতাজি সেই সুযোগের অপব্যবহার করেছিলেন।' একই সঙ্গে তিনি ব্রিটিশ শাসনের আইনশৃঙ্খলার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, 'আজ যদি আমি সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিই, তা হলে আমাকে এনকাউন্টার করা হবে। ব্রিটিশ আমলেও আইন ছিল। কোচবিহারের মহারাজাকে যদি স্বাধীন ভারতের সম্রাট করা হত, তবে দেশভাগ হত না। ভারত ও পাকিস্তান এক থাকত।'
শমীকের মন্তব্যেও বিতর্ক
গত মাসে নেতাজি সুভাষচন্দ্রের গড়া ফরওয়ার্ড ব্লক নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন বিজেপি-র রাজ্যসভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। শমীক ভট্টাচার্য দাবি করেন, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ওপর হামলার পেছনে ফরওয়ার্ড ব্লকের কর্মীরা যুক্ত ছিলেন এবং তিনি তাদের 'গুন্ডাবাহিনী' বলে সম্বোধন করেন। তিনি আরও বলেন, সুভাষচন্দ্র বসু ও শরৎচন্দ্র বসু সেই সময় হিন্দুদের উপর নির্যাতন নিয়ে শ্যামাপ্রসাদের আবেদন সেভাবে শোনেননি।

নেতাজি ইস্যুতে অস্বস্তিতে বিজেপি
বস্তুত, বিজেপির তরফে নেতাজিকে অপমান বিতর্কে আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। শমীক ভট্টাচার্য এই প্রসঙ্গে একটি বাংলা সংবাদপত্রকে শুধু বলেছেন, 'দল কড়া নজর রাখছে।' বিজেপি নেতা তথা ত্রিপুরার প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত রায়ও এক্স হ্যান্ডেলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি লেখেন, 'এই স্বঘোষিত ‘মহারাজ’এর কথা আমি আগে কখনও শুনিনি। বাঙালি ও রাজবংশীদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতেই তাঁকে রাজনীতিতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে কুরুচিকর মন্তব্যও সেই পরিকল্পনারই অংশ। আশা করি, বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব গোটা পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত এবং তাঁকে রাজ্যসভার সদস্য করার সময় তাদের হাতে এর মোকাবিলার কোনও কৌশল রয়েছে।'
This self-styled ‘Maharaj’, of whom I had never heard, has been pushed into politics to drive a wedge between Bengalis and Rajbangshis. Badmouthing of Netaji Subhas is part of this scheme. I hope BJP central leadership is seized of the situation and has some trick up its sleeve… https://t.co/8EnKSQkuKH
— Tathagata Roy (@tathagata2) August 11, 2026
উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক বলেন, 'অনন্ত মহারাজ কেন এই মন্তব্য করেছেন, তা আমার জানা নেই । আমি ব্যক্তিগতভাবে এই বক্তব্য সমর্থন করি না । নেতাজি দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বাধীনতা সংগ্রামী।'
নেতাজিকে নিয়ে কুকথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নামলেন মমতা
নেতাজিকে নিয়ে যখন একেবর পর এক কুকথা ও বিতর্কিত মন্তব্য চলছে, এই সব ঘটনার রাজনৈতিক বিরোধিতায় প্রতিবাদে নামলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ও। মঙ্গলবার শ্যামবাজারে নেতাজির মূর্তিতে মাল্যদান করেন মমতা। তিনি বলেন, 'আমরা ধিক্কার জানাই যারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুভাষ চন্দ্র বসু, স্বামী বিবেকানন্দকে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে অপমান করে চলেছেন। তাই তাঁদের এই অসম্মানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর গলায় মালা দিতে এখানে এসেছি। আজ ১১ অগস্ট, শহিদ ক্ষুদিরাম বসুর জন্মদিন। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুকে আমরা দেশনায়ক বলি। আর বিজেপির লোকজন সুভাষ চন্দ্র বসুর নামে গালিগালাজ করছে, অসম্মান করছে। আমরা ধিক্কার জানাই। এই কারণেই সুভাষ চন্দ্র বসুর মূর্তিকে আমরা প্রণাম করতে এসেছি। জয় হিন্দ স্লোগানও আমরা দিয়েছি। আমাদের যত মণীষী রয়েছেন তাঁদের জন্য আমরা লড়াই করব। তাঁরাই আমাদের দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন।'
VIDEO | Former West Bengal CM Mamata Banerjee stages a protest at Shyambazar in Kolkata over the alleged insult to freedom fighter Netaji Subhas Chandra Bose. pic.twitter.com/yOZCgITJD9
— Press Trust of India (@PTI_News) August 11, 2026
নেতাজি বিতর্কে 'বাংলাপক্ষ' সংগঠনের নেতা গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, 'বাংলায় যেভাবে প্রতিদিন দুই সাংসদ ও তাঁদের অনুগামীরা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে অপমান করছেন, সেই একইভাবে যদি মহারাষ্ট্রে ছত্রপতি শিবাজিকে অপমান করা হত, তাহলে মারাঠি জনগণ প্রতিক্রিয়া জানানোর আগেই মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী নিজে পুলিশে অভিযোগ দায়ের করতেন এবং অভিযুক্তদের এক ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেফতার করা হত।'