দেশজুড়ে যখন জাতীয় পতাকা নিয়ে উদ্যাপনের প্রস্তুতি, তার ঠিক এক দিন আগে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ভয়াবহ স্মৃতি। Partition Horrors Remembrance Day: ১৫ অগাস্ট স্বাধীনতা দিবস। দেশজুড়ে যখন জাতীয় পতাকা নিয়ে উদ্যাপনের প্রস্তুতি, তার ঠিক এক দিন আগে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ভয়াবহ স্মৃতি। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল আর এন রবি রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে ১৪ অগাস্ট ‘Partition Horrors Remembrance Day’ বা ‘দেশ বিভাজন দিবস’ পালনের পরামর্শ দিয়েছেন। নতুন প্রজন্মের সামনে দেশভাগের ইতিহাস এবং সেই সময়ের মানুষের যন্ত্রণা তুলে ধরতেই এই উদ্যোগ বলে জানানো হয়েছে।
রাজভবন সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির আচার্য হিসাবে রাজ্যপালের তরফে এই বিষয়ে বার্তা দেওয়া হয়েছে। দেশভাগের ইতিহাস সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মকে জানানো এবং সেই সময়ের ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার উপরেই জোর দেওয়া হয়েছে।
১৪ অগাস্ট কেন গুরুত্বপূর্ণ?
১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট ভারত স্বাধীন হয়। কিন্তু তার আগেই দেশভাগের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছিল। ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান; দুই আলাদা রাষ্ট্র তৈরি হয়। সেই বিভাজনের ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হয়েছিল।
দেশভাগের সময় হিংসা, দাঙ্গা, প্রাণহানি এবং ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলির একটি আসে বাংলা ও পঞ্জাবের মতো সীমান্তবর্তী অঞ্চলে। বহু পরিবার রাতারাতি ঘরছাড়া হয়। কেউ পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসেন, আবার কেউ পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে পূর্ববঙ্গে চলে যেতে বাধ্য হন।
এই ইতিহাস শুধু পুরনো দিনের ঘটনা নয়। দেশভাগের প্রভাব বহু পরিবারের জীবনে কয়েক প্রজন্ম ধরে থেকে গিয়েছে। তাই স্বাধীনতার আনন্দের পাশাপাশি দেশভাগের যন্ত্রণাকেও মনে রাখা প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে কী হবে?
রাজ্যপালের পরামর্শ অনুযায়ী, ১৪ অগাস্ট রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে দেশভাগের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা, স্মরণসভা, সেমিনার বা অন্যান্য সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে।
মূল লক্ষ্য, নতুন প্রজন্মের পড়ুয়াদের দেশভাগের সময়ের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে জানানো। কী ভাবে মানুষ ঘরছাড়া হয়েছিলেন, কী ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন হয়েছিল এবং সাধারণ মানুষের জীবনে তার কতটা প্রভাব পড়েছিল; সেই বিষয়গুলি আলোচনায় আসতে পারে।
রাজ্যপালের বার্তায় দেশভাগের পিছনে থাকা পরিস্থিতি এবং বিভাজনের রাজনীতি সম্পর্কেও সচেতন হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে সমাজে যাতে বিভাজন ও হিংসা জায়গা না পায়, ইতিহাস থেকে সেই শিক্ষা নেওয়ার উপরেই জোর দেওয়া হয়েছে।
বাংলার উপর দেশভাগের প্রভাব
১৯৪৭ সালের দেশভাগের অন্যতম বড় অভিঘাত নেমে এসেছিল বাংলার উপর। বাংলা দুই ভাগে বিভক্ত হয়। এক দিকে তৈরি হয় পশ্চিমবঙ্গ, অন্য দিকে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয়ে যায়।
এর ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। বহু পরিবারকে সীমান্ত পেরিয়ে নতুন জায়গায় আশ্রয় নিতে হয়।
দেশভাগের প্রভাব শুধু মানুষের বসতবাড়িতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং পারিবারিক কাঠামোর উপরেও তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে।
অনেক পরিবারের কাছে ১৪ অগাস্ট তাই শুধুমাত্র ইতিহাসের একটি তারিখ নয়। এই দিনটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ঘর হারানোর স্মৃতি, প্রিয়জনকে হারানোর কষ্ট এবং নতুন জায়গায় শূন্য থেকে জীবন শুরু করার অভিজ্ঞতা।
স্বাধীনতা দিবসের আগে অন্য কর্মসূচিতেও জোর
এ দিকে ২০২৬ সালের স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গেও দেশাত্মবোধক কর্মসূচির আয়োজন করা হচ্ছে। ‘হর ঘর তেরঙ্গা’ কর্মসূচির অংশ হিসাবে রাজ্যে বিপুল সংখ্যক জাতীয় পতাকা বিলির পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় পতাকা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি তেরঙ্গা যাত্রারও আয়োজন করা হচ্ছে।
১০ অগাস্ট কলকাতায় একটি বড় তেরঙ্গা মিছিলের পরিকল্পনার কথাও প্রকাশ্যে এসেছে। এই কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন স্তরের মানুষের অংশগ্রহণের কথা রয়েছে।
অর্থাৎ, এক দিকে ১৫ অগাস্ট স্বাধীনতার উদ্যাপন, অন্য দিকে তার আগেই দেশভাগের স্মৃতি মনে করার উদ্যোগ; দুই দিকেই এ বার বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।