
কলকাতা সহ পশ্চিমবঙ্গের বড় রেস্তোরাঁয় পচা মাংস, মিষ্টির দোকানে হোলির রং উদ্ধার২০১৮ সালের সেই ঘটনা মনে আছে? ভাগাড়ের পচা মাংস ছেয়ে গিয়েছিল কলকাতা সহ জেলায় জেলায় রেস্তোরাঁ, হোটেলে। ২০২৬ সালে ঠিক পুজোর মুখে সেই স্মৃতি ফিরল পশ্চিমবঙ্গে। কলকাতার নামী রেস্তোরাঁগুলিতে ফ্রিজে ঠাসা পুরনো, পচা মাংস, মাছের খোঁজ মিলল। শুধু কলকাতাতেই নয় জেলাগুলিতেও একই ছবি ধরা পড়ল। এমনকী মিষ্টিতে হোলির রং মেশানোরও অভিযোগ উঠল হুগলি জেলার মিষ্টির দোকানে। সব মিলিয়ে জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে মারাত্মক প্রতারণার একটি বিরাট চক্রের ইঙ্গিত জোরাল হচ্ছে রাজ্যে।
২০২৮ সালে রাজ্যে শোরগোল ফেলে দিয়েছিল ভাগাড়ের মাংস। অর্থাত্ ভাগাড়ে পড়ে থাকা মৃত পশুর মাংস কলকাতা ও নানা জেলায় রেস্তোরাঁ, রাস্তার ধারের খাবারের দোকান, ক্যাফেগুলিতে সাপ্লাইয়ের অভিযোগ উঠেছিল। পচা মাংস রাখতে ব্যবহার করা হত অ্যালুমিনিয়াম সালফেট, লেড সালফেট, ফরম্যালিনের মতো রাসায়নিক। এরপর ওই ভাগাড়ের মাংস একটি বাক্সে ভরে তার উপর ইলিশ বা চিংড়ি মাছ রেখে পাচার করা হত একাধিক প্রতিবেশী রাজ্যেও। সে বার ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল বসিরহাটের বাদুড়িয়ায়। সেখানেই মিলেছিল ভাগাড়ের মাংসের কারবারের রমরমা।
কাট টু ২০২৬। এবারও পচা মাংসের হদিশ মিলল সেই বাদুড়িয়ায়। খাদ্য দফতর, পুরসভা এবং এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চের যৌথ অভিযানে বাদুড়িয়ার একটি হোটেলে উদ্ধার হল কেজি কেজি পচা মাংস, মাছ। বিপুল পরিমাণে পাঠার মাংস পচে গিয়েছে, সেই মাংসই রান্নাঘরে ফ্রিজে ঠাসা। সেই মাংসই রেঁধে খাওয়ানো হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। প্রায় ৪০ কেজি পচা মাংস উদ্ধার হয়েছে বাদুড়িয়ার নামী রেস্তোরাঁয়। চিকেন ও খাসির মাংস মিলিয়ে। ওই রেস্তোরাঁকে শোকজ নোটিস ধরানো হয়েছে।
শুধু বাদুড়িয়াতেই নয়, কলকাতা, সল্টলেক, মধ্যমগ্রাম, পূর্ব মেদিনীপুর, পূর্ব বর্ধমানে একাধিক নামী রেস্তোরাঁয় মিলেছে কেজি কেজি পচা মাংস। দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে। কোনও মাংসে ছত্রাক পড়ে গিয়েছে। কোথাও আবার পুরনো চিংড়ি মাছ ফ্রিজে ঠাসা, গা গুলিয়ে ওঠা গন্ধ বেরোচ্ছে।
কলকাতায় ট্যাংরায় নামী চাইনিজ রেস্তোরাঁয় পচা মাংস, চিংড়ি মাছ
চাইনিজ খাবার খেতে বহু মানুষই ট্যাংরায় চায়না টাউনে যান। কিন্তু সেখানেও কেজি কেজি পচা মাংস,চিংড়ি মাছের হদিশ মিলল। ট্যাংরার নামী রেস্তোরাঁ 'বিগ বস'-এ অভিযান চালায় কলকাতা পুরসভার স্বাস্থ্য দফতর। আর এখান থেকে মিলেছে প্রায় ৫০০ কেজি মাছ-মাংস। কোনও প্যাকেটেই তারিখ উল্লেখ ছিল না। সেগুলো বাজেয়াপ্ত করে কলকাতা পুরসভা। পরে ধাপায় নিয়ে গিয়ে নষ্ট করে ফেলা হয়। বিগ বস নামে ওই রেস্তোরাঁর মালিকের দাবি, বেশিদিনের মাংস নয়। তাদের রেস্তোরাঁয় রোজ ৮০ কেজি মাংস লাগে। তিন দিনের মতো মাল ছিল।

মধ্যমগ্রামের স্টার মলে নামী রেস্তোরাঁয় ফ্রিজে ঠাসা পচা মাংস
খাদ্য দফতর, পুরসভা এবং এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চের যৌথ অভিযানে উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামে স্টার মলে একটি নামী রেস্তোরাঁয় অতর্কিতে হানা দেয়। যশোর রোডের ধারে ওই শপিং মলের ফুডকোর্টে একটি নামী খাবারের দোকানে ফ্রিজ ও রান্নাঘরে ঢুকতেই গা গুলিয়ে ওঠে খাদ্য দফতরের অফিসারদের। ফুড কোর্ট মালিকের ব্যবসা সংক্রান্ত লাইসেন্স অকুস্থলে দাঁড়িয়েই বাতিল করে দেন তাঁরা। ছাতা ধরা পচা মাংস, মেয়াদ উত্তীর্ণ খাবারের প্যাকেট এবং পানীয় জলের বোতল দেখে অবাক ফুড সেফটি অফিসাররা। অভিযোগ, অফিসারদের দেখা মাত্রই ওই সব পচা খাবার ডাস্টবিনে ফেলে দেন রেস্তরাঁর কর্মীরা।
সল্টলেকে সেক্টর ফাইভেও পচা মাংস
সল্টলেকে তথ্যপ্রযুক্তি হাব সেক্টর ফাইভেও পচা মাংসের কারবার চলছে। তারও প্রমাণ মিলল খাদ্য দফতরের অভিযানে। সেক্টর ফাইভে আরডিবি বিল্ডিংয়ের পাশেই একটি রেস্তোরাঁয় ঢুকে দেখা যায় সেখানে স্টোর রুমে কাঁচা পচা মাংস ভর্তি, তীব্র দুর্গন্ধ। কৈফিয়ৎ চাইলে কোন উত্তর দিতে না পারায় ডিএম জানান ওই ব্যবসায়ীর দোকানের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। আপাতত ওই মাংস নমুনা সংগ্রহ করে টেস্ট এর জন্য পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট আসার পরেই উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সূত্রের খবর।

পূর্ব মেদিনীপুরের দিঘায় বিষাক্ত বিরিয়ানি
পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন মানচিত্রে অন্যতম হল সৈকত শহর দিঘা। হাজার হাজার পর্যটক যান প্রায় সারা বছরই। দিঘায় ২০টি হোটেল ও রেস্তোরাঁয় অভিযান চালিয়ে বিষাক্ত বিরিয়ানির খোঁজ মিলল। অভিযোগ, দেখা গিয়েছে এই সব হোটেল, রেস্তোরাঁয় যে বিরিয়ানি বিক্রি করা হচ্ছে তা অতি নিম্নমানের। বিরিয়ানিতে ফুড কালারের পরিবর্তে কেমিক্যাল যুক্ত বিষাক্ত রং ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক দিন আগে রান্না করা মাংস গরম করে বিক্রি করা হচ্ছে। নন্দীগ্রাম স্বাস্থ্য জেলা খাদ্য সুরক্ষা দফতরের আধিকারিক বিশ্বজিৎ মান্না বলেন, 'দিঘার ২০টি হোটেল-রেস্তোরাঁয় অভিযান চালিয়ে ১৫টি থেকে খাবারের নমুনা সংগ্রহ করে মান যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষায় পাঠানো হয়েছে। ১২টি হোটেলকে আইনি নোটিস ধরানো হয়েছে।'
হুগলিতে মিষ্টিতে হোলিং রং, বেকারির বিস্কুটে পোকা ধরা ময়দা
বাঙালির অতিপ্রিয় মিষ্টিতেও মিলল বিষ। অভিযোগ, হুগলি জেলার আরামবাগে বেশ কয়েকটি দোকানে মিষ্টির রঙে মিলেছে হোলি খেলার রং। যদিও দোকানদারের দাবি, দোলের সময় খেলা হয়েছিল। কর্মীরা সেই রং রান্নাঘরে রেখে দিয়েছিলেন। তা মিষ্টিতে ব্যবহার করা হয় না। হুগলির ভদ্রেশ্বরে বেকারিতে কেক, বিস্কুট, পাঁউরুটিতেও বিষ মিলল। আরামবাগের খাদ্য সুরক্ষা আধিকারিক যদুনাথ হেমব্রম বলেন, 'মিষ্টিতে রং মেশানো হচ্ছে। আর সেই রং হল, হোলির রং। এই রং দিয়ে হোলি খেলা হয়। দোকানের তরফ থেকে দাবি করা হচ্ছে, হোলির সময় থেকে রঙের কৌটোটা কোনও ভাবে ওখানে রয়ে গিয়েছে। কিন্তু যেখানে মিষ্টি তৈরি হয়, সেই জায়গা থেকেই এই রং উদ্ধার করা হয়েছে। তাকে সাজানো ছিল। অন্যান্য রঙের সঙ্গেই এই হোলির রংটা রাখা ছিল।'

বর্ধমানে পচা, বাসি দুর্গন্ধযুক্ত মাংস, পনির
বর্ধমান শহরে একাধিক মিষ্টির দোকানে মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পনির মিলেছে। বর্ধমানের ওই মিষ্টির দোকানগুলির পনির নষ্ট করে দিয়েছেন খাদ্য দফতরের অফিসাররা। শুধু মেয়াদ উত্তীর্ণ পনির নয়, পাশাপাশি মেয়াদ উত্তীর্ণ আইসক্রিম ও কোল্ড ড্রিঙ্কসও বাজেয়াপ্ত করা হয়। বর্ধমানে শক্তিগড়ের ল্যাংচা হাবেও অভিযান চালানো হয়েছে। খাবারের গুণগত মান পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।