পালাবদলের এপিসেন্টার, ২০০৬ থেকে ২০২৬- কেন বাংলার ভোটের আগে ফের প্রাসঙ্গিক সিঙ্গুর?

২০০৬ থেকে ২০২৬, কেটে গিয়েছে প্রায় দুই দশক। তবে সিঙ্গুর কিন্তু রয়েছে সেই সিঙ্গুরেই। এরমধ্যে আন্দোলন, রক্ত, ক্ষমতার বদল সবকিছু খতিয়ে দেখেছে সিঙ্গুরবাসী। ২০০৬ সালের জমি আন্দোলনের যুবকেরা এক অনেকেই প্রৌঢ়তার দোরগোড়ায়। কিন্তু দীর্ঘ ২০ বছর পরেও ভোটের আগে ফের একবার বাংলার রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে সিঙ্গুর।

Advertisement
পালাবদলের এপিসেন্টার, ২০০৬ থেকে ২০২৬- কেন বাংলার ভোটের আগে ফের প্রাসঙ্গিক সিঙ্গুর?২০০৬ থেকে ২০২৬- কেন বাংলার ভোটের আগে ফের প্রাসঙ্গিক সিঙ্গুর?
হাইলাইটস
  • ২০০৬ থেকে ২০২৬, কেটে গিয়েছে প্রায় দুই দশক।
  • ২০ বছর পরেও ভোটের আগে ফের একবার বাংলার রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে সিঙ্গুর।
  • ২০০৬ সালে সিঙ্গুরে ঠিক কী ঘটেছিল? ইতিহাস ফিরে দেখল bangala.aajtak.in

২০০৬ থেকে ২০২৬, কেটে গিয়েছে প্রায় দুই দশক। তবে সিঙ্গুর কিন্তু রয়েছে সেই সিঙ্গুরেই। এরমধ্যে আন্দোলন, রক্ত, ক্ষমতার বদল সবকিছু খতিয়ে দেখেছে সিঙ্গুরবাসী। ২০০৬ সালের জমি আন্দোলনের যুবকেরা এক অনেকেই প্রৌঢ়তার দোরগোড়ায়। কিন্তু দীর্ঘ ২০ বছর পরেও ভোটের আগে ফের একবার বাংলার রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে সিঙ্গুর। কিন্তু কেন? আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও কেন সিঙ্গুরকে মনে রেখেছে বাংলার মানুষ। ২০০৬ সালে সিঙ্গুরে ঠিক কী ঘটেছিল? ইতিহাস ফিরে দেখল bangala.aajtak.in

২০০৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনের পরেই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ঘোষণা করেছিলেন রাজ্যে টাটা গোষ্ঠীর বিনিয়োগের কথা। মহাকরণে বুদ্ধদেবের সঙ্গে এসে সাক্ষাৎ করেছিলেন টাটা গ্রুপের কর্ণধার রতন টাটা। এরপর ২০০৬ সালের ১৮ মে সিঙ্গুরে ছোট গাড়ি তৈরির প্রকল্প ঘোষণা করেছিলেন রতন টাটা। শুরু হয়েছিল জমি অধিগ্রহণ। কিন্তু অনেক চাষিই নিজেদের জমি দিতে অস্বীকার করেন। আর এই বিষয়টিকে হাতিয়ার করেই আন্দোলনে নামে তৎকালীন বিরোধী দল তৃণমূল।

২৫ মে থেকে ৯৯৭ একর কৃষিজমি অধিগ্রহণের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়। গোপালনগর, বেড়াবেড়ি, বাজেমেলিয়া, খাসেরভেড়ি, সিংহেরভেড়ি-সহ বেশ কয়েকটি জায়গায় আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি  ২৫ সেপ্টেম্বর বিক্ষোভকারীদের উপর পুলিশি হামলার অভিযোগ ওঠে। আহত হন বেশ কয়েক জন গ্রামবাসীও। 

এরসঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। ২০০৬-এর ৩০ নভেম্বর সিঙ্গুরে গিয়ে আক্রান্ত হন তৎকালীন বিরোধীনেত্রী। সেই ঘটনার রেশ এসে পড়ে বিধানসভায়। তৃণমূল বিধায়কদের একাংশের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তাঁরা বিধানসভার আসবাব ভাঙচুর করেছিলেন। এরপরেই অনশনে বসেন তৃণমূল নেত্রী মমতা। ২৮ ডিসেম্বর ২৫ দিন পর অনশন ভাঙেন তিনি। সেই অনশন মঞ্চ থেকে একেবারে লাইমলাইটে চলে আসেন মমতা। আর 'ভিলেন' হয়ে যায় সিপিএম। মমতার অনশন মঞ্চে এসেছিলেন বিভিন্ন দলের নেতা। সমর্থন এসেছিল তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের তরফেও। অনশন মঞ্চে চিঠি পাঠিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহও। সকলের অনুরোধে ২৮ ডিসেম্বর অনশন প্রত্যাহার করেছিলেন তৃণমূল নেত্রী।

Advertisement

এরইমধ্যে আবার বিতর্ক মাথাচারা দেয় সিঙ্গুরের  তাপসী মালিকের মৃত্যু ঘিরে। তাঁর খুনের ঘটনায় সিপিএমকেই দায়ী করে তৃণমূল। এমনকি একই অভিযোগ করে কিশোরীর পরিবারও!

এরপর ৯ মার্চ, ২০০৭ সালে জমি হাতে পায় টাটারা। কিন্তু ফের দানা বাঁধে নতুন বিতর্ক। জমিহারা কৃষকের আত্মহত্যা ঘিরে অশান্ত হয়ে ওঠে সিঙ্গুর। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করে মে মাসে সিঙ্গুরে টাটাদের ন্যানো প্রকল্প রূপায়ণের পথ সুগম করতে তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকার। কিন্তু তাও সফল হয়নি।

টালবাহানা ও আন্দোলন চলতে চলতেই ১০ জানুয়ারি, ২০০৮ সালে নয়াদিল্লির ‘অটো শো’তে ন্যানো গাড়ি প্রকাশ্যে আনে টাটারা। এই গাড়ির কারখানাই সিঙ্গুরে গড়ার কথা ছিল। ১৮ জানুয়ারি জমি অধিগ্রহণ নিয়ে রাজ্যের পক্ষে রায় দেয় কলকাতা হাই কোর্ট। তবে রাজ্য সরকারের এই স্বস্তি ছিল সাময়িক। কারণ, ২১ মে রাজ্যের পঞ্চায়েতে ভোটে সিঙ্গুর-সহ বিভিন্ন এলাকায় জয়ী হয় তৃণমূল। আন্দোলন আরও মাথাচারা দিয়ে ওঠে।

২৭ জুন সিঙ্গুরে ন্যানো কারখানার গেট ভেঙে ফেলেন আন্দোলনকারীরা। মমতা বন্দ্যেপাধ্যায় দাবি করেন, অনিচ্ছুক কৃষকদের জমি ফেরাতেই হবে। অগস্টে নতুন করে শুরু হয় জমিরক্ষা আন্দোলন। ২৪ অগস্ট থেকে টানা ১৫ দিন দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের ধারে অবস্থান করেন মমতা। এমন মারাত্মক আন্দোলন দেখে টাটারাও আশঙ্কিত হয়ে ওঠে। ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৮-এ সিঙ্গুরে কারখানা তৈরির কাজ থামিয়ে দেয় টাটারা। তার একমাসের মধ্যেই ন্যানো প্রকল্প অন্যত্র নিয়ে যায় টাটা গোষ্ঠী।

এরপর ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসে মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। শাসকের আসনে বসেই সিঙ্গুরের কৃষকদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য অর্ডিন্যান্স জারির ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৩ জুন, ২০১১ সালে বিধানসভায় ‘সিঙ্গুর বিল’ পাশ হয়। ২১ জুন সেই 'বিতর্কিত' জমির দখল নেয় রাজ্য সরকার।

তবে সিঙ্গুর পর্ব এখানেই শেষ হয় না। কারণ ‘সিঙ্গুর আইন’কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ২২ জুনই  কলকাতা হাইকোর্টে যায় টাটা মোটরস। সরকারি নির্দেশে স্থগিতাদেশ দেয় তাঁরা। যদিও তাঁদের আবেদন ধোপে টেকেনি। ২৭ জুন কলকাতা হাইকোর্ট টাটাদের আর্জি খারিজ করল। অর্ডিন্যান্সে স্থগিতাদেশ চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল টাটা মোটর্স কর্তৃপক্ষ। ২৮ জুন তড়িঘড়ি জমির কাগজ-পত্র হস্তান্তর করে রাজ্য সরকার। কিন্তু পরের দিন ২৯ জুনই রাজ্য সরকারকে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয় সিঙ্গুরের কৃষকদের জমি ফেরত না দেওয়ার জন্য। যদিও এরপর ২৮ সেপ্টেম্বর ফের সুপ্রিম নির্দেশে মামলা ফেরে কলকাতা হাইকোর্টে। রাজ্যের পক্ষেই সায় দেয় কলকাতা হাইকোর্ট। অবশেষে ২০১৬ সালের ৩১ অগস্ট সুপ্রিম কোর্ট ঐতিহাসিক রায় দিয়ে বলে ২০০৬ সালে সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণ অবৈধ ছিল।

সিঙ্গুর পর্বে সিঙ্গুরবাসী ও মমতার জয় হলেও সিঙ্গুরের জন্য তা কতটা ভালো হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন থাকেই। কারণ, সেই বিতর্কিত জমি ফেরত পেলেও তা কার্যত বন্ধ্যা জমিতে পরিণত হয়েছে। আজ ২০২৬- সালেও সেই জমিতে চাষ হয় না। বরং একদা রাজনীতির আঁতুড়ঘর সিঙ্গুর যেন ইতিহাসই ঘেঁটে চলে। আর বিধানসভা নির্বাচনের আগে বারেবারে তাজা হয়ে ওঠে সেই পুরনো ক্ষত। যেমনটা হচ্ছে ২০২৬ সালেও।

 

POST A COMMENT
Advertisement