
মিছিল, সভা, পোস্টার, দেওয়াল লিখন পেরিয়ে প্রচার বাড়ছে অনলাইনেও। West Bengal elections 2026: ভোটের এখনও মাসখানেক বাকি। তবে লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছে। যুগের চাহিদা মেনে সেই লড়াইও এখন ডিজিটাল। মিছিল, সভা, পোস্টার, দেওয়াল লিখন পেরিয়ে প্রচার বাড়ছে অনলাইনেও। বিধানসভা ভোটের আগে TMC, BJP দুই দলই রীতিমতো কোটি-কোটি টাকা দিয়ে ফেসবুক-গুগলে প্রচার চালাচ্ছে। শাসকদল তৃণমূল কিছুটা এগিয়ে। মেটা এবং গুগলের বিজ্ঞাপনের ডেটাবেস থেকে এমনটাই জানা যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন এখনও আনুষ্ঠানিক সূচি ঘোষণা করেনি। তবে সম্ভবত মার্চ-এপ্রিলেই ভোট। তার অনেক আগে থেকেই রাজ্যে ডিজিটাল প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে রাজনৈতিক দলগুলি। ইন্ডিয়া টুডে-র ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স (OSINT) টিমের বিশ্লেষণ, গত এক মাসেই পশ্চিমবঙ্গে ডিজিটাল প্রচারে খরচ হয়েছে ৬.৩৮ কোটি টাকা। গত ১৮ ডিসেম্বর থেকে ১৬ জানুয়ারির ডেটা তা-ই বলছে। এই সময়ে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, গুগল এবং ইউটিউব জুড়ে হাজার হাজার বিজ্ঞাপন চলেছে।
খরচের বহর: TMC vs. BJP
এই বিপুল অঙ্কের একটি বড় অংশ এসেছে শাসকদলের দিক থেকে। মেটা প্ল্যাটফর্মে(ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম) প্রায় ২.৪ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। অন্য দিকে, গুগল এবং ইউটিউবে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩.৯ কোটি টাকা। হিসাব বলছে, তৃণমূল কংগ্রেস এবং তাদের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি বা আইপ্যাক প্রায় ২.৪ কোটি টাকা খরচ করেছে।

তবে সবই যে ডাইরেক্ট দলের পেজ থেকেই হয়েছে, তা কিন্তু নয়। তৃণমূলের সাপোর্টে চলে এমন বেশ কিছু পেজ আছে। যেমন ধরুন 'আবার জিতবে বাংলা', 'তৃণমূলের নবজোয়ার', 'আমি বাংলার ডিজিটাল যোদ্ধা', 'AB কানেক্টস' এবং 'মানুষের মমতা'র মতো একাধিক পেজ রয়েছে। এগুলিকে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের ভাষায় সারোগেট পেজ বলা হয়। এই পেজগুলি থেকেও লাগাতার তৃণমূলপন্থী কন্টেন্ট, ভিডিও ইত্যাদি পোস্ট করা হয়। আর সেই ধরনের স্পনসর্ড পোস্টে খরচও বিপুল। সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে প্রায় ৩২ লক্ষ টাকা।
যেমন ধরুন, একটি পেজের নাম 'বলছে বাংলা'। গত বছরের নভেম্বরে তৈরি। এই পেজ থেকে শাসকদলের হয়ে প্রচার চালানো হচ্ছে। তেমনই আবার বিজেপিকে অ্যাটাক করে টার্গেটেড অ্যাডও চালানো হচ্ছে। যেমন ধরুন, একটি ভিডিওতে দেখানো হচ্ছে, প্রয়াগরাজ মাঘ মেলার ভিডিওতে এক সাধুকে পুলিশি বাধার মুখে পড়ছেন। সেই ভিডিও ব্যবহার করে বিজেপিকে 'হিন্দু-বিরোধী' হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। আবার অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, নাগা সাধুরা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের প্রশংসা করছেন।

অন্য দিকে, বিজেপির ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে খরচের অঙ্কটা কিছুটা কম। তবে একেবারে নগণ্যও নয়। রাজ্যে দলের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে মেটায়(ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম) খরচ হয়েছে প্রায় ৭২ লক্ষ টাকা। গুগলে খরচ হয়েছে আরও প্রায় ৬৩ লক্ষ।
তবে এক্ষেত্রে একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়। আগের নির্বাচনগুলিতে বিজেপি ঢালাও সারোগেট পেজ চালাত। সেই তুলনায় এ বার সেই প্রবণতা কম। ফলে বিজেপি-ঘনিষ্ঠ পেজগুলির বিজ্ঞাপনের পিছনে ব্যয়ও তুলনায় কম।
সরকারের কাজের প্রচার
এই দলীয় প্রচার মূলত দলগুলির নিজস্ব ফান্ডিং থেকেই আসে। তবে শুধু দলীয় প্রচারই যে চলছে, তা কিন্তু নয়। সরকারি দফতর থেকেও করদাতাদের টাকাতে চলছে প্রচার। যদিও তা সরকারের কাজের খতিয়ান হিসাবেই দেখানো হচ্ছে। যেমন ধরুন, রাজ্য সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর মাত্র এক মাসে প্রায় ২.১ কোটি টাকা খরচ করেছে। এই টাকা দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের বিজ্ঞাপন করা হয়েছে। স্পনসর্ড পোস্ট।
অন্য দিকে, কেন্দ্রীয় সরকারের সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ কমিউনিকেশনও পিছিয়ে নেই। এই একই মাসে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১৯ লক্ষ টাকা খরচ করেছে এই দফতর। তাতে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্পের প্রচার করতে স্পনসর্ড পোস্ট দেওয়া হয়েছে। যদিও এই বিজ্ঞাপন শুধু বাংলাকে টার্গেট করেই নয়। অন্যান্য রাজ্যেও প্রচার করা হয়েছে।

বিজেপি-র 'আইটি সেলে'র কথা কারও অজানা নয়। দেশজুড়ে ডিজিটাল ক্ষেত্রে যে বিজেপি অনেক এগিয়ে তা বলাই বাহুল্য। তবে, পশ্চিমবঙ্গ এখনও তাদের কাছে এক কঠিন দুর্গ। বিজ্ঞাপন, কনটেন্ট এবং খরচের দিক থেকে সেই দুর্গ রক্ষায় আপাতত এগিয়ে TMC। পরিসংখ্যান অন্তত সেদিকেই ইঙ্গিত করছে। এর আগে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও ডিজিটাল প্রচারে এই একই প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। এ বারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ডিজিটাল প্রচারের এই ঢেউ ভোটবাক্সে কী প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার।
আকাশ শর্মা