কান্নায় ভেঙে পড়েছেন রোহিতের মা ও আত্মীয়রা।-সংগৃহীত ছবিপক্ষাঘাতগ্রস্ত বাবা, সবজি বিক্রি করে কোনওরকমে সংসার চালান মা। সেই অভাবের সংসারের হাল ধরতে চেয়েছিলেন বছর কুড়ির রোহিত চৌধুরী। স্বপ্ন ছিল, কাজ শিখে একদিন বিদেশে চাকরি করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন চিরতরে চাপা পড়ল তারাতলার নির্মীয়মাণ গুদামের ধ্বংসস্তূপে।
পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়ার গাজীপুর গ্রামের বাসিন্দা রোহিত চৌধুরী মাত্র ২০২৪ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছিলেন। এরপর আইটিআই-তে ফিটার ট্রেডে পড়াশোনা করে বিদেশে চাকরি করার ইচ্ছা ছিল তাঁর। কিন্তু আর্থিক অনটনের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তাই হাতে-কলমে কাজ শেখার জন্য প্রায় ছ'মাস আগে মামার সঙ্গে কলকাতার তারাতলায় কাজে যোগ দেন। আর সেই সিদ্ধান্তই তাঁর জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়াল।
মঙ্গলবার বিকেলেও ফোনে মাকে আশ্বস্ত করেছিলেন রোহিত। বলেছিলেন, 'মা, চিন্তা কোরো না, আমি ভালো আছি। ৫ জুলাই কাকার বিয়েতে বরযাত্রী হয়ে বাড়ি ফিরব।' কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি আর রাখা হল না। বুধবার দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিনি। বৃহস্পতিবার তাঁর নিথর দেহ পৌঁছয় গাজীপুরের বাড়িতে। ছেলেকে শেষবার দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা নীলমদেবী ও বাবা বেনারসি চৌধুরী। গোটা গ্রাম শোকে স্তব্ধ হয়ে যায়।
রোহিতের বাবা দীর্ঘদিন ধরে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। ছোট ভাই রোহন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। সংসারের সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে চেয়েছিলেন রোহিত। তাঁর মাসতুতো দিদি নেহা চৌধুরী জানান, আর্থিক সঙ্কটের কারণে উচ্চমাধ্যমিকের পর পড়াশোনা বন্ধ করতে হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল, কিছুদিন কাজ করে টাকা জমিয়ে আবার আইটিআই-তে ভর্তি হবেন। তারপর বিদেশে গিয়ে মোটা বেতনের চাকরি করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হল না।
রোহিতের মা নীলমদেবী চোখের জল সামলাতে না পেরে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, 'ছেলেটা আমাদের অভাবের সংসারে আলো জ্বালাতে চেয়েছিল। কে জানত এভাবেই চলে যাবে!'
একই দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম হয়েছেন রোহিতের প্রতিবেশী ২২ বছরের রামপ্রসাদ চৌধুরী। তাঁর কোমর ভেঙে গিয়েছে, মাথায় গুরুতর চোট লেগেছে এবং ডান পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে এসএসকেএম হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছে।
রামপ্রসাদও সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন। বাবা বহু আগেই মারা গিয়েছেন। দুই দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। দেড় মাস আগে কাজের খোঁজে তারাতলায় এসেছিলেন তিনি। এর আগে জয়পুরে সোনার কাজও শিখেছিলেন। তাঁর মা যামিনী চৌধুরীর আশঙ্কা, ছেলে হয়তো আর কোনওদিন স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারবেন না। তিনিও সংবাদমাধ্যমকে বলেন, 'অভাব ঘোচাতে কাজ করতে গিয়েছিল। ভাবিনি এভাবে জীবনের এত বড় মূল্য দিতে হবে।'
তারাতলার এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একদিকে যেমন নিভে গেল এক তরুণের বিদেশে চাকরির স্বপ্ন, তেমনই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল আরও একটি পরিবার। স্থানীয়দের দাবি, এই দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হোক এবং যাঁদের গাফিলতিতে এতগুলি প্রাণ ঝরে গেল, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।