Bengal Birth Rate: ভারতের জন্মহার নিয়ে উদ্বিগ্ন মাস্ক, পশ্চিমবঙ্গের হাল বেশ শোচনীয়

পশ্চিমবঙ্গে জন্মহার ও প্রজনন হার দেশের গড়ের তুলনায় অনেক নীচে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক চাপ, জীবনযাত্রার উচ্চ খরচ এবং পরিবার পরিকল্পনার সচেতনতাই এই প্রবণতার অন্যতম কারণ। কিন্তু জনসংখ্যা কমলেই কি তা সবসময় ভাল?

Advertisement
ভারতের জন্মহার নিয়ে উদ্বিগ্ন মাস্ক, পশ্চিমবঙ্গের হাল বেশ শোচনীয়জনসংখ্যা কমলেই কি তা সবসময় ভাল?
হাইলাইটস
  • পশ্চিমবঙ্গে জন্মহার ও প্রজনন হার দেশের গড়ের তুলনায় অনেক নীচে।
  • জনসংখ্যা বাড়লে যেমন সমস্যা, তেমন হঠাৎ কমে গেলেও বিপদ।
  • জীবনযাত্রার উচ্চ খরচ এবং পরিবার পরিকল্পনার সচেতনতাই এই প্রবণতার অন্যতম কারণ।

'রাজ্যে জন্ম নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন।' সম্প্রতি এমনই মন্তব্য করেছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের পরিসংখ্যান সম্পূর্ণ উল্টো কথাই বলছে। দেশের যে রাজ্যগুলিতে জন্ম ও প্রজনন হার সবচেয়ে কম, তার মধ্যে বাংলা অন্যতম। হয় তো ভাবছেন, জনসংখ্যা কমলে তো ভালই! কিন্তু বিষয়টি এত সহজ নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা রাজ্যের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং জনসংখ্যার কাঠামোয় বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতে শিক্ষিতদের মধ্যে জন্মহার হ্রাস নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্বের ধনীতম শিল্পপতি ইলন মাস্কও।  

স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (SRS)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে পশ্চিমবঙ্গের মোট প্রজনন হার (Total Fertility Rate বা TFR) ছিল ১.৩০। অর্থাৎ গড়ে একজন মহিলা তাঁর জীবদ্দশায় ১.৩ জন সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। এই হার দেশের রিপ্লেসমেন্ট লেভেল ২.১-এর অনেক নীচে।

২০২৩ সালে পশ্চিমবঙ্গের মোট প্রজনন হার (Total Fertility Rate বা TFR) ছিল ১.৩০।
২০২৩ সালে পশ্চিমবঙ্গের মোট প্রজনন হার (Total Fertility Rate বা TFR) ছিল ১.৩০।

শুধু প্রজনন হারই নয়, জন্মহারের ক্ষেত্রেও দেশের গড়ের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে বাংলা। এক বছরে কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রতি ১,০০০ জন মানুষের মধ্যে মোট যত সংখ্যক জীবিত শিশুর জন্ম হয়, তাকে জন্মহার (Birth Rate) বলে। রাজ্যের সামগ্রিক জন্মহার ১৪। সেখানে জাতীয় গড় ১৮.৪। বাংলার শহরগুলিতে প্রতি হাজার জনে জীবিত শিশুর জন্মের হার মাত্র ১১। দেশের বড় রাজ্যগুলির মধ্যে সর্বনিম্ন। গ্রামীণ বাংলায় এই হার ১৫.৩, যা দেশের মধ্যে পঞ্চম সর্বনিম্ন।

সন্তান জন্মের হার কেন কমছে? 
জনসংখ্যাবিদ এবং অর্থনীতিবিদদের মতে, শিক্ষার প্রসার, নগরায়ণ, কর্মক্ষেত্রে মহিলার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং পরিবার পরিকল্পনা তো রয়েছেই। তবে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল আর্থিক চাপ।

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, জীবনযাত্রার খরচ, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং মধ্যবিত্তের উপর অর্থনৈতিক চাপ যে বাড়ছে তা অনস্বীকার্য। ভোগ প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে পরিবারগুলির বেসিক খরচও আগের তুলনায় বেশি। সেই কারণে অনেক দম্পতিই কম সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। বেশি দায়িত্ব নিতে অনীহা বাড়ছে। আবার বহু মানুষ দেরিতে বিয়ে করছেন অথবা সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন।

Advertisement

রিপ্লেসমেন্ট লেভেল কী?
একটি দেশের জনসংখ্যা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল রাখতে গড়ে প্রতি মহিলার ২.১ জন সন্তান জন্ম দেওয়া প্রয়োজন। একে বলা হয় রিপ্লেসমেন্ট লেভেল।

এই হার দীর্ঘ সময় ধরে ২.১-এর নীচে থাকলে নতুন প্রজন্ম আর আগের প্রজন্মকে সংখ্যার দিক থেকে রিপ্লেস করতে পারে না। ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি কমতে থাকে।

ভারতের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের SRS রিপোর্ট অনুযায়ী দেশের মোট প্রজনন হার কমে দাঁড়িয়েছে ১.৯। রাষ্ট্র সংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (UNFPA) ২০২৫ সালের ‘স্টেট অফ ওয়ার্ল্ড পপুলেশন’ রিপোর্টেও একই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

জনসংখ্যা কমলে তো ভাল... তাই না?
ট্রেন, বাস বা রাস্তায় ভিড় দেখে অনেকেই মনে করেন, জনসংখ্যা কমলে সমস্যা কমবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তব চিত্র অনেক বেশি জটিল।

উচ্চ জনসংখ্যার দেশে প্রজনন হার হঠাৎ কমে গেলে থাকলে সমাজে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। অন্য দিকে কর্মক্ষম যুব জনসংখ্যার অনুপাত কমে যায়। ফলে শিল্প, পরিষেবা এবং উৎপাদন খাতে কর্মীর ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

একই সঙ্গে স্বাস্থ্য পরিষেবা, পেনশন এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকারি ব্যয়ও বাড়ে। বাজারে ক্রেতার সংখ্যা হঠাৎ হ্রাস পেয়ে যায়। ফলে অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ে। 

কমেছে বাংলার মৃত্যু হার
তবে সব পরিসংখ্যানই উদ্বেগের নয়। মৃত্যুহারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে পশ্চিমবঙ্গ।

SRS রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্যের মৃত্যুহার বর্তমানে ৫.৭। জাতীয় গড় ৬.৪-এর তুলনায় কম। এর আগে SRS বুলেটিনে এই হার ছিল ৬.৩। বিশেষজ্ঞদের মতে, আরও বেশি মানুষের কাছে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছেছে। চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। পরিসংখ্যানই তার প্রতিফলন।

গ্রামীণ বাংলায় মৃত্যুহার ৫.৬, যেখানে শহুরে এলাকায় তা ৫.৯।

এ ছাড়া বাংলার শিশু মৃত্যুহারও জাতীয় গড়ের তুলনায় কম। রাজ্যে শিশু মৃত্যুহার ১৭। জাতীয় গড় ২৫।

জনসংখ্যা বাড়ছে, তবে ধীর গতিতে
জন্মহার কমলেও পশ্চিমবঙ্গে এখনও স্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি (Natural Growth Rate) ইতিবাচকই রয়েছে। জন্মহার ও মৃত্যুহারের ব্যবধান ধরে হিসাব করলে রাজ্যের স্বাভাবিক বৃদ্ধি হার ৮.৩। আগের রিপোর্টে তা ছিল ৮.২।

গ্রামীণ বাংলায় এই বৃদ্ধি হার ৯.৭, যেখানে শহুরে এলাকায় তা ৫.২।

কোন রাজ্যে এখনও জন্মহার বেশি?
দেশের বড় রাজ্যগুলির মধ্যে বিহারের জন্মহার সবচেয়ে বেশি, ২৫.৮। ঝাড়খণ্ডে ২০.৬, অসমে ১৯.৮ এবং ওড়িশায় ১৬।

অন্য দিকে বড় রাজ্যগুলির মধ্যে সর্বনিম্ন জন্মহার তামিলনাড়ুতে, ১২।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে সামগ্রিকভাবে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন চলছে। ছোট পরিবার, কম সন্তান এবং ধীর জনসংখ্যা বৃদ্ধিই তার প্রতিফলন। পশ্চিমবঙ্গ সেই পরিবর্তনের অন্যতম উদাহরণ।

POST A COMMENT
Advertisement