
রাজ্যের সরকারি বাসে মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে যাতায়াতের সুবিধা চালু হওয়ার পর একদিকে যেমন যাত্রীরা স্বস্তি পেয়েছেন, অন্যদিকে বেসরকারি বাস মালিকদের একাংশ দাবি করছেন, এর ফলে তাঁদের ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ছে। যাত্রীসংখ্যা কমে যাওয়ায় আয়ও কমছে, ফলে ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ সামলাতে সরকারের হস্তক্ষেপের দাবি তুলেছেন তাঁরা।
বেসরকারি বাস অপারেটরদের অভিযোগ, মহিলা যাত্রীরা স্বাভাবিকভাবেই বিনামূল্যে পরিষেবা পাওয়া সরকারি বাসের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে বেসরকারি বাসে যাত্রী কমছে এবং প্রতিদিনের আয়েও টান পড়ছে। এর পাশাপাশি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও দীর্ঘদিন ভাড়া সংশোধন না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বেসরকারি পরিবহণ শিল্পের তরফে ‘কিলোমিটার স্কিম’ চালুর দাবি জোরদার হয়েছে। প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে বেসরকারি বাসগুলিকে সরকারি পরিবহণ ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বাসের মালিকরা যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ এবং চালক সরবরাহের দায়িত্বে থাকবেন, আর সরকার নির্ধারিত দূরত্ব অনুযায়ী তাঁদের পারিশ্রমিক দেবে।
যুগ্ম বাস সিন্ডিকেট পরিষদের সম্পাদক তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, মহিলাদের বিনামূল্যে বাসযাত্রা চালু হওয়ার পর থেকে প্রতিটি বেসরকারি বাসে দৈনিক গড়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত আয় কমে যাচ্ছে। যেখানে সরকারি বাস পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে মহিলা যাত্রীরা স্বাভাবিকভাবেই সেই পরিষেবাই বেছে নিচ্ছেন। ফলে বেসরকারি বাসের যাত্রীসংখ্যা কমে যাচ্ছে।
তাঁর মতে, পশ্চিমবঙ্গের গণপরিবহণ ব্যবস্থার মূল ভরসা এখনও বেসরকারি বাস। রাজ্যের মোট বাসযাত্রীর প্রায় ৮৫ শতাংশই বেসরকারি বাসের উপর নির্ভরশীল।
আর্থিক ক্ষতির উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, আগে কোনও মা ও তাঁর মেয়ের স্কুলে যাওয়া-আসার জন্য দিনে চারটি টিকিট বিক্রি হতো। এখন তাঁরা যদি সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাতায়াত করেন, তবে সেই আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বেসরকারি বাস মালিকরা।
একই সুর শোনা গিয়েছে অল বেঙ্গল বাস ও মিনিবাস কো-অর্ডিনেশন কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাহুল চট্টোপাধ্যায়ের গলাতেও। তাঁর মতে, সরকার যদি কিলোমিটার প্রকল্পের আওতা বাড়িয়ে বেসরকারি বাসগুলিকেও সরকারি পরিবহণ নেটওয়ার্কে অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে অপারেটরদের আর্থিক সুরাহা হবে। এতে যাত্রী এবং বেসরকারি অপারেটরউভয়েরই লাভ হবে। পরিচালন খরচ ও লোকসান নিয়ে আমাদের আর চিন্তা করতে হবে না।
কিলোমিটার প্রকল্পে বাসের মালিকরা যানবাহন কিনবেন ও রক্ষণাবেক্ষণ করবেন, চালকও দেবেন তাঁরা। অন্যদিকে পরিবহণ দফতর বাসগুলিকে সরকারি বহরে অন্তর্ভুক্ত করবে এবং সরকারি কন্ডাক্টররা ভাড়া সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করবেন। বিনিময়ে প্রতি কিলোমিটার চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট অর্থ পাবেন বাস মালিকরা।
তবে তপন বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাহুল চট্টোপাধ্যায় দু’জনেই স্পষ্ট জানিয়েছেন, সরকারের বিনামূল্যে বাসযাত্রার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁদের কোনও আপত্তি নেই। নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার সরকারেরই রয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।
উল্লেখ্য, বিধানসভা নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিজেপি সরকার পশ্চিমবঙ্গ পরিবহণ নিগম (WBTC), দক্ষিণবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ সংস্থা (SBSTC) এবং উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ সংস্থা (NBSTC)-র বাসে মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে যাতায়াতের ব্যবস্থা চালু করেছে।
বেসরকারি অপারেটরদের দাবি, যেসব রুটে সরকারি বাসের সংখ্যা বেশি, সেখানেই এই নীতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। শিলিগুড়ি-কুচবিহার রুট কিংবা হাওড়া স্টেশন থেকে কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে যাওয়া রুটগুলিতে বেসরকারি বাসের যাত্রীসংখ্যা কমার প্রবণতা স্পষ্ট।
এর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বাসভাড়া সংশোধন না হওয়াও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে দাবি পরিবহণ সংগঠনগুলির। তাঁদের বক্তব্য, শেষবার সরকারি বাসভাড়া বৃদ্ধি হয়েছিল ২০১৮ সালে। তারপর থেকে জ্বালানির দাম একাধিকবার বেড়েছে, কিন্তু ভাড়ার কাঠামোয় কোনও পরিবর্তন হয়নি।
রাহুল চট্টোপাধ্যায় জানান, শুধু চলতি বছরের মে মাসেই ডিজেলের দাম লিটারপিছু প্রায় ১০ টাকা বেড়েছে। অথচ বাসভাড়া একই রয়েছে, ফলে পরিচালন খরচ ক্রমশ বেড়ে চলেছে।