ইরানে বিক্ষোভএক সময় ইরানের রাস্তায় প্রতিধ্বনিত হওয়া 'মোল্লারা বিদায় নাও' ও 'জাভিদ শাহ'স্লোগান এখন স্তব্ধ। তার জায়গায় প্রকট হচ্ছে আরও এক ভয়াবহ বাস্তব। আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইয়ের ধর্মীয় শাসনের অধীনে দুঃস্বপ্নের মতো কাটছে নাগরিক জীবন।
ইরানের কারাগারগুলির ভিতরে বন্দিদের নগ্ন করে হিমশীতল পরিবেশে ফেলে রাখা হচ্ছে এবং অজ্ঞাত রাসায়নিক বা ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছে। পাচার করা ভিডিও, অজ্ঞাত পরিচয় ফোন করল এবং স্টারলিঙ্কের মাধ্যমে পাঠানো আবছা বার্তা থেকে জানা যাচ্ছে এগুলি। মানবাধিকার সংগঠনগুলির মতে, হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের মাত্রা কল্পনার অতীত।
কালো ব্যাগে মোড়া মরদেহ, মেঝে ও স্ট্রেচারে স্তূপ করে রাখা লাশ, আর নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে বেড়ানো পরিবারের ছবি সামনে এসেছে। যদিও আনুষ্ঠানিক ভাবে বলা হচ্ছে বিক্ষোভ থেমে গিয়েছে।
ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে শুরু হওয়া খামেনেই বিরোধী বিক্ষোভ ছিল ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে প্রাণঘাতী। ভেঙে পড়া অর্থনীতির প্রতিবাদ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুতই ৪৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা ধর্মীয় শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জের রূপ নেয়। রয়টার্সকে দেওয়া এক গোপন সূত্রের তথ্যে বলা হয়, সরকার অন্তত ৫ হাজার জনকে হত্যা করেছে। যাদের মধ্যে রয়েছে ৫০০ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।
খামেনেই সরকার চরম দমন-পীড়ন শুরু করেছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) মোতায়েন করা হয় এবং দেশজুড়ে ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিক্ষোভ দমনে ৫ হাজার ইরাকি আরব মিলিটারিকেও ইরানে আনা হয়। এই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জনান এবং তেহরানকে কঠোর পরিণতির হুঁশিয়ারি দেন।
ইরানের কারাগারে কী ঘটছে?
ডেইলি এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে বন্দিদের উপর ভয়াবহ নির্যাতনের বিবরণ উঠে এসেছে। এক বন্দির পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, বন্দিদের কারাগারের আঙিনায় নগ্ন করে রাখা হয় এবংঠান্ডা জলের পাইপ থেকে স্প্রে করা হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ হল, বন্দিদের শরীরে অজ্ঞাত ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছে। যার কোনও ব্যাখ্যা কর্তৃপক্ষ দেয়নি।
বাতালে রক্তের গন্ধ!
৮ জানুয়ারি ইন্টারনেট বন্ধের পর পরিস্থিতির ভয়াবহতা ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে। ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিরল ফোনকল, স্টারলিঙ্ক বার্তা ও পাচার করা ভিডিও থেকে দেশজুড়ে গণহত্যার প্রমাণ মিলেছে। ইন্টারনেট বন্ধের কয়েক দিন পর চিন বা রাশিয়ার সমমানের জ্যামার ব্যবহার করে স্টারলিঙ্কও নিষ্ক্রীয় করা হয়। এরপর নিরাপত্তা বাহিনী বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালিয়ে যোগাযোগের সরঞ্জাম বাজেয়াপ্ত করে। তেহরান থেকে পাঠানো এক স্টারলিঙ্ক বার্তায় এক বাসিন্দা লেখেন, 'প্রায় প্রত্যেক মানুষই কোনও না কোনও স্বজন বা বন্ধুর মৃত্যুর খবর দিচ্ছে। এটা মোটেও অতিরঞ্জিত নয়।' আরও একটি বিবরণে বলা হয়, 'তাজরিশ ও নারমাক এলাকায় বাতাসে রক্তের গন্ধ ভাসছে। শহরের রাস্তা ধোয়া হচ্ছিল পুরসভার জলের ট্যাঙ্ক দিয়ে।' এক প্রত্যক্ষদর্শী বিবিসি-কে বলেন, 'প্রতিটি গুলিতে ২-৩ জন করে মারা গিয়েছে।'
কত মানুষ নিহত?
হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (HRANA) জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা ৪ হাজার ২৯ জনে পৌঁছে গিয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ২৬ হাজার ১৫ জন এবং অন্তত ৫ হাজার ৮১১ জন গুরুতর আহত।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের মতে, নিহতের সংখ্যা ১২ হাজার পর্যন্ত হতে পরে। মার্কিন গণমাধ্যম CBS নিউজ দু'টি সূত্রের দাবি, এই সংখ্যা ২০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে।
খামেনেই সরকার বিক্ষোভকারীদের 'মোহারেব' বা 'ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী' আখ্যা দিয়েছেন। যদিও আন্তর্জাতিক চাপ বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির পর ফাঁসি কর্যকর হওয়া রদ হয়েছে ইরানে। তবে এখনও বিক্ষোভকারীদের নগ্ন করে ঠান্ডায় ফেলে রাখা, অজ্ঞাত ইনজেকশন দেওয়া, গণকবর, বলপূর্বক স্বীকারোক্তির খবরগুলি পাওয়া যাচ্ছে।