
Image: Baloch Students Organization Azad/ Xস্বাধীনতা দিবস উদযাপন করছে বালুচিস্তানের বহু মানুষ। কারও হাতে পতাকা, কার হাতে রঙিন বেলুন। ১১ অগাস্ট সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই সেই ছবি ও ভিডিও দেখা গিয়েছে। তা দেখে অনেকের প্রশ্ন, তাহলে কি পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে নিজেদের স্বাধীনতা পেয়ে গেল বালুচিস্তান?
আসলে, ১১ অগাস্ট তারিখটি বালুচ জাতীয়তাবাদীদের কাছে বালুচিস্তানের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের সময় 'খানাত অফ কালাত' (বর্তমান বালুচিস্তান অঞ্চলে শাসনরত একটি রাজ্য) যে সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করেছিল, তার স্মরণে এই দিনটি পালন করা হয়।
পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগে 'কালাত' সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে স্বাধীন ছিল। এরপর, কালাতের শাসক মির আহমদ ইয়ার খান মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর দ্বারা প্রতারিত হন এবং ১৯৪৮ সালের ২৭ মার্চ বাধ্য হয়ে 'ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন' বা ভারত বা পাকিস্তানের সঙ্গে যোগদানের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
যদিও পাকিস্তানে ১৪ অগাস্টই স্বীকৃত স্বাধীনতা দিবস এবং ১১ অগাস্টের কোনও সরকারি স্বীকৃতি নেই, তবুও ইতিহাসের পাতায় এই তারিখটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বালুচিস্তান হাইকোর্টের ২০২৬ সালের সরকারি ছুটির তালিকায় স্বাধীনতা দিবস হিসেবে ১৪ অগাস্টকেই উল্লেখ করা হয়েছে, ১১ তারিখকে নয়। পৃথক রাষ্ট্রের দাবিতে সোচ্চার বালুচ জাতীয়তাবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাছে ১১ অগাস্ট এমন এক সার্বভৌমত্বের প্রতীক, যা তাঁদের মতে ১৯৪৮ সালে হারিয়ে গিয়েছিল।
'মির ইয়ার বালুচ' নামের এক 'এক্স' ব্যবহারকারী দাবি করেছেন, বালুচিস্তান পাকিস্তানের কোনও প্রদেশ নয়। তিনি বিশ্ববাসীর কাছে বালুচিস্তানকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত 'রিপাবলিক অফ বালুচিস্তান' শীঘ্রই আলাদাভাবে পাসপোর্ট, মুদ্রা এবং দূতাবাস চালুর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করবে। তিনি আরও দাবি করেন যে, বালুচিস্তান পাঁচ লক্ষ সদস্যের একটি সেনাবাহিনী প্রস্তুত করেছে।
ওই ব্যক্তি আরও দাবি করেন, বালুচিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন আটকাতে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছিল পাকিস্তান সরকার। তবে নানা বিধিনিষেধ সত্ত্বেও মানুষ তা উদযাপন করেছে।
কেন ১১ অগাস্ট বালুচ জাতীয়তাবাদীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ?
ইংরেজ শাসন আমলে কালাত রাজ্যের সঙ্গে ব্রিটিশদের একটি বিশেষ চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক ছিল। ১৯৪৭ সালের ১১ অগাস্ট কালাত এবং মুসলিম লিগের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। বালুচ জাতীয়তাবাদীদের মতে, সেই চুক্তির মাধ্যমে কালাতকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
এর পর কালাত নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ঐতিহ্যবাহী পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং কালাতের শাসক তথা খান-এর নামে খুতবা পাঠ করা হয়।
বালুচ ন্যাশনাল মুভমেন্ট (BNM) তাদের একটি X পোস্টে ১১ অগাস্টকে 'বালুচিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তির দিন' হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তারা অল ইন্ডিয়া রেডিও (AIR)-এর একটি ঘোষণার কথাও উল্লেখ করেছে। সেখানে বলা হয়েছিল, 'কালাত রাজ্য ১১ অগাস্ট ১৯৪৭ থেকে স্বাধীন মর্যাদা ফিরে পাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কালাতের খান ঘোষণা করেছেন, এরপর থেকে কালাত একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে থাকবে এবং সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে। বিশেষ করে তার প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে।'

২০১৭ সালে বালুচ পিপলস পার্টিও একই ধরনের দাবি করেছিল। তারা ১৯৪৭ সালের ১২ অগাস্ট প্রকাশিত New York Times-এর একটি প্রতিবেদনের উল্লেখ করে জানায়, সেখানে বলা হয়েছিল পাকিস্তান কালাতকে 'ভারতীয় রাজ্যগুলির থেকে পৃথক মর্যাদাসম্পন্ন একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। ১৯৪৭ সালে বর্তমানের গোটা বালুচিস্তান কোনও একক ঐক্যবদ্ধ দেশীয় রাজ্য ছিল না। কালাত, খারান, লাস বেলা এবং মাকরানের রাজনৈতিক অবস্থান ছিল আলাদা। অন্যদিকে, ব্রিটিশ বালুচিস্তান ছিল ব্রিটিশদের সরাসরি প্রশাসনের অধীনে থাকা একটি পৃথক অঞ্চল।
পরবর্তীকালে খারান, লাস বেলা এবং মাকরান পৃথকভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়। তাই ১১ অগাস্টের স্বাধীনতার দাবি মূলত কালাত রাজ্যকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে, বর্তমানের পুরো বালুচিস্তানকে নিয়ে নয়।
বালুচিস্তানের ৭ মাসের স্বাধীনতা তারপর পাকিস্তানের সঙ্গে সংযুক্তি
বালুচিস্তান স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর কী ঘটেছিল, তা নিয়েই মূল বিতর্ক। পাকিস্তান কালাতকে তাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য চাপ দিতে শুরু করলে কালাতের খান প্রথমে তা প্রত্যাখ্যান করেন। কালাতের আইনসভার দুই কক্ষই পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিল। তবে ১৯৪৮ সালের মার্চের মধ্যে পাকিস্তান খারান, লাস বেলা এবং মাকরানকে আলাদাভাবে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করে নেয়। এর ফলে কালাতের অবস্থান অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। এর পর পাকিস্তান যখন এই অঞ্চলগুলিকে কালাতের কাছ থেকে আলাদা করে নেয় এবং বালুচ উপকূলের তুরবাত, পাসনি ও জিওয়ানি এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী প্রবেশ করে, তখন কালাতের খান পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হতে বাধ্য হন বলে বালুচ জাতীয়তাবাদীদের দাবি।
১৯৪৮ সালের ২৭ মার্চ কালাতের খান মির আহমদ ইয়ার খান Instrument of Accession-এ স্বাক্ষর করেন। জিন্নার প্রশাসনের ক্রমবর্ধমান চাপের পরেই এই সংযুক্তি হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। বালুচ জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলি এই ঘটনাকে পাকিস্তানের সামরিক দখল হিসেবে বর্ণনা করে।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে বালুচ পিপলস পার্টির প্রকাশিত বিবৃতিতেও বালুচিস্তানজুড়ে এবং বিদেশে বসবাসকারী বালুচদের মধ্যে পতাকা উত্তোলন ও সচেতনতা কর্মসূচির কথা বলা হয়েছিল। সেখানে ১১ অগাস্টকে বালুচদের ‘জাতীয় দিবস’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এই আবেগের প্রতিফলন ভারতের মধ্যেও দেখা যায়। বালুচিস্তানের সঙ্গে পূর্বপুরুষের সম্পর্ক থাকা মুম্বইয়ের বাসিন্দা মুনাফ বালুচ PTI-কে জানিয়েছেন, মুম্বইয়ে প্রায় ১,০০০ থেকে ১,৫০০ বালুচ মানুষ বসবাস করেন। তাঁর বক্তব্য, বালুচিস্তানের স্বাধীনতার কথা ভাবলে তাঁদের মধ্যে আনন্দের অনুভূতি তৈরি হয়। কারণ বর্তমানে তাঁদের যথাযথ ভিসা সুবিধা নেই এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের কারণেও তাঁরা নানা সমস্যার মধ্যে রয়েছেন।
অর্থাৎ, বালুচ জাতীয়তাবাদীদের কাছে ১১ অগাস্ট একটি হারিয়ে যাওয়া সার্বভৌমত্বের প্রতীক। অন্যদিকে পাকিস্তান বালুচিস্তানকে দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখে এবং সেই ভাবেই ১১ অগাস্টের ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করে।