পাকিস্তানে ভাঙা হল হিন্দু মন্দিরপাকিস্তানের পঞ্জাব প্রদেশের নারোয়ালের সিরাজ গ্রামে শতাব্দীপ্রাচীন একটি হিন্দু মন্দির ভেঙে ফেলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করল ভারত। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, মন্দিরটি ইচ্ছাকৃত ভাবে ভেঙে সেই জমি একটি মাদ্রাসার কাজে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও পাকিস্তানের দাবি, প্রবল বৃষ্টির জেরে পুরনো মন্দিরটির কাঠামো নিজে থেকেই ভেঙে পড়ে।
লাহোর থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে সিরাজ গ্রামে থাকা মন্দিরটি গত ২১ অগাস্ট ভেঙে পড়ে বলে খবর। মন্দিরটির বয়স ১০০ থেকে ১২৫ বছরেরও বেশি বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের Evacuee Trust Property Board (ETPB)-এর এক আধিকারিক।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, 'বিষয়টি নিয়ে নয়াদিল্লি গভীর উদ্বিগ্ন। রিপোর্ট খতিয়ে দেখা হচ্ছে।' শতাব্দীপ্রাচীন সংখ্যালঘু উপাসনাস্থল ধ্বংসের ঘটনাকে তিনি স্পষ্ট ভাষায় নিন্দা করেন।
জয়সওয়াল বলেন, 'শতাব্দীপ্রাচীন সংখ্যালঘু উপাসনাস্থলের বিরুদ্ধে এই নিন্দনীয় ভাঙচুরের ঘটনায় আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাবে নিন্দা জানাচ্ছি।' একই সঙ্গে মন্দিরটির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পাকিস্তানের ব্যর্থতাকেও ‘উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ভারত পাকিস্তান সরকারের কাছে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। ঘটনায় যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি মন্দিরটি পুনরুদ্ধারে অবিলম্বে পদক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছে নয়াদিল্লি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা এবং তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করা পাকিস্তান সরকারের মৌলিক দায়িত্ব বলেও জানিয়েছে ভারত।
মন্দিরের জমি কি মাদ্রাসার জন্য ব্যবহারের চেষ্টা?
ঘটনাটি নিয়ে অবশ্য পাকিস্তানে ভিন্ন একটি দাবি সামনে এসেছে। সংবাদ সংস্থা PTI-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তান মসিহা মিল্লত পার্টি (PMMP), হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা ইচ্ছাকৃত ভাবে মন্দিরটি ভেঙে দেয়। এরপর মন্দিরের জমি সংলগ্ন একটি মাদ্রাসার কাজে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
PMMP-র চেয়ারম্যান আসলাম পারভেজ সাহোত্রা এই ঘটনায় সরকারি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২৮ অগাস্ট তিনি পঞ্জাবের অতিরিক্ত স্বরাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে দেখা করে লিখিত অভিযোগ জমা দেন এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
আসলাম পারভেজ সাহোত্রার আরও অভিযোগ, নিষিদ্ধ ঘোষিত কট্টরপন্থী ইসলামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠন তেহরিক-ই-লাব্বাইক পাকিস্তান (TLP)-এর সদস্যরা মন্দির ভাঙার ঘটনায় জড়িত ছিলেন। মন্দিরের শিখর থেকে ধাতব অংশ, ইট এবং অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেছেন।
তাঁর দাবি, মন্দির সংলগ্ন জমি আগে ETPB একটি মাদ্রাসার জন্য লিজ দিয়েছিল। কিন্তু ভাড়া বকেয়া থাকা এবং নির্দিষ্ট কাজে জমি ব্যবহার না করার অভিযোগে পরে সেই লিজ বাতিল করা হয়।
পাকিস্তানের দাবি, বৃষ্টিতেই ভেঙেছে মন্দির
তবে মন্দির ভাঙার কারণ নিয়ে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ আলাদা। ETPB-র সিনিয়র আধিকারিক রানা ইফতিখার জানিয়েছেন, প্রবল বৃষ্টির কারণে পুরনো কাঠামোটি ভেঙে পড়েছে। তাঁর কথায়, মন্দিরটি ১০০ থেকে ১২৫ বছরেরও বেশি পুরনো।
রানা ইফতিখার আরও জানান, ETPB-র রেকর্ডে মন্দিরটির কোনও নির্দিষ্ট নাম নেই। তবে মন্দিরটির নিজস্ব জমি কাউকে লিজ দেওয়া হয়নি বলেও তিনি স্পষ্ট করেছেন। তাঁর দাবি, মন্দির সংলগ্ন জমি একটি সেমিনারির জন্য লিজ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু মন্দিরের জমি লিজ দেওয়া হয়নি।
এখন ঐতিহাসিক মন্দিরটির কাঠামো পুনর্নির্মাণ বা পুনরুদ্ধার করা হবে কি না, সে বিষয়ে ETPB-র শীর্ষ আধিকারিকরা সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
আগেই কি সতর্ক করা হয়েছিল প্রশাসনকে?
ঘটনাকে ঘিরে আরও একটি অভিযোগ সামনে এসেছে। আসলাম পারভেজ সাহোত্রার দাবি, মন্দির ও সংলগ্ন জমি নিয়ে সমস্যার বিষয়ে প্রশাসনকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল।
তিনি ২৯ জানুয়ারির একটি ETPB আদেশের উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, ওই আদেশে সেমিনারির লিজের অধিকার বাতিল করার পাশাপাশি বেআইনি দখলদারদের উচ্ছেদ এবং সম্পত্তিটি সিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশ কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ সাহোত্রার।
এছাড়া ১১ এপ্রিলের একটি রিপোর্টের কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, নারোয়ালের DSP-এর ওই রিপোর্টে মন্দিরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথা স্থানীয় পুলিশ জানত বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
ফলে মন্দিরটি প্রবল বৃষ্টিতে ধসে পড়েছে, নাকি পরিকল্পিত ভাবে ভেঙে ফেলা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে মন্দিরের জমি ও সংলগ্ন সম্পত্তির ব্যবহার নিয়েও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। অভিযোগ ও সরকারি বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকায় একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
পাকিস্তানে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্থানগুলির নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন উঠেছে। মন্দিরে হামলা, দখল, ধর্মীয় স্থান নিয়ে বিরোধ এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের উপর আক্রমণের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে সিরাজের শতাব্দীপ্রাচীন মন্দির ভাঙার ঘটনাও পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্নকে ফের সামনে নিয়ে এসেছে।