ফ্রান্সের স্কুল আন্দোলন নিয়ে কী দাবি ট্রাম্পের? ফ্রান্সে স্কুল পড়ুায়দের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ফের অভিবাসন নীতির সমালোচনায় সরব হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, ফ্রান্সে যে অশান্তি চলছে, তার মূল কারণ স্কুলের সমস্যা নয়, বরং ‘নিয়ন্ত্রণহীন গণঅভিবাসন’ এবং দেশটির দখল নিতে চাইছে মুসলিমরা। ফ্রান্সজুড়ে আড়াই লক্ষেরও বেশি মানুষ রাস্তায় নামার পরই এমন মন্তব্য করেন ট্রাম্প।
মঙ্গলবার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম Truth Social-এ ট্রাম্প লেখেন, 'ফ্রান্সে যা ঘটছে, তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া গণঅভিবাসন ছাড়া আর কিছুই নয়। এটা স্কুল নিয়ে নয়, আসলে এর নেপথ্যে রয়েছে মুসলিমরা। ইসলাম এক সময়ের মহান এই দেশকে গ্রাস করে নিতে চাইছে।'
সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনের পর মঙ্গলবার ফ্রান্সে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ দেখা গিয়েছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবকেরা স্কুলের ক্রমশ অবনতি হতে থাকা পরিস্থিতি, কর্মীর ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকার প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন।
শিক্ষা ব্যবস্থার সংকটকে অন্যভাবে দেখলেন ট্রাম্প
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ফরাসি পড়ুয়ারা স্কুলের প্রবেশপথ অবরোধ করে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির দাবি জানিয়ে আসছেন। প্যারিসের দরিদ্র শহরতলির এলাকা থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন পরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যে থাকা প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকারের উপর চাপ আরও বেড়েছে।
তবে ট্রাম্পের বক্তব্য, এই অশান্তির প্রধান কারণ শিক্ষা ব্যবস্থা নয়। ইউরোপে অভিবাসন নিয়ে ট্রাম্প এবং তাঁর প্রশাসনের দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গেই তাঁর এই মন্তব্যের মিল রয়েছে। ট্রাম্প বারবার ইউরোপীয় সরকারগুলির অভিবাসন নীতির সমালোচনা করেছেন এবং সতর্ক করেছেন যে নিয়ন্ত্রণহীন অভিবাসন পশ্চিম বিশ্বের দেশগুলির উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এই মন্তব্যের সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। আগামী মাসে আমেরিকায় মিড টার্ম নির্বাচন। রিপাবলিকানরা অভিবাসনকে প্রচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে তুলে ধরছে এবং ট্রাম্পের রক্ষণশীল সমর্থকদের একত্রিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। MAGA আন্দোলনের মধ্যেও ফ্রান্সের পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য শুরু হয়েছে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ গ্লেন বেক সোমবার বলেন, 'ফ্রান্সের দাঙ্গা পশ্চিম বিশ্বের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।' ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেও রিপাবলিকানরা অভিবাসন সহ বিভিন্ন ‘কালচার-ওয়ার’ ইস্যুকে প্রচারে আরও গুরুত্ব দিচ্ছে।
ফ্রান্সে স্কুল আন্দোলন
মঙ্গলবার ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার পড়ুয়া, শিক্ষক এবং অভিভাবক মিছিল করেন। তাঁদের মূল দাবি ছিল, স্কুলে আরও বেশি অর্থ বরাদ্দ এবং স্কুলগুলির পরিকাঠামোর উন্নতি।
বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ মূলত শান্তিপূর্ণ ছিল। মার্সেই এবং নঁতে এলাকায় বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল, 'রাষ্ট্র জাতীয় শিক্ষাকে শেষ করে দিয়েছে' লেখা পোস্টার। তুলুজে অভিভাবকদের মানব ব্যারিকেড করতেও দেখা যায়।
তবে কয়েকটি জায়গায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্ট্রাসবুর্গ, লিয়ঁ এবং রেঁ-তে কয়েকজন বিক্ষোভকারী আগুন জ্বালান এবং পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছোড়েন। জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষক এবং স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলনে এর ফলে আরও সংঘর্ষপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়।
আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার পর ফরাসি সরকার দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশ মোতায়েন করে। মানবাধিকার সংগঠন, পড়ুয়াদের সংগঠন এবং অভিভাবকেরা পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে নাবালকদের বিরুদ্ধে পুলিশ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে, সরকারের দাবি, আন্দোলনের কিছু অংশে বহিরাগত সংগঠন এবং হিংসাত্মক গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়ছে। ফলে শিক্ষা সংক্রান্ত মূল দাবি থেকে আন্দোলনের ফোকাস সরে যাচ্ছে।
হাজার হাজার স্কুলে পড়াশোনা ব্যাহত
আন্দোলনের কারণে ঠিক কতগুলি স্কুলে পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে, তা নিয়ে এখনও মতবিরোধ রয়েছে। আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক Union Syndicale Lyceenne-এর দাবি, ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ২০০০ হাইস্কুল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিও এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছে।
তবে ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রকের দেওয়া পরিসংখ্যান অনেকটাই কম। মন্ত্রকের দাবি, ৮৯১টি স্কুলে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ক্লাস বন্ধ হয়েছে। High School Students Union-এর দাবি, ফ্রান্সের অর্ধেকেরও বেশি হাইস্কুল বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কিছু স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষ পড়াশোনা চালু রাখতে অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা করেছে।
এই আন্দোলনের পিছনে শুধু বেতন বা শ্রেণিকক্ষের জন্য অর্থ বরাদ্দের দাবি নেই। পড়ুয়া ও অভিভাবকেরা স্কুলের ছাদ চুঁইয়ে জল পড়া, পুরনো ও খারাপ হয়ে যাওয়া ভবন, কর্মীর ঘাটতি এবং স্কুলের খারাপ পরিবেশের অভিযোগ তুলেছেন। কোথাও কোথাও স্কুলে ইঁদুরের উপদ্রবের অভিযোগও সামনে এসেছে।
সরকার সমস্যাগুলির কয়েকটি সমাধানের জন্য পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু তাতেও পড়ুয়া, শিক্ষক ও অভিভাবকদের ক্ষোভ এখনও কমেনি।