
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প - রয়টার্সআমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম ইলেকশনে ভরাডুবি হল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। ভরাডুবি হল তাঁর দল রিপাবলিকানেরও। আমেরিকার এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে গোটা বিশ্বের মতো ভারতও নজর রাখছে। কারণ, ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক বিপজ্জনক সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হচ্ছে ভারতকেও।
নির্বাচনে বড়সড় ধাক্কা খেলেন ট্রাম্প
এই প্রতিবেদন যখন লেখা হচ্ছে, তখন মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সেনেট কার্যত নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে ডেমোক্র্যাটদের। নিম্নকক্ষ হাউস অফ রিপ্রেজেন্টিটিভসেও অনেক এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা। এখনও গণনা চলছে। তবে ট্রেন্ড যেদিকে যাচ্ছে, তাতে ট্রাম্পের হার কার্যত নিশ্চিত। অর্থাত্ আগামী দু বছর ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে সেনেট ও হাউস অফ রিপ্রেজেন্টিটিভস।
ট্রাম্পের হারে ভারতের কী লাভ?
এখন প্রশ্ন হল, এই যে ট্রাম্প এত বড় ধাক্কা খেলেন, তাতে কি ভারতের উপর ট্যারিফ সরে যাবে H1B ভিসা নিয়ে সমস্যা মিটবে? ভারতের কী লাভ হতে পারে?
১. ২০২০ সালের পর থেকে এত বড় ধাক্কা খাননি ট্রাম্প। সে বার নির্বাচনে হেরে গিয়েছিলেন। তারপরেও ট্রাম্পের উপর ভরসা রেখেছিল আমেরিকাবাসী। কিন্তু ২০২৬ সালের মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের শক্তিঘাঁটিগুলিও ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে গিয়েছে। যার নির্যাস, ট্রাম্পের ক্ষমতা খর্ব হয়ে গেল।
২. ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করে আসা বেশ কিছু এলাকায় ভাল ফল করেছিলেন। আফ্রিকান-আমেরিকান, হিস্পানিক এবং ভারতীয়-আমেরিকান সম্প্রদায়ের মধ্যেও তাঁর সমর্থন বেড়েছিল। এর প্রধান কারণ ছিল জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে তাঁদের অসন্তোষ। বিশেষ করে ডিমের দাম সাধারণ মানুষের কাছে মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হয়ে উঠেছিল। তবে গত দু’বছরে সেই অসন্তোষের তীব্রতা অনেকটাই কমেছে। বরং মূল্যবৃদ্ধি বেড়েছে।
৩. পেট্রোল, ডিজেল, রান্নার গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের খরচ আকাশছোঁয়া হয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে আমেরিকার মধ্য-পশ্চিমের স্টেটগুলি মূলত গ্রামাঞ্চল। মানুষকে বাজার করতেও অনেক দূর যেতে হয় গাড়িতে। এমনকী হাসপাতাল, স্কুল সহ নানা পরিষেবাও অনেকটাই দূরে। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ওই সব স্টেটের বাসিন্দাদের আর্থিক অবস্থা উদ্বেগজনক ভাবে খারাপ হয়েছে। আমেরিকার সাধারণ মানুষ যতবার গাড়িতে পেট্রোল বা গ্যাস ভরছেন, ততবার তাঁদের বিরক্তি বাড়ছে।
৪. ইরান যুদ্ধ বা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধও ভালভাবে নেয়নি আমেরিকাবাসী। কারণ, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সব যুদ্ধ বন্ধ করবে না। MAGA (Make America Great Again) বা ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেন’ সমর্থক রিপাবলিকানদের রীতিমতো বিস্মিত ও হতবাক করেছে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত। আট মাস ধরে যুদ্ধ চলেছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং বেড়েছে গ্যাসের দাম। গোটা পরিস্থিতি ট্রাম্পের পূর্বপরিকল্পনার সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। এই অভিজ্ঞতায় তাঁর সমর্থকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।

৫. বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উপর ট্যারিফ আরোপের জন্য নিজের হাতে থাকা এগজিকিউটিভ ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন ট্রাম্প। ভারত সহ একের পর এক দেশে ট্যারিফ চাপিয়ে ট্রাম্প ভেবেছিলেন, বিরাট শাস্তি দিলেন। কিন্তু তা যে বুমেরাং হয়ে গিয়েছে, বুঝতে পারেননি। এর ফলে আমেরিকায় জীবনযাত্রার খরচ আরও বেড়ে গিয়েছে। কারণ, এই ট্যারিফের বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয়েছে তাঁর নিজের দেশের নাগরিকদেরই। অর্থাৎ, অন্য দেশগুলির উপর ট্যারিফ চাপিয়ে কার্যত নিজের দেশের মানুষের উপরই করের বোঝা বাড়িয়েছেন তিনি। এর প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন পণ্যের দামে। চিন থেকে কানাডা, ভারত থেকে মেক্সিকো, দূর-দূরান্তের বিভিন্ন দেশ থেকে আমেরিকায় আমদানি হওয়া পণ্যের দাম বেড়েছে।
৬. পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং জ্বালানির দাম চড়া থাকলে বা আরও বাড়লে ভারতের অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়তে পারে। পড়ছেও। জ্বালানির জন্য আমদানির উপর নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির জেরে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গতিও ধাক্কা খাচ্ছে।
৭. আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চালাচ্ছে ভারত। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে ট্রাম্প প্রশাসনের দর-কষাকষির অবস্থান দুর্বল হতে পারে। ফলে বাণিজ্যচুক্তির আলোচনাতেও তার প্রভাব পড়বে। ট্রাম্পের ট্যারিফ আরোপের ক্ষমতা কতটা বজায় থাকে এবং আগামী দিনে আমেরিকা কী ধরনের ট্যারিফ নীতি গ্রহণ করে, তা ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
৮. গত দু’বছরে আমেরিকায় অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কড়াকড়ি বেড়েছে। H-1B ভিসায় বিধিনিষেধ, পড়ুয়াদের ভিসা এবং OPT ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ, এই বিষয়গুলি ভারতের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। অভিবাসনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে মার্কিন রাজনীতিতে যে প্রতিরোধ তৈরি হচ্ছে, তার ফলে ট্রাম্প প্রশাসনকে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।
৯. আগামী দু’বছরে চিন ও রাশিয়ার প্রতি ট্রাম্পের অবস্থান ভারতের কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক এবং দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার প্রভাব ভারতের উপরও পড়তে পারে। একইভাবে, রাশিয়ার সঙ্গে আমেরিকার কোনও নতুন সমঝোতা হলে তার প্রভাব পড়বে ভারতের দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণেও।
১০. মার্কিন রাজনীতির এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনে ভারতীয় দূতাবাস এবং আমেরিকার বিভিন্ন শহরে থাকা আটটি ভারতীয় কনস্যুলেটের দায়িত্ব বাড়বে।
ইরান যুদ্ধের জন্য পরাজয়
বস্তুত, মিডটার্ম ইলেকশনে হারে ইরান যুদ্ধকেও দায়ী করলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি স্বীকার করলেন, ইরান যুদ্ধের জন্যই এই ভাবে হারতে হল। একই সঙ্গে তাঁর দাবি, সব জায়গায় তিনিই প্রার্থী হলে, ব্যালটে তাঁর নাম থাকলে, রেজাল্ট অন্যরকম হত।