USA Midterm Elections-Donald Trump : প্রেসিডেন্টের পদ যেতে বসেছে! মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলেই কি শেষের শুরু ট্রাম্পের?

এই নির্বাচনে আমেরিকার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার খরচ, কর্মসংস্থান, অভিবাসন নীতি এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার ব্যয় ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

Advertisement
প্রেসিডেন্টের পদ যেতে বসেছে! মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলেই কি শেষের শুরু ট্রাম্পের?ডোনাল্ড ট্রাম্প
হাইলাইটস
  • আমেরিকায় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বাড়ছে ক্ষোভ
  • এবার কী করবেন ট্রাম্প ?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কি এবার বড়সড় পরীক্ষার মুখে? ৩ নভেম্বর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত হতে চলেছে মধ্যবর্তী নির্বাচন (US Midterm Elections 2026)। এই নির্বাচনে সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন না। কিন্তু এই ভোটের ফলই ঠিক করে দিতে পারে, হোয়াইট হাউসে আগামী দু'বছর কতটা রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ে চলতে পারবেন ট্রাম্প। 

বর্তমানে আমেরিকার কংগ্রেসের দুই কক্ষ, হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং সেনেট, দু'টিতেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির। কিন্তু নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা এই নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিতে পারলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে একের পর এক তদন্ত, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে বাধা এবং এমনকী ইমপিচমেন্টের প্রক্রিয়াও শুরু হতে পারে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই নির্বাচনই কি ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির শেষের শুরু?

কী এই মধ্যবর্তী নির্বাচন, কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

আমেরিকায় প্রতি চার বছর অন্তর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। আর প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে যে নির্বাচন হয়, তাকেই বলা হয় মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম ইলেকশন। ২০২৪ সালে দ্বিতীয়বারের জন্য আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই হিসেবে তাঁর চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়েই হচ্ছে ২০২৬ সালের এই নির্বাচন।

আমেরিকার আইনসভা বা কংগ্রেসের দুটি কক্ষ রয়েছে। একটি হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস, অন্যটি সেনেট। ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে হাউসের ৪৩৫টি আসনেই ভোট হবে। অন্যদিকে সেনেটের মোট ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে নির্বাচন হচ্ছে। এর পাশাপাশি ৩৬টি প্রদেশে গভর্নর নির্বাচন এবং বিভিন্ন প্রাদেশিক আইনসভা ও স্থানীয় স্তরেও ভোট হবে।

এই নির্বাচনের ফলের উপর নির্ভর করবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। অর্থাৎ, ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারে, নাকি ডেমোক্র্যাটরা সেই ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

ডেমোক্র্যাটরা জিতলে কী বিপদে পড়বেন ট্রাম্প?

বর্তমানে হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং সেনেট, দুই জায়গাতেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে রিপাবলিকানদের। ফলে নিজেদের নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কংগ্রেসে দলীয় সমর্থন পাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা যদি হাউসের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে পারে, তাহলে ট্রাম্পের জন্য পরিস্থিতি অনেকটাই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

Advertisement

প্রথমত, নতুন আইন প্রণয়ন এবং সরকারি খরচ সংক্রান্ত প্রস্তাব পাশ করানো কঠিন হবে। ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত হাউস ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির বিরোধিতা করতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিল আটকে যেতে পারে। ফলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বাধার মুখে পড়বেন ট্রাম্প।

দ্বিতীয়ত, প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তের সুযোগ পাবে বিরোধীরা। হাউসের বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে সরকারি সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক আধিকারিকদের ভূমিকা এবং বিতর্কিত নীতি নিয়ে তদন্ত শুরু করা সম্ভব। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের তলব করা, নথিপত্র চেয়ে পাঠানো এবং শুনানির আয়োজনও করতে পারে কংগ্রেসের কমিটিগুলি।

তৃতীয়ত, সেনেটের নিয়ন্ত্রণও যদি ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যায়, তাহলে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে। ফেডারেল বিচারক, উচ্চপদস্থ সরকারি আধিকারিক এবং মন্ত্রিসভার মনোনীত সদস্যদের নিয়োগে সেনেটের অনুমোদন প্রয়োজন। ফলে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বাধা দিতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা।

ইমপিচমেন্টের মুখে পড়তে পারেন ট্রাম্প?

এই নির্বাচনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেটি হল ইমপিচমেন্ট। ডেমোক্র্যাটরা যদি হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসের নিয়ন্ত্রণ পায়, তাহলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু করার সাংবিধানিক ক্ষমতা তাদের হাতে থাকবে।

আমেরিকার সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, ঘুষ অথবা অন্যান্য গুরুতর অপরাধ ও অসদাচরণের অভিযোগে ইমপিচমেন্টের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। প্রথমে হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব পাস করতে হয়। সেখানে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। প্রস্তাব পাস হলে পরবর্তী ধাপ হল সেনেটে বিচারপ্রক্রিয়া।

কিন্তু এখানেই রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। শুধু হাউসে ইমপিচমেন্ট পাস হলেই প্রেসিডেন্টকে পদ ছাড়তে হয় না। সেনেটে উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করতে হবে। তারপরই তাঁকে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরানো সম্ভব।

অর্থাৎ, ডেমোক্র্যাটরা হাউস জিতলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। কিন্তু তাঁকে সত্যিই প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরাতে হলে সেনেটেও প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হবে। সেই কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনে হার মানেই ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির অবসান নয়। তবে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে, তা বলাই যায়।

কেন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে?

এই নির্বাচনে আমেরিকার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার খরচ, কর্মসংস্থান, অভিবাসন নীতি এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার ব্যয় ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

আমেরিকার বহু পরিবারের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাড়িভাড়া, চিকিৎসার খরচ এবং বিমার প্রিমিয়াম বড় চিন্তার বিষয়। ফলে অর্থনীতি সামলানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা ভোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে, অভিবাসন ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন কঠোর অভিবাসন নীতির উপর জোর দিয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের একাধিক পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে। পাশাপাশি শুল্কনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, মজুরি বৃদ্ধি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভোটারদের মধ্যে আলোচনা চলছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে কি বরাবরই ধাক্কা খায় ক্ষমতাসীন দল?

আমেরিকার নির্বাচনী ইতিহাস বলছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত প্রেসিডেন্টের দলকে আসন হারানোর মুখে পড়তে হয়। ১৯৩৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে হওয়া ২২টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্যে ২০ বারই হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে আসন হারিয়েছে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল। ফলে এই নির্বাচনকে অনেক সময় প্রেসিডেন্টের কাজের উপর জনমতের পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হয়।

২০১০ সালে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শাসনকালে রিপাবলিকানরা হাউসে ৬৩টি আসন বাড়িয়েছিল। আবার ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্সির সময় ডেমোক্র্যাটরা হাউসে ৪০টি আসন বেশি পেয়েছিল। এই দুই ঘটনাই প্রমাণ করে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল আমেরিকার রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।

Advertisement

ভারত-আমেরিকা সম্পর্কেও কি পড়বে প্রভাব?

এই নির্বাচনের প্রভাব শুধু আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও বাণিজ্যিক অংশীদার দেশের উপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য, শুল্কনীতি, H-1B ভিসা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিনিয়োগের মতো বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ।

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালে মার্কিন বাণিজ্যনীতি ও অভিবাসন সংক্রান্ত বিতর্কে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হতে পারে। ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের জন্য H-1B ভিসা এবং দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা বাড়তে পারে। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালেই এই নীতিগুলির তাৎক্ষণিক পরিবর্তন হবে, এমনটা নয়। বিদেশনীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে এখনও যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে।

তাহলে কি শেষের শুরু ট্রাম্পের?

৩ নভেম্বরের নির্বাচন তাই শুধুমাত্র রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে আসন দখলের লড়াই নয়। এটি ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্সির বাকি দু'বছরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও নির্ধারণ করবে। ডেমোক্র্যাটরা এক বা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্পকে অনেক বেশি বিরোধিতার মুখে পড়তে হবে। প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত, ইমপিচমেন্টের উদ্যোগ এবং আইন প্রণয়নে বাধা তাঁর শাসনকে কঠিন করে তুলতে পারে।

তবে একটা বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে সরাসরি প্রেসিডেন্টকে সরানোর কোনও ব্যবস্থা নেই। এমনকী ডেমোক্র্যাটরা দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ট্রাম্পের হাতে প্রেসিডেন্টের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে। সেই ভেটো অতিক্রম করতে হলে দুই কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন।

 

POST A COMMENT
Advertisement