উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্বের ধনীতম ব্যক্তি ইলন মাস্ক।'এত লোকসংখ্যা বেড়েছে, ভিড় হবে না!' ট্রেনে-বাসে গলদঘর্ম হতে হতে অনেককেই বলতে শোনা যায়। সম্প্রতি বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও জন্মহার নিয়ন্ত্রণের পক্ষে সওয়াল করেন। কিন্তু অনেকেই জানেন না, জনসংখ্যা বাড়লে যেমন সমস্যা, তেমন হঠাৎ কমে গেলেও বিপদ। কী বিপদ? জানব। তার আগে এটা জেনে রাখুন যে, ভারতে জন্মহার গত কয়েক বছরে দ্রুত হারে কমেছে। তাই নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন বিশ্বের ধনীতম ব্যক্তি ইলন মাস্ক। বলেন, ভারতের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বহু বছর আগেই সন্তান জন্মের হার 'রিপ্লেসমেন্ট লেভেলের' নিচে নেমে গিয়েছিল। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে সেই প্রবণতাই একেবারে স্পষ্ট।
এই রিপ্লেসমেন্ট লেভেল কী? সহজভাবে বললে, এখন বেশিরভাগ পরিবারেই এক সন্তান। তার উপর অনেক মহিলা-পুরুষই অবিবাহিত থাকছেন বা বিবাহিত হলেও সন্তান নিচ্ছেন না। এর ফলে আগের প্রজন্মের মোট জনসংখ্যার তুলনায় অনেক কম মানুষ জন্মাচ্ছে।
২০২৪ সালের স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (SRS)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে মোট প্রজনন হার কমে দাঁড়িয়েছে ১.৯। অর্থাৎ গড়ে একজন মহিলা তাঁর জীবদ্দশায় ১.৯ জন সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। এর আগে এই হার ছিল ২.১।
রিপ্লেসমেন্ট লেভেল কত হওয়া উচিত?
জনসংখ্যাবিদদের মতে, কোনও দেশের জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে গড়ে প্রতি মহিলার ২.১ জন সন্তান জন্ম দেওয়া প্রয়োজন। এই হারকেই রিপ্লেসমেন্ট লেভেল বলা হয়। অর্থাৎ, একটি প্রজন্ম পরবর্তী প্রজন্ম দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতে পারে এবং জনসংখ্যার ভারসাম্য বজায় থাকে।
কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে এই হার ২.১-এর নীচে থাকলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি কমতে শুরু করে। ভবিষ্যতে তা নেগেটিভেও পরিণত হতে পারে।
নেগেটিভ পপুলেশন গ্রোথ কী?
জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঋণাত্মক হওয়ার অর্থ হল, নতুন জন্মের সংখ্যা ও অন্য় দেশ থেকে আগতদের সংখ্যা মিলিয়েও মোট জনসংখ্যা মৃত্যুর সংখ্যা এবং দেশত্যাগকারী মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়ে যেতে পারছে না। ফলে সামগ্রিক জনসংখ্যা কমতে শুরু করে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি কোনও বছরে ১০ লক্ষ শিশুর জন্ম হয় এবং ১২ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটে, সেক্ষেত্রে মোট জনসংখ্যা ২ লক্ষ কমে যাবে। এই পরিস্থিতিকেই নেগেটিভ পপুলেশন গ্রোথ বলা হয়।
কিন্তু ভিড় কমলে তো ভাল?
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রজনন হার দীর্ঘ দিন কম থাকলে সমাজে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। অন্যদিকে কর্মক্ষম যুব জনসংখ্যার অনুপাত কমে যায়। এর ফলে শিল্প, পরিষেবা এবং উৎপাদন ক্ষেত্রে কর্মীর ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে গেলে অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়ে। অন্যদিকে বয়স্কদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তাঁদের জন্য স্বাস্থ্য পরিষেবা, পেনশন এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকারের খরচ বৃদ্ধি পায়।
ভারতের জনসংখ্যা
রাষ্ট্র সংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (UNFPA) ২০২৫ সালের ‘স্টেট অফ ওয়ার্ল্ড পপুলেশন’ রিপোর্টেও ভারতের মোট প্রজনন হার ১.৯ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও ১৪৬ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার কারণে ভারত এখনও বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ। তবে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে দেশ এখন নতুন এক জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের পর্যায়ে প্রবেশ করছে। দেশজুড়ে বাড়ছে ছোট পরিবার, কম সন্তান এবং ধীর জনসংখ্যা বৃদ্ধি।
জন্মহার ও প্রজনন হার এক নয়
অনেকেই জন্মহার এবং প্রজনন হার গুলিয়ে ফেলেন। কিন্তু দু'টির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
জন্মহার হল বছরে প্রতি এক হাজার মানুষের মধ্যে কত জন শিশুর জন্ম হচ্ছে তার পরিমাপ।
অন্য দিকে, একজন মহিলা তাঁর জীবদ্দশায় গড়ে কত জন সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন, তাকে মোট প্রজনন হার বলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রজনন হার ক্রমাগত কমতে থাকলে সময়ের সঙ্গে জন্মহারও কমে যায়।
কোন কোন রাজ্যে এখনও প্রজনন হার বেশি?
স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তীসগঢ় এবং ঝাড়খণ্ড; এই কয়েকটি রাজ্যেই এখনও প্রজনন হার রিপ্লেসমেন্ট লেভেলের উপরে রয়েছে। দেশের বাকি অংশে সন্তান জন্মের হার কমছে ক্রমশ।