গঙ্গা পদ্মা চুক্তির পুরো কাহিনিগত বছর এপ্রিলে পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার পর পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু জলচুক্তি (Indus Waters Treaty) স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় নয়াদিল্লি। কয়েক দিন আগে এই সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের রায়ও খারিজ করে দিয়েছে ভারত সরকার। এর মধ্যেই আলোচনায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তি। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা চলতি বছরের ডিসেম্বরে। এই চুক্তি কীভাবে তৈরি হল? জলবণ্টনের শর্ত কী? মেয়াদ কি বাড়বে? ফরাক্কা বাঁধকে ঘিরে বিতর্কটাই বা কী? এই প্রতিবেদনে পুরো কাহিনি জানুন।
ফরাক্কা বাঁধ নির্মাণ
গঙ্গার জল ভাগাভাগি নিয়ে ভারত এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে টানাপড়েন শুরু হয়েছিল গত শতাব্দীর পাঁচের দশকে। পশ্চিমবঙ্গের ফরাক্কায় একটি বাঁধ নির্মাণ করার পরিকল্পনা করে ভারত সরকার। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে তৈরি হওয়ার কথা ছিল সেই বাঁধ। ১৯৬১ সালে শুরু হয় নির্মাণকাজ। ১৯৭৫ সালে কাজ শেষ হওয়ার পর ফরাক্কা বাঁধের মাধ্যমে গঙ্গার জল হুগলি নদীতে ঘুরিয়ে দেওয়া শুরু হয়। উদ্দেশ্য ছিল, হুগলি নদীতে নাব্যতা বজায় রাখা। যাতে কলকাতা বন্দরে স্বাভাবিক থাকে জাহাজ চলাচল।
কোথায় বিতর্ক?
ফরাক্কা নির্মাণের শুরু থেকেই বিষয়টি নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের বিরোধ চলতে থাকে। ১৯৭৬ সালে সেই বিরোধ চরমে পৌঁছয়। তৎকালীন স্বাধীন বাংলাদেশের নেতা মওলানা ভাসানী ভারতের জলনীতির প্রতিবাদে ফরাক্কা লং মার্চের নেতৃত্ব দেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, ফরাক্কা বাঁধের কারণে গঙ্গার প্রধান শাখা পদ্মায় জলের প্রবাহ কমে গিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশে নদী শুকিয়ে গিয়ে খরার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। পরবর্তী এক দশকে ১৯৭৭, ১৯৮২ এবং ১৯৮৫ সালে দুই দেশের মধ্যে একাধিক অন্তর্বর্তী চুক্তি হলেও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হয়নি।
১৯৯৬ সালে চুক্তি
১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এইচডি দেবগৌড়া এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দুই দেশ গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তিতে সম্মত হয়। ৩০ বছরের জন্য এই চুক্তিতে প্রতিবছর শুষ্ক মরসুমে, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত গঙ্গার জল ভাগাভাগির একটি কাঠামো তৈরি করা হয়। পাশাপাশি চুক্তি কার্যকর করা এবং জলের প্রবাহ নজরে রাখার জন্য গঠিত হয় যৌথ কমিটি।
কী রয়েছে চুক্তির শর্তে?
১৯৪৯ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত গঙ্গার জলের গড় প্রবাহের ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে ১০ দিন অন্তর জলবণ্টনের জন্য তিন ধাপের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী, ফরাক্কায় জলের প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে ভারত ও বাংলাদেশ সমান ভাগে জল পাবে। প্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে থাকলে বাংলাদেশ পাবে ৩৫ হাজার কিউসেক। বাকি জল পাবে ভারত। আর জলের প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত পাবে ৪০ হাজার কিউসেক। বাকি জল যাবে বাংলাদেশে।
এর সঙ্গে রয়েছে আরও একটি বিশেষ শর্ত। প্রতি বছর ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত নির্দিষ্ট তিনটি ১০ দিনের অন্তরে পালা করে দুই দেশকে অন্তত ৩৫ হাজার কিউসেক জল দিতে হবে। তবে চুক্তিতে কোনও নির্দিষ্ট ন্যূনতম জলপ্রবাহ নিশ্চিত করার শর্ত নেই। যদিও জরুরি পরিস্থিতির জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে।
কোনও ১০ দিনের সময়ে ফরাক্কায় জলের প্রবাহ ৫০ হাজার কিউসেকের নীচে নেমে গেলে ভারত ও বাংলাদেশকে অবিলম্বে আলোচনায় বসতে হবে। দুই দেশের স্বার্থ, ন্যায়সঙ্গত বণ্টন এবং কোনও পক্ষের ক্ষতি না হওয়ার নীতিতে জরুরি ভিত্তিতে জলবণ্টনে যথাবিহিত পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে চুক্তিতে।
বিরোধ মেটানোর ব্যবস্থা
বিরোধ মেটানোর ক্ষেত্রেও রয়েছে নির্দিষ্ট ব্যবস্থা। দুই দেশের সমসংখ্যক প্রতিনিধিকে নিয়ে গঠিত যৌথ কমিটিই প্রথমে বিষয়টি দেখবে। সেখানে সমাধান না হলে তা যাবে যৌথ নদী কমিশনের কাছে। ১৯৭২ সালে দুই দেশ মিলে এই কমিশন তৈরি করেছিল। দুই দেশের মধ্যে অভিন্ন ৫৪টি নদীর জলসম্পদ নিয়ে আলোচনার দায়িত্বে রয়েছে এই কমিশন। তবে এখনও পর্যন্ত গঙ্গাই একমাত্র অভিন্ন নদী, যার জলবণ্টন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ঔপচারিত চুক্তি হয়েছে।
এবার কী?
গত কয়েক বছরে ভারত এবং বাংলাদেশে এই চুক্তি নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। অভিযোগ, দুই দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার ভবিষ্যৎ জলের চাহিদার কথা চুক্তিতে বিবেচনা করা হয়নি। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তৈরি হওয়া নতুন সংকটও প্রতিফলিত হয়নি বর্তমান চুক্তিতে। ৩০ বছরের মেয়াদ শেষে দুই দেশের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে চুক্তি নবীকরণের সুযোগ রয়েছে। তবে এখন দুই দেশই চুক্তির বিভিন্ন শর্ত নতুন করে পর্যালোচনা করতে আগ্রহী।
নয়া চুক্তিতে কী চাইছে ভারত?
বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত সময়ে ভারত ৩০-৩৫ হাজার কিউসেক জল চাইতে পারে অতিরিক্ত। ভারতের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা মাথায় রেখেই এই দাবি। পাশাপাশি নতুন চুক্তির মেয়াদও আগের ৩০ বছরের তুলনায় কমিয়ে ১০ থেকে ১৫ বছর করার প্রস্তাব থাকতে পারে।
নয়া চুক্তিতে কী চাইছে বাংলাদেশ?
সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে বাংলাদেশ ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়ে ৪০ হাজার কিউসেক জল নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি চুক্তির মেয়াদ আরও দীর্ঘ করার এবং বন্যা সংক্রান্ত তথ্য আদানপ্রদান বাড়ানোর দাবি ঢাকার।
রাজনীতির ছায়া চুক্তিতে?
গঙ্গার জলবণ্টন নিয়ে আলোচনার সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। হাসিনার পতনের পর ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে টানাপড়েন বেড়েছে। প্রণিধানযোগ্য, পহেলগাঁওয়ে হামলার পর একতরফাভাবে সিন্ধু চুক্তি একতরফাভাবে স্থগিত করেছে ভারত সরকার।
পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার সরকারের অবস্থান
পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে এখন সরকারে বিজেপি। ইতিমধ্যেই চুক্তি বাতিলের দাবি করেছে বিহার। এদিকে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আর্জি জানিয়েছে, চুক্তি নবীকরণের সময় রাজ্যের স্বার্থের বিষয়টি যেন মাথায় রাখা হয়। প্রসঙ্গত, ২০১১ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তার জলবণ্টন নিয়ে চুক্তি হওয়ার কথা ছিল। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তি থাকায় সেই সময় তা বাস্তবায়িত হয়নি। তাই গঙ্গার জলবণ্টন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হলে বাংলা ও বিহারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ইতিমধ্যেই বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানিয়েছেন,'সব দিক বিবেচনা করে যথাবিহিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে'।
পুনর্নবীকরণ না নতুন চুক্তি?
বছর শেষে গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এখন বড় প্রশ্ন, পুরনো শর্ত সামান্য বদলে পুনর্নবীকরণ নাকি জলবায়ু, জনসংখ্যা এবং দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে তৈরি হবে সম্পূর্ণ নতুন সমীকরণ?