ভারত কি নীরবে কোনও পক্ষ বেছে নিল? মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন। আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হামলার পর ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ। অগ্নিগর্ভ তেল আভিভ থেকে উপসাগরীয় একাধিক শহর। এহেন প্রেক্ষাপটে ভারত কি নীরবে কোনও পক্ষ বেছে নিল? নাকি বহু দশকের ‘ব্যালান্সিং অ্যাক্ট’ বজায় রেখেই এগোচ্ছে নয়াদিল্লি? দীর্ঘ দিন ধরেই ভারতের পশ্চিম এশিয়া নীতির মূল ভিত্তি ছিল সমান্তরাল সম্পর্ক রক্ষা। এক দিকে ইজরায়েল, অন্য দিকে ইরান, পাশাপাশি উপসাগরীয় আরবের দেশগুলি। জ্বালানি নির্ভরতা, প্রবাসী ভারতীয়দের নিরাপত্তা এবং স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ; সব মিলিয়ে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা ছিল দিল্লির কূটনৈতিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু বর্তমান ইরান-ইজরায়েল সংঘাত সেই নীতিকেই কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।
প্রথম প্রতিক্রিয়ায় ভারত সংযম ও উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানালেও, আমেরিকা-ইজরায়েলের হামলাকে সরাসরি নিন্দা করেনি। আবার ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়েও স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। এমনকি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই-র হত্যাকাণ্ড নিয়েও দিল্লির প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়াও ছিল সংযত। এই নীরবতাকেই অনেকেই ‘স্ট্র্যাটেজিক মেসেজ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
পরিস্থিতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দুই গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপকে ঘিরে। এক দিকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে কথা বলেন তিনি, যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানছে। অন্য দিকে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গেও আলোচনা করেন। দু’ক্ষেত্রেই শান্তি ও দ্রুত যুদ্ধবিরতির আহ্বান শোনা গেলেও, ইরানের সঙ্গে সরাসরি কোনও উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের খবর সামনে আসেনি।
উল্লেখ্য, ইজরায়েলের সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। অন্য দিকে ইরানের চাবাহার বন্দর উন্নয়নে ভারতের বিনিয়োগ রয়েছে, যা মধ্য এশিয়ায় প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত দরজা হিসেবে বিবেচিত। ফলে দুই পক্ষের সঙ্গেই ভারতের গভীর স্বার্থ জড়িত।
বিরোধী শিবির অবশ্য সরকারের অবস্থান নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে। কংগ্রেস নেতারা অভিযোগ তুলেছেন, এটি ‘নৈতিক দুর্বলতা’। তাঁদের মতে, নীরবতা মানেই পরোক্ষ সমর্থন। তবে সরকারি সূত্রের দাবি, এটিই ‘দায়িত্বশীল কূটনীতি’। ভারতের অগ্রাধিকার প্রবাসী নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জ বহুমাত্রিক। উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ৯০ লক্ষ ভারতীয় কর্মরত। পাশাপাশি দেশের জ্বালানি আমদানির বড় অংশ এই অঞ্চলনির্ভর। ফলে প্রকাশ্য পক্ষ নেওয়া অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরান-আমেরিকা-ইজরায়েল সংঘাতে ভারতের অবস্থান আপাতত ‘ক্যালিব্রেটেড নিউট্রালিটি’ বলেই ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। প্রকাশ্যে শান্তির বার্তা, অন্তরালে হিসেবি কূটনীতি। এই দ্বৈত কৌশল কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলবে। তবে স্পষ্ট, মধ্যপ্রাচ্যের এই সঙ্কট ভারতের বিদেশনীতির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে দাঁড়াতে পারে।