ডোনাল্ড ট্রাম্প, শি জিনপিং, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জ্বলছে মধ্যপ্রাচ্য। ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধের জেরে তোলপাড় বিশ্ব। এর মাঝে প্রশ্ন উঠছে, চিন কার পক্ষে? আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একাংশের অনুমান ছিল, চিন ইরানের সবচেয়ে বড় সমর্থক হয়ে উঠবে। তবে বাস্তব চিত্র অন্য কথা বলছে।
প্রথম ঘটনা: গত বছর মে মাসে, চিন থেকে একটি মালবাহী ট্রেন ১৫ দিনের যাত্রা শেষে ইরানের একটি বন্দরে পৌঁছয়। এই ট্রেনটি ইনচেহ বারুণ সীমান্ত দিয়ে ইরানে প্রবেশ করে। এটিকে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের একটি প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
দ্বিতীয় ঘটনা: ২০২১ সালের মার্চ মাসে ইরান ও চিন ২৫ বছরের একটি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। যার মধ্যে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
তৃতীয় ঘটনা: ২০২৩ সালের মার্চ মাসলে চিনা মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঘোষণাও হয়েছিল।
বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাঝেও কেন চনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন?
যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগে খবর আসে, ইরান চিনের তৈরি CM302 বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলির পাল্লায় প্রায় ২৯০ কিলোমিটার বলে জানা গিয়েছে। বলা হচ্ছে, কম উচ্চতায় উচ্চ গতিতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়াতে সক্ষম এগুলি। তাছাড়া ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সামরিক কার্যকলাপের স্যাটেলাইট চিত্র চিনা ওপেন সোর্স গোয়েন্দা গোষ্ঠী মিজরাভিশন শেয়ার করেছিল। এর ফলে ধারণা তৈরি হয়েছিল, চিন এবার আরও খোলাখুলি ভাবে ইরানের পক্ষে থাকতে পারে।
৪০০ বিলিয়নের বিনিয়োগের দাবি
তবে যুদ্ধ যখন শুরু হল, প্রথম দিনই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হন। তখন চিনের প্রতিক্রিয়া ছিল মৃদু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি হঠাৎ করে পরিবর্তন নয়। চিন কখনও ইরানকে সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়নি। নেদারল্যান্ডসের গ্রোনিংজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উইলিয়াম ফিগুয়েরো তাঁর গবেষণায় লিখেছেন, ২৫ বছরের চুক্তিটি অতিরঞ্জিত ছিল। তাঁর মতে, এতে সুনির্দিষ্ট চুক্তি বা স্পষ্ট আর্থিক লক্ষ্যমাত্রার অভাব ছিল। বরং ভবিষ্যতের সম্ভাবনার রূপরেখা ছিল।
চিনের প্রতিক্রিয়া
কানের্দি এনডাউমেন্টের ইভান ফেইগেনবাউম যুক্তি দেন, বিশ্ব চিনকে আমেরিকার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। অন্যদিকে, চিনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বা সামরিক কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। তিনি যুক্তি দেন, চিনকে এই অঞ্চলে আমেরিকার মতো আচরণ করার জন্য তৈরি করাই হয়নি।
অর্থনৈতিক তথ্যও এটি নির্দেশ করে, ২০২৪ সালে চিন উপসাগরীয় দেশগুলির বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হয়ে ওঠে। ২০২৩ সালে ইরানে চিনা বিনিয়োগ ছিল মাত্র ১৮৫ মিলিয়ন ডলার। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য প্রায় ২৫.৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। যা ২০১৪ সালের প্রায় অর্ধেক।
বিপরীতে, চিন কেবল সৌদি আরবে ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। ইরানি ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োগ হচ্ছে সেখানেই।
আহমেদ আবদৌহ আরও বলেন, 'চিন ২০২৫ সালে ইরানের রপ্তানিকৃত তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি কিনেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সমুদ্রপথ এবং উপসাগরীয় দেশগুলিতে বৃহৎ বাণিজ্যিক স্বার্থকে বিপন্ন করে তুলতে পারে। এক্ষেত্রে ভেনিজুয়েলাকেও উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ সেখান থেকেও চিন প্রচুর পরিমাণে তেল কিনেছিল কিন্তু মার্কিন আগ্রাসনের সময়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেনি। আফগানিস্তানে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর চিনও খনিজ সম্পদের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিল কিন্তু নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয়নি।'
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চিনের কৌশল স্পষ্ট। তারা তাদের প্রভাব বিস্তার করতে চায় কিন্তু কোনও ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। তারা ইরানের সম্পূর্ণ পতন দেখতে চায় না তবে তারা দুর্বলতা কাজে লাগাতেও দ্বিধাবোধ করবেন না। সুতরাং চিন ইরান যুদ্ধে হস্তক্ষেপ না হলেও ঋণদাতা হিসেবে ছাপ ফেলবেই।